মৃতদের ফিরে আসার দিন!

অক্টোবরের শেষ রাত। মেক্সিকোর ছোট এক গ্রামের কবরস্থানে মানুষ জড়ো হয়েছে। হাতে মোম, কোলে ঘুমন্ত শিশু। কেউ কাঁদছে না। বাতাসে পোড়া মোম আর ধূপের গন্ধ। একটি কবরের পাশে বসে এক বৃদ্ধা গিটার বাজাচ্ছেন। গানটা তার স্বামীর খুব প্রিয় ছিল। মানুষটা মারা গেছেন আট বছর আগে। বৃদ্ধা আজ রাতে তাকেই গান শোনাচ্ছেন।
হঠাৎ একটা মোমের শিখা কেঁপে ওঠে। অথচ বাতাস নেই। বৃদ্ধা মুখ তুলে হাসেন। বললেন, ‘এসেছ তাহলে।’
গল্পটি একটি উৎসবের। নাম দে লোস মুয়ের্তোস, মানে মৃতদের দিবস। নাম শুনলেই গা ছমছম করে। কিন্তু ভেতরে ঢুকলে ভয়টা আর থাকে না। ১ ও ২ নভেম্বর— এ দুই রাত ওপারের আত্মারা ফেরার অনুমতি পায়; মেক্সিকোর মানুষ এমনই বিশ্বাস করে। বাবা ফেরেন, মা ফেরেন, দাদিও ফেরেন। সেই শিশুটিও ফেরে, যে অল্প বয়সে চলে গিয়েছিল।
ফেরার পথ চেনানো হয় ফুল দিয়ে। গাঁদা, স্থানীয় ভাষায় সেম্পাসুচিল। রঙ গাঢ় কমলা, গন্ধ তীব্র, প্রায় তেতো। কবরস্থান থেকে ঘরের দরজা পর্যন্ত পাপড়ি বিছিয়ে দেওয়া হয়। বিশ্বাস, অন্ধকারে পথ হারানো আত্মা এই রঙ আর গন্ধ ধরেই ঠিক দরজায় পৌঁছায়।
ঘরের এক কোণে সাজানো হয় ওফ্রেন্দা। প্রিয়জনের ছবি বসে সেখানে, মোম জ্বলে পাশে। এক গ্লাস পানি রাখা হয়, কারণ অনেক পথ হেঁটে এসে আত্মার তেষ্টা পায়। আর রাখা হয় মানুষটির পছন্দের খাবার। কারও জন্য ঝাল চকলেটের ঝোল, কারও জন্য এক পেয়ালা কড়া কফি। শিশুর জন্য মিষ্টি আর ছোট্ট একটা খেলনা। আমাদের দেশেও প্রিয়জনের নামে খাবার বিলানো হয়। তাই দৃশ্যটা অচেনা লাগে না।
তবে একটা বিশ্বাস শুনলে গায়ে কাঁটা দেয়। ওরা মনে করে, আত্মারা খাবারের শরীর নেয় না, নেয় তার সারটুকু। পরদিন সেই খাবার মুখে দিলে কোনো স্বাদ মেলে না। সব ফ্যাকাশে, ফিকে। তখন পরিবার বোঝে, কেউ একজন এসেছিল।
শিকড় অনেক গভীরে। যাজকরা মৃত্যুকে শেষ ভাবত না। তাদের কাছে মৃত্যু ছিল এক দীর্ঘ যাত্রা। যাত্রার শেষে মিকতলান, অন্ধকার এক জগৎ। পাঁচশ বছর আগে স্প্যানিশরা এসে সব বদলে দিতে চাইল। ক্যাথলিক উৎসব চাপিয়ে দিল। কিন্তু মানুষ পুরনো রীতি ছাড়ল না। দুই বিশ্বাস মিলেমিশে এক হলো। সেই মিশ্রণ আজও টিকে আছে। বাজারে বাজারে চিনির খুলি বিক্রি হয়। রঙিন খুলি। কপালে লেখা থাকে একটা নাম। বন্ধুকে উপহার দেওয়া হয়, হেসে খাওয়া হয়। বাইরের মানুষ অবাক হয়। অথচ ওরা জানে, যাকে নিয়ে হাসা যায়, তাকে আর ভয় লাগে না।
একশ বছরের বেশি আগে শিল্পী হোসে গুয়াদালুপে পোসাদা এক কঙ্কাল এঁকেছিলেন। মাথায় ইউরোপীয় ধাঁচের দামি টুপি। ধনীদের দেখনদারিকে খোঁচা দেওয়াই ছিল উদ্দেশ্য। পরের ছবিটা অন্য মানে পেল। লা ক্যাতরিনা নামে সে এখন উৎসবের মুখ। টুপি যত দামিই হোক, নিচে সবার একই খুলি। কবরে গিয়ে ধনী-গরিবের তফাত থাকে না।
২০১৭ সালে ‘কোকো’ ছবিটি পুরো দুনিয়াকে এই উৎসব চিনিয়েছে। ছবির কেন্দ্রে একটা কথা আছে, যা বুকের ভেতর গিয়ে বাজে। মানুষ নাকি দুবার মরে। একবার যখন শরীর থেমে যায়। আরেকবার যেদিন পৃথিবীর শেষ মানুষটি তাকে মনে করা ছেড়ে দেয়। ওফ্রেন্দায় ছবি রাখা তাই দ্বিতীয় মৃত্যুর বিরুদ্ধে একটা ছোট লড়াই। নাম ধরে ডাকা। দাদির হাতের রান্নাটা আরেকবার চুলায় চাপানো। কোনো ঘরে হয়তো একটা ছোট ছেলে ছবির সামনে দাঁড়িয়ে ফিসফিস করে বলছে, ‘দাদু, আজ খুব ঠান্ডা। চাদরটা নিয়েছ তো?’
মিকোয়াকান রাজ্যের পাতস্কুয়ারো হ্রদে রাতে সারি সারি নৌকা ভাসে। প্রতিটিতে মোমের আলো। মেক্সিকো সিটিতে এখন বিশাল শোভাযাত্রা হয়। পর্যটকের ভিড়ও বাড়ছে। তবু উৎসবের আসল প্রাণ রয়ে গেছে ঘরের ভেতর, কবরের পাশে সেই বৃদ্ধার গিটারে।
ভোর হয়ে আসে। মোম নিভু নিভু। বৃদ্ধা শেষবার গিটারের তারে হাত রাখেন। সুরটা বাতাসে মিলিয়ে যায়। উঠতে গিয়ে তিনি একটু থামেন। কবরের মাটিতে আলতো হাত বুলিয়ে বলেন, ‘আসছে বছর আবার এসো।’



