পাঠ্যবইয়ের কবিতা পাঠপদ্ধতি

প্রথম থেকে শুরু করে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত বাংলা বইয়ে ১০০টির মতো কবিতা অন্তর্ভুক্ত। প্রথম শ্রেণির একটি শিশু যদি তার পাঠভুক্ত প্রতিটি কবিতা মুখস্থ করে একটি খাতায় লিখে রাখে এবং খাতাটি দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত আগলে রাখে, তাহলে সব মিলিয়ে তার ১০০টি কবিতা আত্মস্থ হয়ে যাবে। এভাবে বাংলা কবিতার বৈচিত্র্যপূর্ণ ধারার সঙ্গে পরিচিত হওয়ার পাশাপাশি মানুষটি সুন্দর মননশীলতারও অধিকারী হবে। পরবর্তী জীবনে অন্য কোনো সাহিত্য না পড়লেও এসব কবিতার ভাব ও ছন্দ তার মননকে গড়ে তুলবে।
তবে শিক্ষক ও অভিভাবকদের আন্তরিক প্রচেষ্টা ছাড়া এ কাজটি অসম্ভব। তাদের প্রতি আমার অনুরোধ আপনারা শিক্ষার্থীদের অন্তত পাঠ্যবইয়ের কবিতাগুলো আত্মস্থ করতে অনুপ্রাণিত করুন। পাশাপাশি পরীক্ষাপদ্ধতিতে কবিতা মুখস্থ লেখা ও ব্যবহারিকে আবৃত্তি অন্তর্ভুক্ত হলে শিক্ষার্থীরা মুখস্থের পাশাপাশি কবিতার ভাব ও বিষয় আত্মীকরণেও সচেষ্ট হবে। না, আমি মুখস্থের পক্ষে নই। তবুও হৃদয়ে কবিতাকে স্থাপন করা জরুরি।
এদেশেই হাজারো মাদ্রাসা শিক্ষার্থী ১৫ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই আরবি ভাষার আল কোরআন মুখস্থ করছে। তাই আমার বিশ্বাস আমাদের সন্তানরা বাংলা ভাষায় লিখিত কবিতাগুলোও ধীরে ধীরে মুখস্থ করতে পারবে। এর শুরুটা হোক অন্তত পাঠ্যবইয়ের কবিতা পাঠ থেকেই।
প্রাচীন ও মধ্যযুগের প্রায় সব কবিতাই অন্তমিল রেখে লিখিত হতো ও সুর করে নানান আসরে পাঠ করা হতো। অন্ত্যমিল বজায় রেখে বা ছন্দবদ্ধভাবে লিখিত হওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ হলো- এতে মুখস্থ করতে সুবিধা হয়। সংস্কৃত ভাষায় রচিত মহাকাব্য ‘রামায়ণ’ ও ‘মহাভারত’ থেকে শুরু করে বাংলা সাহিত্যের আধুনিক যুগের অনেক ক্লাসিক কবির কবিতাই ছন্দবদ্ধভাবে লিখিত। ফলে কবিতাগুলো মুখস্থ করা সহজ।
একুশ শতকের প্রথম দশকেও বাংলাদেশের শিক্ষাপদ্ধতিতে কবিতার প্রথম বা শেষ আট চরণ পরীক্ষার খাতায় মুখস্থ লিখতে হতো। ফলে শিক্ষার্থীদের কবিতা মুখস্থ করতেই হতো। ফলস্বরূপ বৃদ্ধ থেকে শুরু করে মাঝবয়সী বহু বাংলাদেশিরই অনেক কবিতা মুখস্থ রয়েছে। কিন্তু গত ১৫ বছর ধরে সৃজনশীল পদ্ধতি আসার পর বাংলা কবিতা মুখস্থ লিখতে হয় না। এমন শিক্ষার্থী এখন কমই পাওয়া যাবে যার ১০-১২টি কবিতা মুখস্থ রয়েছে। সাহিত্যের মতো বিষয়ে সৃজনশীলতার সঙ্গে চিন্তা করা ও লেখার জন্য হলেও অনেক কবিতা ও কবিতার ছন্দ আত্মস্থ রাখতে হয়। তা না হলে ভিত্তিই গড়ে ওঠে না। আর এতে বাংলা কবিতার নিবিড় পাঠ থেকে শিক্ষার্থীরা যেমন বঞ্চিত হয়, তেমনি শিক্ষার্থীদের নান্দনিকতাবোধের ব্যাপক ঘাটতি থেকে যায়। এই ঘাটতি তারা উচ্চশিক্ষার স্তরে পুষিয়ে নাও নিতে পারে। (চলবে)



