অতিরিক্ত ওষুধ সেবনে বড় বিপদ

প্রয়োজনের চেয়ে বেশি ওষুধ খাওয়া, নিজের ইচ্ছায় ওষুধের মাত্রা বাড়ানো শরীরের জন্য মারাত্মক বিপদ ডেকে আনতে পারে। লিখেছেন ডা. মহিমা বিশ্বাস মিসি
প্রতি বছর ৩১ আগস্ট বিশ্ব জুড়ে পালিত হয় আন্তর্জাতিক ওভারডোজ সচেতনতা দিবস। দিবসটির মূল উদ্দেশ্য হলো ওষুধের অতিরিক্ত সেবনের ঝুঁকি সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করা, ওভারডোজ প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া, ওভারডোজে মৃত্যুবরণকারীদের স্মরণ করা।
ওষুধ আমাদের অসুস্থতা সারাতে সাহায্য করে। কিন্তু প্রয়োজনের চেয়ে বেশি ওষুধ খাওয়া, নিজের ইচ্ছায় ওষুধের মাত্রা বাড়ানো কিংবা মাদক গ্রহণ শরীরের জন্য গুরুতর বিপদ ডেকে আনে। অনেক সময় মানুষ মনে করেন, ওষুধ বেশি খেলে দ্রুত সুস্থ হওয়া যাবে। এই ধারণা ভুল। ওষুধের মাত্রা নির্ধারণ করা হয় রোগ, বয়স, শারীরিক অবস্থা এবং অন্য ওষুধ ব্যবহারের বিষয় বিবেচনা করে। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ঘুমের ওষুধ, ব্যথানাশক কিংবা ইনসুলিনের মতো জীবনরক্ষাকারী ওষুধ ভুল মাত্রায় ব্যবহার করলে বিষক্রিয়া এমনকি মৃত্যুও ঘটতে পারে।
একই ওষুধ নির্ধারিত মাত্রার চেয়ে বেশি খেলে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার ঝুঁকি বাড়ে। ওভারডোজের গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণের মধ্যে রয়েছে অস্বাভাবিক ঘুমঘুম ভাব, বিভ্রান্তি, বমি, কথা জড়িয়ে যাওয়া, প্রতিক্রিয়া কমে যাওয়া, খিঁচুনি, অচেতনতা এবং শ্বাস-প্রশ্বাস ধীর বা বন্ধ হয়ে যাওয়া কিংবা অস্বাভাবিক হৃৎস্পন্দন। ঠোঁট বা নখ নীলচে হয়ে যাওয়াও গুরুতর বিপদের সংকেত। গুরুতর ক্ষেত্রে অঙ্গের ক্ষতি, অচেতনতা এমনকি মৃত্যুও ঘটতে পারে। এসব লক্ষণ দেখা দিলে সময় নষ্ট না করে দ্রুত জরুরি চিকিৎসা নিতে হবে।
বিশেষ করে একই সময়ে একাধিক ওষুধ ব্যবহার করলে সতর্ক থাকা জরুরি। কারণ, একটি ওষুধ অন্যটির সঙ্গে মিশে শরীরে অপ্রত্যাশিত প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে। একাধিক ওষুধ ব্যবহারের বিষয়টি বর্তমানে ওষুধের নিরাপত্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
জ্বর, সর্দি, কাশি বা যেকোনো সংক্রমণ হলেই অনেকে অ্যান্টিবায়োটিক সেবন শুরু করেন। শরীর কিছুটা সুস্থ হতে শুরু করলে নির্ধারিত সময়ের আগেই বন্ধ করে দেন। এ ধরনের ভুল ব্যবহারে অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে জীবাণুর প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, অ্যান্টিবায়োটিকের অতিরিক্ত ও ভুল ব্যবহার ওষুধ প্রতিরোধী জীবাণু তৈরির অন্যতম কারণ। ২০২৩ সালে বিশ্ব জুড়ে পরীক্ষাগারে নিশ্চিত হওয়া প্রতি ছয়টি ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণের প্রায় একটিতে অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধ দেখা গেছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০২৬ সালের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে বিশ্বে আনুমানিক ৩১ কোটি ৬০ লাখ মানুষ মাদক ব্যবহার করেছে। এর মধ্যে প্রায় ৬ কোটি ১০ লাখ মানুষ চিকিৎসার বাইরে বা অনিয়মিতভাবে ওপিওয়েড (ব্যথা উপশমে ব্যবহৃত ওষুধ) ব্যবহার করেছে। মাদকজনিত প্রায় ছয় লাখ মৃত্যুর মধ্যে প্রায় ৪ লাখ ৫০ হাজারের সঙ্গে ওপিওয়েড ব্যবহারের সম্পর্ক ছিল।
ওষুধ সবসময় চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী এবং নির্ধারিত মাত্রায় খেতে হবে। অন্যের প্রেসক্রিপশন দেখে নিজের জন্য ওষুধ শুরু করা ঠিক নয়। একইভাবে পুরনো প্রেসক্রিপশন ব্যবহার করে নতুন অসুস্থতার চিকিৎসা করাও নিরাপদ নয়।
বাড়িতে একাধিক ওষুধ থাকলে কোন ওষুধ কখন এবং কতটা খেতে হবে, তা পরিষ্কারভাবে জানা দরকার। কোনো ওষুধ খাওয়ার পর অস্বাভাবিক ঘুম, শ্বাসকষ্ট, অচেতনতা, খিঁচুনি বা গুরুতর অসুস্থতার লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নিতে হবে। চিকিৎসকের পরামর্শ, নিয়মিত ফলোআপ এবং ওষুধ ব্যবহারের সঠিক নিয়ম মেনে চলা অত্যন্ত জরুরি।
লেখক: এমবিবিএস, এফসিপিএস (ফাইনাল পার্ট) — এন্ডোক্রাইনোলজি, বাংলাদেশ মেডিকেল ইউনিভার্সিটি (বিএমইউ)






