শিশুর খাবার নিয়ে জোরাজুরি করবেন না

শিশু খেতে চায় না— এই অভিযোগ বাংলাদেশের ঘরে ঘরে। এক-দুবেলা না খেলে কিংবা কম খেলে শুরু হয় খাবার নিয়ে জোরাজুরি। এর ফলে শিশুর ভেতর খাবার নিয়ে আগ্রহের বদলে ভীতি তৈরি হয়। অথচ খাবার গ্রহণ প্রক্রিয়া হওয়ার কথা ছিল আনন্দদায়ক। কারণ, এটি শিশুর হাত, মুখ ও জিহ্বার পেশির গড়ন ও মানসিক গঠনের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। পাশাপাশি শিশুর মানসিক বিকাশেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
জোর করলে কী হয়
খাবার নিয়ে জোরাজুরির মানসিক প্রভাব সুদূরপ্রসারী। মনে ভয় তৈরি হওয়ায় ক্ষুধা লাগার বিষয়টি চেপে যাওয়া শুরু করে শিশুটি। অভিভাবককে ভয় পাওয়ার কারণও হয়ে দাঁড়ায় এটি। পারস্পরিক মানবিক সম্পর্কগুলোর জন্যও এটি ক্ষতিকর। জোর করে খাওয়ানোর অভ্যাস শিশুর মানসিক বিকাশের প্রতিটি ধাপে প্রভাব ফেলে। কারণ, বেড়ে ওঠার কোনো পর্বে শিশুর বিকাশ বাধাগ্রস্ত হলে অনেক সময় পরবর্তী ধাপগুলোয় তা সমস্যা তৈরি করে। এটি এড়াতে চাইলে শিশুকে নিজের হাতে খেতে উৎসাহ দিতে হবে। খাবারের রঙ ও স্বাদ বুঝে সে তখন খাদ্যগ্রহণের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাকে এক্সপ্লোর করতে শেখে। এটি শিশুকে আত্মবিশ্বাসী ও স্বাবলম্বী করে তোলে।
কী দিয়ে সলিড খাবার শুরু করবেন
পিউরি বা ফিঙ্গার ফুড (গাজর, আলু, মিষ্টি আলু, টমেটোর টুকরো) দিয়ে শিশুর সলিড খাবারের সঙ্গে পরিচয় ঘটে। সদ্য ছয় মাস পার করেছে— এমন শিশুদের মধ্যে বড়দের হাত থেকে খাবার ছিনিয়ে নেওয়ার প্রবণতা থাকে। সামনে কেউ খাবার খেলে তারও খাওয়ার আগ্রহ তৈরি হয়। এ সময় শিশুটি হাতে স্পর্শ করে, খাবারের রঙ, স্বাদ ও টেক্সচার বুঝে খেতে শেখে। এতে হাতের পেশিগুলো সক্রিয় হওয়া শুরু করে। তা না হলে বয়সের তালে তালে খাবারের সঙ্গে শিশুর সুস্থ সম্পর্ক গড়ে ওঠে না।
কীভাবে খাওয়াবেন
আমাদের দেশে শিশুদের প্রতি বেলা টিভি বা মোবাইল ফোন দেখতে দেখতে আলাদাভাবে খাবার খাওয়াতে দেখা যায়। কিন্তু এ প্রক্রিয়া শিশুর সামাজিকীকরণ দুইভাবে দুর্বল করে তোলে। এক, পরিবারে সবার সঙ্গে খেতে বসার পর সবাইকে দেখে উৎসাহিত হওয়ার ব্যাপারটি ব্যাহত হয়। দুই, টিভি বা মোবাইল ফোন শুধু দেখার বিষয়, এর সঙ্গে মতবিনিময়ের সুযোগ পায় না সে। টেবিলে সবাইকে নিয়ে একসঙ্গে খেতে বসলে শিশুটি বড়দের হাত বা প্লেট থেকে খাবার নিয়ে খায়। এটি তাকে পারিবারিক সাহচর্যে বেড়ে উঠতে শেখায়, একই সঙ্গে সে পারিবারিক রীতিনীতির সঙ্গে পরিচিত হয়। এতে তার মধ্যে পারিবারিক বন্ধন দৃঢ় হয়। খাদ্যগ্রহণ প্রক্রিয়াও হয়ে ওঠে আনন্দদায়ক।
লেখক: শিশু মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, শিশু বিকাশ কেন্দ্র, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল




