পিটিএসডি
যে ক্ষত চোখে দেখা যায় না

মডেল : কানিজ ফাতেমা তাজিন। ছবি: সাজ্জাদ হোসেন
বড় ধরনের আঘাতের পর মানুষের মন অনেক ক্ষেত্রেই সময়ের সঙ্গে সাধারণ ছন্দে ফিরে আসতে পারে না। তখন শরীর ও মন সবসময় বিপদের আশঙ্কায় সতর্ক থাকে। লিখেছেন ডা. সুমাইয়া বিনতে জলিল
চৌদ্দ বছর বয়সী নিশাত একসময় স্কুল থেকে ফিরে সারা বাড়ি মাতিয়ে রাখত। কিন্তু এক সন্ধ্যায় প্রতিবেশীর যৌন নিপীড়নের শিকার হওয়ার পর থেকে মেয়েটি পুরোপুরি বদলে গেল। সে কাউকে কিছু বলেনি; শুধু বলেছিল, তার ভালো লাগছে না। এরপর থেকেই তার আচরণে অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা দেয়। সে একা সিঁড়িতে উঠতে ভয় পায়, রাতে চিৎকার করে জেগে ওঠে; আবার সকালে সেই স্বপ্নের কথা মনে করতে পারে না। আগে যে মেয়েটি সবার আগে খেতে বসত, সে এখন খাবার নাড়াচাড়া করে উঠে যায়। তার স্কুলের ফলাফলের অবনতি হয়েছে এবং বন্ধুরা তার কাছ থেকে দূরে সরে গেছে। মা বুঝতে পারেন, মেয়েটি নিজেকেই দোষ দিতে শুরু করেছে। নিশাতের এই অবস্থা কোনো সাধারণ দুর্বলতা নয়; এটি চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় ‘পোস্ট ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিজঅর্ডার’ বা পিটিএসডি, যা মূলত আঘাতজনিত মানসিক রোগ।
রোগটির স্বরূপ
মানুষের মন সাধারণত বড় ধরনের আঘাত সামলে নিতে জানে। দুর্ঘটনা, নিপীড়ন কিংবা প্রিয়জনের মৃত্যুতে মানুষ বিপর্যস্ত হয় ঠিকই; কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে স্বাভাবিক ছন্দে ফিরে আসে। পিটিএসডির ক্ষেত্রে এই স্বাভাবিক পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয়। অতীতের সেই ভয়ংকর ঘটনাটি আর অতীত হয়ে থাকে না; বরং মস্তিষ্কের ভয় নিয়ন্ত্রক অংশে তা বর্তমানকালেই আটকে থাকে। ফলে বিপদ কেটে যাওয়ার পরও শরীর ও মন সবসময় বিপদের আশঙ্কায় সতর্ক হয়ে থাকে। এটি মানুষের কোনো চরিত্রের দুর্বলতা নয় কিংবা ইচ্ছাশক্তির অভাবও নয়। এটি একটি রোগ, যা সঠিকভাবে নির্ণয় ও চিকিৎসা করা সম্ভব।
পিটিএসডি আক্রান্তদের মধ্যে আত্মহত্যায় মৃত্যুঝুঁকি সাধারণের তুলনায় অনেক বেশি ভুক্তভোগী যদি নিপীড়কের সংস্পর্শে থাকেন তবে কোনো থেরাপিতেই কাজ হবে না
চাপজনিত রোগের পরিসর
মানসিক চাপের কারণে সৃষ্ট সমস্যাগুলো একটি পরিবারের মতো দেখা হয়। সাধারণ জীবনের সমস্যার সঙ্গে মানিয়ে নিতে না পারলে তাকে বলা হয় অভিযোজন ব্যাধি। যদি শোক দীর্ঘায়িত হয় এবং জীবন অচল হয়ে পড়ে, তবে তাকে বলা হয় দীর্ঘায়িত শোকজনিত ব্যাধি। আর যদি কোনো প্রাণসংশয়ী ঘটনার পর তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়, তবে তাকে বলা হয় তীব্র চাপজনিত প্রতিক্রিয়া বা পিটিএসডি। শৈশব থেকে বারবার নির্যাতনের শিকার হলে একে জটিল পিটিএসডি বলা হয়।
সময়ের সীমারেখা
তীব্র চাপ প্রতিক্রিয়া আর পিটিএসডির মধ্যে পার্থক্য গড়ে দেয় সময়। ঘটনার তিন দিন থেকে এক মাসের মধ্যে লক্ষণ সীমাবদ্ধ থাকলে তাকে তীব্র চাপজনিত ব্যাধি বলা হয়। লক্ষণ এক মাসের বেশি স্থায়ী হলে তা পিটিএসডি হিসেবে গণ্য হয়। ঘটনার পরপরই আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই। তবে এক মাস পেরিয়ে যাওয়ার পরও অপেক্ষা করাটা ক্ষতিকর।
লক্ষণ চেনার উপায়
পিটিএসডি আক্রান্তদের মধ্যে মূলত চারটি পরিবর্তন দেখা যায়।
- প্রথমত, দুঃস্বপ্ন দেখা বা চোখের সামনে বারবার সেই ঘটনা ফিরে আসা;
- দ্বিতীয়ত, সেই জায়গা বা মানুষকে এড়িয়ে চলার প্রবণতা;
- তৃতীয়ত, ‘সব দোষ আমারই’— এমন নেতিবাচক চিন্তা বা আনন্দের অভাব;
- চতুর্থত, সামান্য শব্দে চমকে ওঠা বা ঘুমের ব্যাঘাত ঘটা।
শিশু ও প্রাপ্তবয়স্কের প্রকাশভঙ্গি এক নয়
প্রাপ্তবয়স্করা তাদের ভয় বা স্মৃতির কথা ভাষায় প্রকাশ করতে পারেন, কিন্তু শিশু-কিশোররা তা পারে না। তাদের রোগ ধরা পড়ে আচরণে। ছোটরা একই ধরনের খেলা বা ছবি আঁকার মাধ্যমে ঘটনাটি ফুটিয়ে তোলে। তাদের দুঃস্বপ্ন প্রায়ই অস্পষ্ট হয়। অনেক সময় বিছানায় প্রস্রাব করা, একা ঘুমাতে ভয় পাওয়া বা মায়ের গা ঘেঁষে থাকার মতো আচরণ দেখা যায়। কৈশোরে এটি রাগ, জেদ বা স্কুল ফাঁকি দেওয়ার মতো ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ হিসেবে প্রকাশ পায়।
আমাদের সমাজে এই পরিবর্তনগুলো প্রায়ই অবাধ্যতা বা অমনোযোগিতা হিসেবে ধরে নেওয়া হয়। ফলে শিশুটি সহানুভূতির বদলে শাস্তি পায়।
প্রকোপ
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, পৃথিবীর প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ জীবনে অন্তত একবার ভয়াবহ অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন, যাদের মধ্যে ৫ দশমিক ৬ শতাংশের পিটিএসডি হয়। বাংলাদেশে প্রাপ্তবয়স্কদের ১৬ দশমিক ৮ ও শিশু-কিশোররা ১৩ দশমিক ৬ শতাংশ মানসিক রোগে আক্রান্ত। কিন্তু আক্রান্ত প্রাপ্তবয়স্কদের ৯২ দশমিক ৩ ও শিশুদের ৯৪ দশমিক ৫ শতাংশ কোনোরকম চিকিৎসা পায় না।
কারণ ও দুটি অপরিহার্য শর্ত
এ রোগের সবচেয়ে বড় কারণ হলো আন্তঃব্যক্তিক সহিংসতা, যেমন— যৌন নিপীড়ন, ধর্ষণ, শারীরিক নির্যাতন, শৈশবের অবহেলা ও মারধর। এর সঙ্গে যুক্ত হতে পারে সড়ক দুর্ঘটনা, অগ্নিকাণ্ড, ঘূর্ণিঝড়, নৌ-দুর্ঘটনা, কোনো সহিংস ঘটনা নিজের চোখে দেখা কিংবা প্রিয়জনের আকস্মিক মৃত্যু। তবে যেকোনো দুঃখজনক ঘটনাই যে এই রোগ তৈরি করবে, তা নয়। রোগ নির্ণয়ের জন্য প্রধানত দুটি শর্ত অপরিহার্য।
প্রথমত, সেই ঘটনাতে প্রাণহানি বা মারাত্মক বিপদের উপাদান থাকতে হবে। অর্থাৎ মৃত্যু, গুরুতর আঘাত বা যৌন সহিংসতার বাস্তব আশঙ্কা থাকতে হবে। যখন মনে হয়, আমি আর বাঁচব না কিংবা আমার সব শেষ হয়ে গেল, তখন সেই মুহূর্তটি মনে স্থায়ী দাগ কেটে যায়।
দ্বিতীয়ত, ঘটনা ও লক্ষণের মধ্যে একটি কালানুক্রমিক সম্পর্ক থাকতে হবে। লক্ষণগুলো ঘটনার আগে ছিল না; বরং ঘটনার পরই শুরু হয়েছে। এই যোগসূত্র প্রতিষ্ঠিত না হলে তাকে পিটিএসডি বলা যাবে না। এ কারণেই রোগীর ইতিহাস জেনে নেওয়ার সময়রেখাটি এত গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষজ্ঞ মূল্যায়ন কেন জরুরি
পিটিএসডির সঙ্গে বিষণ্ণতা, উদ্বেগ বা মাদকনির্ভরতা মিশে থাকতে পারে। তাই লক্ষণ দেখে ‘ভয় পেয়েছে, সেরে যাবে’ না বলে মনোরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া জরুরি, বিশেষ করে শিশু-কিশোরদের ক্ষেত্রে শিশু মনোরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ ভালো ফল দেয়।
চিকিৎসার মূল ভিত্তি হলো নিরাপত্তা। ভুক্তভোগী যদি নিপীড়কের সংস্পর্শে থাকেন, তবে কোনো থেরাপিতেই কাজ হবে না। চিকিৎসায় ‘ট্রমা ইনফর্মড কেয়ার’ বা আঘাত সংবেদনশীল সেবার ধারণাটি খুব কার্যকর। এতে রোগীকে বারবার ঘটনার বিবরণ দিতে বাধ্য না করে সহমর্মিতার সঙ্গে তার কষ্ট বোঝার চেষ্টা করা হয়। প্রধান চিকিৎসা হলো বিভিন্ন ধরনের থেরাপি, যেমন— জ্ঞানমূলক আচরণ থেরাপি, আই মুভমেন্ট থেরাপি বা খেলাভিত্তিক থেরাপি। প্রয়োজনে চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে বিষণ্ণতারোধী ওষুধ ব্যবহার করা হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, পিটিএসডি আক্রান্তদের মধ্যে আত্মহত্যায় মৃত্যুঝুঁকি সাধারণ জনগোষ্ঠীর তুলনায় অনেক বেশি।
নিশাতের গল্পটি শেষ করি। থেরাপি, পারিবারিক সহায়তা আর স্কুলের সহযোগিতায় আট মাস পর সে আবার ক্লাসে ফিরেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৪০ শতাংশ আক্রান্ত ব্যক্তি এক বছরের মধ্যেই সুস্থ হয়ে ওঠেন। তাই রোগটি নিরাময়যোগ্য। সমস্যা হলো আমাদের লোকলজ্জা ও সামাজিক সংকোচ। আমরা এখনো ঘরের ভেতরের ঘটনা ঘরের ভেতরেই রেখে দিই। অথচ যে শিশুটি হঠাৎ বদলে গেছে, তাকে বকা দেওয়ার আগে শুধু একটি প্রশ্ন করলেই অনেক কিছু বদলে যেতে পারে— ‘তোমার সঙ্গে কী ঘটেছিল?’
লেখক: সহকারী অধ্যাপক ও মনোরোগ বিশেষজ্ঞ,
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট, ঢাকা।



