বর্ষাকালের অসুখ-বিসুখ

মডেল: তাসনিম অর্পিতা। ছবি: সাজ্জাদ হোসেন
বর্ষাকালে একটু অসাবধানতাই বড় স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ হতে পারে। বর্ষায় সতর্কতা নিয়ে জানাচ্ছেন ঢাকা মেডিকেল কলেজের সহযোগী অধ্যাপক (মেডিসিন) ডা. মিনহাজ উদ্দিন আহমেদ।
বর্ষায় সবচেয়ে বেশি দেখা যায় ডায়রিয়া, ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া, টাইফয়েড, ম্যালেরিয়া, হেপাটাইটিস ‘এ’ ও ‘ই’, সর্দিকাশি এবং ছত্রাকজনিত ত্বকের সংক্রমণ। এসব রোগের লক্ষণ ও প্রতিরোধ সম্পর্কে জানা থাকলে অনেক জটিলতা এড়ানো সম্ভব।
সর্দিকাশি
প্রচণ্ড গরমের পর হঠাৎ বৃষ্টি ও তাপমাত্রা কমে গেলে শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ বেড়ে যায়। জ্বর, শরীর ও পেশিতে ব্যথা, মাথা ও গলাব্যথা, নাক দিয়ে পানি পড়া, হাঁচি ও কাশি— এসবই সাধারণ উপসর্গ।
ঘরের তাপমাত্রা ২৪-২৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে রাখা ভালো। সাধারণ সর্দিকাশির সঠিক চিকিৎসা না হলে অনেক সময় তা নিউমোনিয়ায় রূপ নিতে পারে।
শিশুর চোখ কোটরে ঢুকে যাওয়া, জিহ্বা শুকিয়ে যাওয়া, প্রস্রাব কমে যাওয়া এসব পানিশূন্যতার লক্ষণ
ডায়রিয়া
বর্ষায় দূষিত পানি ও খাবারের কারণে ডায়রিয়ার প্রকোপ বেড়ে যায়। বারবার পাতলা পায়খানার ফলে শরীর থেকে পানি ও লবণ বেরিয়ে গিয়ে পানিশূন্যতা দেখা দেয়। শিশুর চোখ কোটরে ঢুকে যাওয়া, জিহ্বা শুকিয়ে যাওয়া, অতিরিক্ত তৃষ্ণা, কাঁদলেও চোখে পানি না আসা, প্রস্রাব কমে যাওয়া কিংবা পেটের চামড়া টান দিলে কিছুক্ষণ কুঁচকে থাকা এসব পানিশূন্যতার লক্ষণ। যদি শিশু পানি পান করতে না পারে বা খুব কম পান করে, তাহলে দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে।
ডায়রিয়া হলে খাওয়ার স্যালাইনের পাশাপাশি ভাতের মাড়, চিড়ার পানি বা অন্যান্য নিরাপদ তরল খাবার বারবার খাওয়াতে হবে। শিশুদের বুকের দুধ কখনোই বন্ধ করা যাবে না।
সবসময় বিশুদ্ধ ও নিরাপদ পানি পান করুন।
খাওয়ার আগে এবং টয়লেট ব্যবহারের পর সাবান দিয়ে হাত ধুয়ে নিন।
খাবার ভালোভাবে রান্না করে ও ঢেকে রাখুন।
অস্বাস্থ্যকর বা রাস্তার খোলা খাবার এড়িয়ে চলুন।
রোটাভাইরাসসহ প্রয়োজনীয় টিকা সময়মতো দিন।
শিশুদের নখ ছোট রাখুন এবং হাত ধোয়ার অভ্যাস গড়ে তুলুন।
ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া
বর্ষায় জমে থাকা পরিষ্কার পানিতে এডিস মশা বংশবিস্তার করে। তাই ফুলের টব, এসির ট্রে, পরিত্যক্ত টায়ার, ডাবের খোসা বা যেকোনো পাত্রে তিন দিনের বেশি পানি জমতে দেওয়া যাবে না।
ডেঙ্গুর শুরুতে জ্বর, তীব্র মাথাব্যথা, চোখের পেছনে ব্যথা, শরীর ও হাড়ে ব্যথা, বমি, দুর্বলতা এবং শরীরে লালচে র্যাশ দেখা দিতে পারে। গুরুতর ক্ষেত্রে নাক, মাড়ি বা শরীরের বিভিন্ন স্থান থেকে রক্তপাত হতে পারে। এমন লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
ডেঙ্গু জ্বরে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া প্যারাসিটামল ছাড়া অন্য ব্যথার ওষুধ, বিশেষ করে অ্যাসপিরিন বা আইবুপ্রোফেনজাতীয় ওষুধ খাওয়া উচিত নয়। রোগীকে পর্যাপ্ত তরল খাবার খাওয়াতে হবে এবং প্রাথমিক কয়েক দিন মশারির ভেতরে রাখতে হবে, যাতে অন্য মশা কামড়ে রোগটি ছড়িয়ে দিতে না পারে।
চিকুনগুনিয়ার লক্ষণ অনেকটা ডেঙ্গুর মতো হলেও এতে গিঁট বা জয়েন্টের ব্যথা বেশি হয়। অনেকের ক্ষেত্রে এই ব্যথা দীর্ঘদিন থাকতে পারে। এ রোগের চিকিৎসাও মূলত উপসর্গভিত্তিক।
টাইফয়েড
দূষিত পানি ও খাবারের মাধ্যমে টাইফয়েড ছড়ায়। বর্ষায় বৃষ্টির পানির সঙ্গে জীবাণু পানির উৎসে মিশে যাওয়ায় এ রোগের ঝুঁকি বেড়ে যায়।
রোগের শুরুতে জ্বর, মাথাব্যথা, শরীরব্যথা, কোষ্ঠকাঠিন্য অথবা শিশুদের ক্ষেত্রে ডায়রিয়া ও বমি হতে পারে। পরে পেট ফাঁপা, কাশি, শরীরে লালচে দাগ, এমনকি চিকিৎসা না হলে অন্ত্রে ছিদ্র, রক্তক্ষরণ, মস্তিষ্ক, হৃদযন্ত্র বা কিডনির জটিলতাও দেখা দিতে পারে।
রোগের প্রথম সপ্তাহে শুধু লক্ষণ দেখে টাইফয়েড শনাক্ত করা কঠিন। তাই দীর্ঘদিন জ্বর থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করানো জরুরি।
টাইফয়েড প্রতিরোধে পানি ফুটিয়ে পান করুন।
খাবার ঢেকে রাখুন এবং ভালোভাবে সিদ্ধ করে খান।
পাস্তুরিত বা ভালোভাবে ফোটানো দুধ পান করুন।
স্যানিটারি ল্যাট্রিন ব্যবহার করুন।
ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখুন।
আক্রান্ত ব্যক্তি খাদ্য প্রস্তুতের কাজে অংশ নেবেন না।
বর্ষায় সুস্থতায়
বাইরে বের হলে ছাতা বা রেইনকোট ব্যবহার করুন।
বৃষ্টিতে ভিজলে দ্রুত গোসল করে শরীর ও চুল শুকিয়ে ফেলুন।
পর্যাপ্ত পানি পান করুন।
ভিটামিন ‘সি’সমৃদ্ধ ফল এবং পর্যাপ্ত শাকসবজি খাওয়ার অভ্যাস করুন।




