শিশুর বারবার কাশি সবসময় কি ঠান্ডা-জ্বর দায়ী

মডেল: মেহেরিমা মাহজাবিন, ছবি: সাজ্জাদ হোসেন
শিশুর কাশি হলে অধিকাংশ অভিভাবকের প্রথম ধারণা— ঠান্ডা লেগেছে। কিন্তু বাস্তবে শিশুর বারবার কাশির কারণ সবসময় ঠান্ডা-জ্বর নয়। লিখেছেন ডা. মো শাহজাদা তাবরেজ
শিশুদের সাধারণ ভাইরাসের সংক্রমণের পাশাপাশি হাঁপানি, অ্যালার্জি, নাকের সমস্যা, পরিবেশদূষণ কিংবা শ্বাসতন্ত্রের অন্য কোনো সমস্যার কারণেও কাশি হতে পারে। তাই কাশি কতদিন ধরে হচ্ছে, কখন বেশি হচ্ছে এবং এর সঙ্গে অন্য কোনো উপসর্গ আছে কি না, সেদিকে নজর দেওয়া জরুরি।
সাধারণ সর্দি-কাশি
শিশুর কাশির সবচেয়ে সাধারণ কারণের একটি হলো ভাইরাসজনিত সর্দি-কাশি। স্কুল বা ডে-কেয়ারে যাওয়া শিশু অন্য শিশুদের সংস্পর্শে আসার কারণে বছরে একাধিকবার এমন সংক্রমণ হতে পারে। নাক দিয়ে পানি পড়া, নাক বন্ধ, হাঁচি, গলাব্যথা ও হালকা জ্বরের সঙ্গে কাশি থাকতে পারে। প্রথম কয়েক দিন কাশি বেশি থাকলেও জ্বর ও অন্যান্য উপসর্গ কমে যাওয়ার পরও কিছুদিন কাশি থাকতে পারে। একটি সংক্রমণ ভালো হওয়ার আগেই অন্য ভাইরাসে আক্রান্ত হলে মনে হতে পারে শিশুর সবসময়ই কাশি হচ্ছে।
হাঁপানিও হতে পারে কারণ
শিশুর দীর্ঘদিন বা বারবার কাশির একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো অ্যাজমা বা হাঁপানি। সব শিশুর ক্ষেত্রে শ্বাসকষ্ট বা বাঁশির মতো শব্দ নাও থাকতে পারে। কারও ক্ষেত্রে শুধু বারবার কাশিই প্রধান উপসর্গ হতে পারে।
রাতে বা ভোরে কাশি বাড়া, দৌড়ঝাঁপ বা খেলাধুলার পর কাশি হওয়া, ঠান্ডা বাতাসে কাশি বেড়ে যাওয়া, বারবার শ্বাসকষ্ট বা বুকে চাপ লাগা, শ্বাস নেওয়ার সময় বাঁশির মতো শব্দ হওয়া এবং একই ধরনের কাশি বারবার ফিরে আসা হাঁপানির লক্ষণ হতে পারে। পরিবারের কারও অ্যাজমা বা অ্যালার্জির ইতিহাস থাকলেও বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন। এসব ক্ষেত্রে শুধু কাশির ওষুধ না দিয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
সিগারেটের ধোঁয়া, মশার কয়েলের ধোঁয়া ধুলোবালি, রান্নার ধোঁয়া, বায়ুদূষণ, অতিরিক্ত সুগন্ধি বা স্প্রে এবং ঘরে ছত্রাক বা স্যাঁতসেঁতে পরিবেশ থাকলে কাশি বাড়তে পারে
অ্যালার্জি ও নাকের সমস্যা
অ্যালার্জিক রাইনাইটিস বা নাকের অ্যালার্জির কারণে শিশুর বারবার হাঁচি, নাক দিয়ে পানি পড়া, নাক চুলকানো ও নাক বন্ধ থাকার পাশাপাশি কাশি হতে পারে। নাকের সর্দি গলার পেছন দিয়ে নামলে দীর্ঘদিন শুকনো কাশি থাকতে পারে। বিশেষ করে রাতে বা শোয়ার পর কাশি বাড়তে পারে। নাক দিয়ে স্বচ্ছ পানি পড়া এবং নাক বা চোখ চুলকানোর মতো লক্ষণও থাকতে পারে।
ঘরের পরিবেশের প্রভাব
শিশুর শ্বাসতন্ত্র সংবেদনশীল হওয়ায় ঘরের পরিবেশও কাশি বাড়াতে পারে। সিগারেটের ধোঁয়া, মশার কয়েলের ধোঁয়া, ধুলোবালি, রান্নার ধোঁয়া, বায়ুদূষণ, অতিরিক্ত সুগন্ধি বা স্প্রে এবং ঘরে ছত্রাক বা স্যাঁতসেঁতে পরিবেশ থাকলে কাশি বাড়তে পারে। শিশুর সামনে ধূমপান না করাই যথেষ্ট নয়। ধূমপানের ধোঁয়া কাপড় ও ঘরের বিভিন্ন জিনিসেও থেকে যেতে পারে। তাই শিশুকে ধূমপানের পরিবেশ থেকে পুরোপুরি দূরে রাখা উচিত।
নিউমোনিয়া বা অন্য সংক্রমণ
কাশির সঙ্গে জ্বর, দ্রুত শ্বাস নেওয়া, শ্বাসকষ্ট, বুকের ব্যথা, খেতে না চাওয়া বা অস্বাভাবিক দুর্বলতা থাকলে নিউমোনিয়া বা অন্য সংক্রমণের বিষয়টি বিবেচনা করতে হয়। উচ্চ জ্বর, দ্রুত শ্বাস নেওয়া, শ্বাস নিতে কষ্ট হওয়া, বুক দেবে যাওয়া কিংবা স্বাভাবিক খাওয়া-দাওয়া কমে গেলেও দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
দীর্ঘস্থায়ী কাশিতে যক্ষ্মার ভয়
আমাদের দেশে শিশুর দীর্ঘদিনের কাশির ক্ষেত্রে যক্ষ্মাসহ কিছু দীর্ঘমেয়াদি সংক্রমণের কথাও চিকিৎসক বিবেচনা করতে পারেন। কাশির সঙ্গে দীর্ঘদিন জ্বর, ওজন কমে যাওয়া বা ওজন না বাড়া, ক্ষুধামান্দ্য, রাতে অতিরিক্ত ঘাম, দীর্ঘদিন দুর্বলতা কিংবা যক্ষ্মা আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শের ইতিহাস থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
শ্বাসনালিতে কোনো বস্তু ঢুকে গেলে
খেলনা, বাদাম, খাবারের টুকরো বা ছোট কোনো বস্তু ভুল করে শ্বাসনালিতে ঢুকে গেলে শিশুর হঠাৎ প্রচণ্ড কাশি শুরু হতে পারে। খেলতে বা খেতে গিয়ে হঠাৎ কাশি শুরু হওয়ার পর তা একটানা চলতে থাকলে, শ্বাসে অস্বাভাবিক শব্দ হলে বা একপাশের ফুসফুসে বেশি সমস্যা মনে হলে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিতে হবে এবং দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে।
কাশি হলেই কি অ্যান্টিবায়োটিক দরকার
না। শিশুর অধিকাংশ সাধারণ সর্দি-কাশি ভাইরাসজনিত। এসব ক্ষেত্রে সাধারণত অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োজন হয় না। অপ্রয়োজনে অ্যান্টিবায়োটিক দিলে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হতে পারে এবং অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স তৈরি হতে পারে। ভবিষ্যতে প্রয়োজনীয় অ্যান্টিবায়োটিকও কম কার্যকর হতে পারে। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া শিশুকে অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া উচিত নয়।
কাশির সিরাপও নিজের ইচ্ছায় নয়
শিশুর বয়স অনুযায়ী সব ধরনের কাশির ওষুধ নিরাপদ নয়। বিশেষ করে ছোট শিশুর ক্ষেত্রে নিজের সিদ্ধান্তে কাশির সিরাপ, অ্যান্টিবায়োটিক বা স্টেরয়েড দেওয়া উচিত নয়। কাশির কারণ না জেনে শুধু কাশি বন্ধ করার চেষ্টা করলে মূল রোগটি আড়ালে থেকে যেতে পারে।
কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন
শিশুর শ্বাসকষ্ট, খুব দ্রুত শ্বাস নেওয়া, শ্বাস নেওয়ার সময় বুক দেবে যাওয়া, ঠোঁট বা মুখ নীলচে হয়ে যাওয়া, দীর্ঘস্থায়ী বা বারবার ফিরে আসা জ্বর-কাশির সঙ্গে রক্ত আসা, খাওয়া বা পানি পান উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়া কিংবা অস্বাভাবিক নিস্তেজ বা ঘুমঘুম ভাব দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। একইভাবে কয়েক সপ্তাহ কাশি না কমলে বা খেলাধুলা ও দৌড়ানোর সময় নিয়মিত কাশি বা শ্বাসকষ্ট হলে চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে।
অভিভাবকদের করণীয়
শিশুকে পর্যাপ্ত পানি ও তরল খাবার দিতে হবে। ধোঁয়া, ধুলোবালি ও বায়ুদূষণ থেকে দূরে রাখতে হবে। ঘর পরিষ্কার রাখতে হবে এবং পর্যাপ্ত বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা করতে হবে। শিশুর সামনে কেউ ধূমপান করবেন না। কাশি কখন বেশি হচ্ছে— রাতে, ভোরে, খেলাধুলার পর নাকি ঠান্ডায়, তা খেয়াল করুন। পাশাপাশি জ্বর, শ্বাসকষ্ট, হাঁচি বা নাক দিয়ে পানি পড়ছে কি না, তাও লক্ষ করুন। বারবার কাশি হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে এবং নিজের সিদ্ধান্তে অ্যান্টিবায়োটিক বা কাশির ওষুধ শুরু করা যাবে না।
লেখক: এমডি (বক্ষব্যাধি), সহকারী অধ্যাপক, মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, ঢাকা






