১৪ জুন বিশ্ব রক্তদাতা দিবস
রক্তদানের আগে মানতে হবে নিয়ম

একজন সুস্থ মানুষের দেওয়া রক্ত বাঁচিয়ে দিতে পারে মুমূর্ষু রোগীর প্রাণ। সংকটের মুহূর্তে মানুষের পাশে থাকার সবচেয়ে ভালো উপায় হতে পারে রক্তদান। তবে এ ক্ষেত্রে কেবল আবেগ নয়, সচেতনতা ও কিছু সুনির্দিষ্ট গাইডলাইন মেনে চলা অত্যন্ত জরুরি।
আদর্শ রক্তদাতার যোগ্যতা ও বয়সসীমা
নিরাপদ রক্ত পরিসঞ্চালন আইন অনুযায়ী, একজন রক্তদাতার বয়স ন্যূনতম ১৮ থেকে ৬০ বছর হতে হবে। তবে এই বয়স নির্ধারণের পেছনে সুনির্দিষ্ট কিছু কারণ রয়েছে—
• লিগ্যাল বা আইনি দিক: রক্ত দেওয়ার সময় রক্তদাতাকে একটি সম্মতিপত্রে স্বাক্ষর করতে হয়। বাংলাদেশে ১৮ বছর বয়সে একজন নাগরিক আইনগতভাবে স্বাধীন সিদ্ধান্ত বা কনসেন্ট দেওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেন।
• মেডিকেল বা শারীরিক দিক: ১৮ বছরের নিচে মানুষের শরীর বাড়ন্ত অবস্থায় (গ্রোইং এজ) থাকে। এ সময়ে শরীরে আয়রনের চাহিদা অনেক বেশি থাকে। এ সময় রক্তদান কিশোর বয়সের শরীরের জন্য ক্ষতিকর।
যদিও কাগজে-কলমে ৬০ বছর পর্যন্ত রক্ত দেওয়া যায়, তবে আমাদের জীবনযাত্রার কারণে ৪০ বছর পেরোলেই শরীরে নানা রোগ বাসা বাঁধতে শুরু করে। তাই রক্ত দেওয়ার আগে একজন চিকিৎসকের মাধ্যমে প্রেশার, পালস এবং সাধারণ কিছু শারীরিক পরীক্ষা করিয়ে নেওয়া জরুরি।
ওজন এবং অন্যান্য শারীরিক শর্ত
• ওজন: আন্তর্জাতিক গাইডলাইনে নারীদের ক্ষেত্রে ন্যূনতম ওজন ৪৫ কেজি বলা হলেও আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে নারী ও পুরুষ উভয়ের জন্যই ন্যূনতম ওজন ৫০ কেজি হওয়া উচিত। একজন সুস্থ মানুষের শরীর থেকে সাধারণত ৪৫০ মিলি রক্ত নেওয়া হয়। ওজন কম হলে রক্তদাতার মাথা ঘোরা বা জ্ঞান হারানোর মতো জটিলতা দেখা দিতে পারে।
• হিমোগ্লোবিনের মাত্রা: রক্ত দেওয়ার আগে রক্তদাতার নিজের শরীরে পর্যাপ্ত রক্ত আছে কি না, তা পরীক্ষা করা হয়। পুরুষের ক্ষেত্রে হিমোগ্লোবিনের মাত্রা ন্যূনতম ১২ থেকে ১২.৫ এবং নারীর ক্ষেত্রে ১১.৫ থেকে ১২ থাকা জরুরি।
রক্তদানে নিষেধাজ্ঞা
সবাই চাইলেই সবসময় রক্ত দিতে পারেন না। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় একে ‘ডেফারেল’ বা রক্তদানে অস্বীকৃতি বলা হয়। এটি দুই ধরনের—
১. সাময়িক নিষেধাজ্ঞা
নির্দিষ্ট কিছু কারণে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য রক্ত দেওয়া বন্ধ রাখতে হয়:
• অ্যান্টিবায়োটিক: কেউ কোনো রোগের জন্য অ্যান্টিবায়োটিক খেলে ওষুধের কোর্স শেষ হওয়ার পর কমপক্ষে দুই সপ্তাহ (১৪ দিন) অপেক্ষা করতে হবে।
• ডেঙ্গু: ডেঙ্গু থেকে পুরোপুরি সুস্থ হওয়ার পর পরবর্তী ৬ মাস রক্ত দেওয়া যাবে না।
• নারীদের বিশেষ অবস্থা: মাসিক চলাকালীন রক্ত না দেওয়াই ভালো। এ ছাড়া গর্ভাবস্থায় ও সন্তান জন্মদানের পর প্রথম ৬ মাস (বুকের দুধ খাওয়ানোর সময়) মায়েরা রক্ত দিতে পারবেন না।
• রক্তদানের ব্যবধান: নিয়মিত রক্তদাতাদের ক্ষেত্রে পুরুষরা প্রতি ৪ মাস পরপর এবং নারীরা প্রতি ৬ মাস পরপর রক্ত দিতে পারবেন।
২. স্থায়ী নিষেধাজ্ঞা
কিছু রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিরা জীবনে কখনোই রক্ত দিতে পারবেন না—
• যেকোনো ধরনের হৃদরোগ, যাদের হার্টে রিং পরানো বা বাইপাস সার্জারি হয়েছে।
• ক্যানসার বা ম্যালিগন্যান্সির ইতিহাস থাকলে।
বাধ্যতামূলক স্ক্রিনিং টেস্ট
রক্ত সংগ্রহ করার পর রক্তদাতা ও গ্রহীতা— উভয়ের সুরক্ষার জন্য ৫টি স্ক্রিনিং টেস্ট করা আইনি বাধ্যবাধকতা। এই টেস্টগুলোর মাধ্যমে রক্তে কোনো জীবাণু আছে কি না, তা নিশ্চিত করা হয়:
• হেপাটাইটিস বি
• হেপাটাইটিস সি
• এইচআইভি/ এইডস
• সিফিলিস
• ম্যালেরিয়া
লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, ট্রান্সফিউশন মেডিসিন বিভাগ, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়




