গ্যাস্ট্রিকের ওষুধের বিপদ কোথায়

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
‘গ্যাস্ট্রিক হয়েছে’— বাংলাদেশে এটি যেন দৈনন্দিন জীবনের একটি পরিচিত বাক্য। পেটে জ্বালাপোড়া, বুকজ্বালা, টক ঢেঁকুর, পেট ফাঁপা কিংবা ওপরের পেটে অস্বস্তি হলে অনেকেই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ‘গ্যাসের ওষুধ’ সেবন শুরু করেন। আবার অনেক রোগী দীর্ঘদিন ধরে প্রতিদিন একই ওষুধ খেয়ে যাচ্ছেন, কিন্তু কেন খাচ্ছেন বা কতদিন খাওয়া প্রয়োজন— তা হয়তো জানেন না।
বিশেষ করে প্রোটন পাম্প ইনহিবিটর বা পিপিআই (PPI) , যেমন— omeprazole, esomeprazole, pantoprazole ও rabeprazole বাংলাদেশে বহুল ব্যবহৃত। সঠিক রোগীর ক্ষেত্রে এসব ওষুধ অত্যন্ত কার্যকর। কিন্তু অপ্রয়োজনীয় বা দীর্ঘদিনের ব্যবহার হলে কিছু ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
কীভাবে কাজ করে?
আমাদের পাকস্থলীতে খাবার হজমের জন্য হাইড্রোক্লোরিক অ্যাসিড তৈরি হয়। এই অ্যাসিড প্রয়োজনীয় হলেও অতিরিক্ত অ্যাসিড বা পাকস্থলীর উপাদান খাদ্যনালিতে উঠে এলে বুকজ্বালা, টক ঢেঁকুর ও অস্বস্তি হতে পারে।
পিপিআই পাকস্থলীর অ্যাসিড তৈরির শেষ ধাপকে বাধাগ্রস্ত করে। ফলে অ্যাসিড উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। এ কারণেই গ্যাস্ট্রো-ইসোফেজিয়াল রিফ্লাক্স ডিজিজ বা GERD, পেপটিক আলসার এবং কিছু নির্দিষ্ট অ্যাসিড-সম্পর্কিত রোগে পিপিআই কার্যকর চিকিৎসা।
তবে পেটের সব অস্বস্তিই অ্যাসিডের কারণে হয় না। বদহজম, কোষ্ঠকাঠিন্য, ইরিটেবল বাওয়েল সিনড্রোম, খাদ্যাভ্যাস, কিছু ওষুধ কিংবা অন্য রোগও একই ধরনের উপসর্গ সৃষ্টি করতে পারে। ফলে ‘পেটে সমস্যা = গ্যাসের ওষুধ’— এ ধারণা সবসময় সঠিক নয়।
কেন দেওয়া হয়?
পিপিআই ব্যবহারের যথেষ্ট চিকিৎসাগত কারণ রয়েছে। GERD, পাকস্থলী বা ডুওডেনামের আলসার, কিছু রোগীর ক্ষেত্রে NSAID-জাতীয় ব্যথানাশক ওষুধ ব্যবহারে আলসারের ঝুঁকি কমানো এবং Helicobacter pylori নির্মূলের নির্দিষ্ট চিকিৎসা ব্যবস্থায় পিপিআই ব্যবহার করা হয়।
বিপদ কোথায়?
পিপিআইয়ের সমস্যা মূলত ওষুধটির কার্যকারিতায় নয়; বরং অপ্রয়োজনীয় ব্যবহার, ভুল রোগে ব্যবহার, অতিরিক্ত মাত্রা এবং প্রয়োজন শেষ হওয়ার পরও দীর্ঘদিন চালিয়ে যাওয়ায়।
দীর্ঘমেয়াদি পিপিআই ব্যবহারের সঙ্গে কিছু সম্ভাব্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার সম্পর্ক বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে। এর মধ্যে কিছু অন্ত্রের সংক্রমণ, magnesium-এর মাত্রা কমে যাওয়া এবং কিছু কিডনি-সংক্রান্ত সমস্যার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। কিছু গবেষণায় হাড় ভাঙার ঝুঁকির সঙ্গেও সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
পিপিআই খেলেই কিডনি নষ্ট হবে বা হাড় দুর্বল হয়ে
যাবে— এমন মনে করা ঠিক নয়। বরং রোগীর প্রয়োজন, অন্যান্য রোগ, বয়স, ব্যবহারের সময়কাল এবং অন্যান্য ওষুধ বিবেচনা করে চিকিৎসককে সিদ্ধান্ত নিতে হয়।
‘গ্যাসের ওষুধ’ কি সব একই?
একেবারেই নয়; Antacid, alginate, H2-receptor antagonist এবং পিপিআই— প্রতিটির কাজ ও ব্যবহারের ক্ষেত্র আলাদা। তাই পরিবারের অন্য সদস্যের প্রেসক্রিপশন দেখে নিজের জন্য একই ওষুধ শুরু করা উচিত নয়।
বিশেষ করে aspirin, clopidogrel, anticoagulant, NSAID কিংবা অন্যান্য নিয়মিত ওষুধ গ্রহণকারী রোগীর ক্ষেত্রে পিপিআই প্রয়োজন কি না এবং সম্ভাব্য drug interaction আছে কি না— তা চিকিৎসককে বিবেচনা করতে হয়।
কতদিন খাব?
এটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। কেউ যদি দীর্ঘদিন ‘গ্যাসের ওষুধ’ খান, তাহলে চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করে দেখা দরকার— এখনো কি ওষুধটি প্রয়োজন? রোগের কারণ নির্ণয় করা হয়েছে কি? ডোজ কমানো বা বন্ধ করা সম্ভব কি?
দীর্ঘদিন পিপিআই ব্যবহারের পর নিজের ইচ্ছায় হঠাৎ বন্ধ করাও সবসময় উপযুক্ত নয়। কিছু রোগীর ক্ষেত্রে বন্ধ করার পর সাময়িকভাবে অ্যাসিড-সংক্রান্ত উপসর্গ বেড়ে যেতে পারে। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ কমানো বা বন্ধ করা উচিত।
কখন সতর্ক হবেন?
বারবার বা দীর্ঘদিনের বুকজ্বালা, খাবার গিলতে কষ্ট, গিললে ব্যথা, অকারণে ওজন কমে যাওয়া, বারবার বমি, রক্তবমি, কালো পায়খানা কিংবা ক্রমাগত বাড়তে থাকা উপসর্গ থাকলে শুধু ‘গ্যাসের ওষুধ’ খেয়ে সময় নষ্ট করা উচিত নয়। এসব ক্ষেত্রে চিকিৎসকের মূল্যায়ন প্রয়োজন।
নিজে থেকে দীর্ঘদিন গ্যাসের ওষুধ খাবেন না এবং অন্যের প্রেসক্রিপশন অনুসরণ করবেন না। কারণ, ভালো চিকিৎসা শুধু রোগের উপসর্গ কমায় না; অপ্রয়োজনীয় ওষুধের ব্যবহার থেকেও রোগীকে রক্ষা করে।
লেখক: উপমহাব্যবস্থাপক, ইউনিমেড ইউনিহেলথ ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড



