ঘুমিয়েও ক্লান্তি কাটছে না? আর্থ্রাইটিসের ‘নীরব’ উপসর্গ

জয়েন্টের সুস্থতায় চালু রাখতে হবে নড়াচড়া
আর্থ্রাইটিস বললেই মনে আসে জয়েন্টের ব্যথা, ফোলা আর শক্ত হয়ে থাকা। কিন্তু অনেক রোগীর জন্য সবচেয়ে কষ্টের উপসর্গ হলো ক্লান্তি। রাতে পুরো ঘুমের পরেও শরীর ঝরঝরে বা ফ্রেশ লাগে না। বিছানা থেকে ওঠা, রান্না, অল্প হাঁটা বা ঘরের কাজও অস্বাভাবিক ভারী মনে হয়।
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বলছেন, আর্থ্রাইটিসের ক্লান্তি শুধু বয়সের ফল নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ, ঘুমের ব্যাঘাত, ব্যথা, মানসিক চাপ এবং নড়াচড়া কমে যাওয়া। এ ক্লান্তি বিশ্রামে সবসময় কমে না। তাঁর ব্যাখ্যায় এখানে একটি দুষ্টচক্র কাজ করে। ব্যথার কারণে নড়াচড়া কমে, নড়াচড়া কমলে পেশি দুর্বল হয়, আর দুর্বল শরীরে সাধারণ কাজও বেশি ক্লান্তিকর হয়ে ওঠে। আবার ব্যথা ঘুম ভাঙায়, আর কম ঘুমে ব্যথা ও ক্লান্তি দুটোই বাড়ে।
বিষয়টি কত ব্যাপক, তা জার্মানির একটি গবেষণার খবরে উঠে এসেছে। সেখানকার গবেষকরা প্রায় ১০ হাজার রোগীর তথ্য বিশ্লেষণ করেছেন। তাতে দেখা গেছে, প্রদাহজনিত রিউমাটিক রোগে আক্রান্তদের প্রায় ৫৫ থেকে ৬৭ শতাংশ ক্লান্তিতে ভোগেন, আর ২৬ শতাংশ পর্যন্ত রোগীর ক্লান্তি তীব্র। ২০০৭ থেকে ২০২৩ সালের তথ্যে ক্লান্তির গড় মাত্রা প্রায় একই থেকেছে, যদিও এই সময়ে প্রদাহ নিয়ন্ত্রণে অনেক অগ্রগতি হয়েছে। ক্লান্তি বাড়বে না কমবে, তার সঙ্গে প্রদাহের ল্যাব-সূচকের চেয়ে মানসিক স্বস্তি, শারীরিক সক্ষমতা, মানিয়ে নেওয়ার কৌশল ও ঘুমের মানের সম্পর্ক বেশি পাওয়া গেছে। তাই গবেষকদের মতে, শুধু প্রদাহ নিয়ন্ত্রণ নয়, চিকিৎসায় মানসিক স্বস্তি, শারীরিক সক্ষমতা ও সামাজিক সহায়তাকেও গুরুত্ব দেওয়া দরকার। ক্লান্তি যে কেবল প্রবীণদের সমস্যা নয়, অনেক প্রতিবেদনেও তা এসেছে। সেখানে ২০ বছর বয়সীদের জন্য আর্থ্রাইটিসের সম্ভাব্য সতর্কসংকেতের তালিকায় ঘন ঘন ক্লান্তি ও কম শক্তির কথা বলা হয়েছে, বিশেষ করে প্রদাহজনিত আর্থ্রাইটিসে।
তাহলে করণীয় কী? প্রথমত, নড়াচড়া চালু রাখতে হবে, জয়েন্টের কথা ভেবে। একেবারে বসে থাকলে শক্ত ভাব ও পেশির দুর্বলতা বাড়ে। ধীরে হাঁটা, স্ট্রেচিং, পানিতে ব্যায়াম এবং বিশেষজ্ঞের তত্ত্বাবধানে শক্তি বাড়ানোর ব্যায়াম উপকারী। সারাদিনে অল্প অল্প করে নড়লেও কাজ হয়, তবে ব্যায়াম যেন নতুন ব্যথার কারণ না হয়। যুক্তরাজ্যের একটি গবেষণার খবরও এ কথাই বলছে। প্রদাহজনিত রিউমাটিক রোগের ৩৬৮ জন রোগীর ওপর ফোনে দেওয়া শারীরিক কার্যকলাপের কর্মসূচি এবং কগনিটিভ বিহেভিয়ারাল থেরাপি (টক থেরাপি) পরীক্ষা করা হয়। সাধারণ যত্নের তুলনায় এই দুই পদ্ধতিতেই ক্লান্তি উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ঘুম, মানসিক স্বাস্থ্য ও জীবনমানেও উন্নতি হয়েছে, আর চিকিৎসা শেষ হওয়ার পর ছয় মাস পর্যন্ত এর সুফল ছিল।
দ্বিতীয়ত, ঘুমকে চিকিৎসার অংশ করে নিতে হবে। প্রতিদিন একই সময়ে ঘুমাতে যান ও উঠুন, সন্ধ্যার পর ক্যাফেইন এড়ান, শোয়ার আগে স্ক্রিন কমান এবং ঘুমের পরিবেশ আরামদায়ক রাখুন। রাতে ব্যথা বারবার ঘুম ভাঙালে সেটিকে "আর্থ্রাইটিসে এমন হয়" বলে এড়িয়ে যাবেন না, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলুন। তৃতীয়ত, খাবারের দিকে নজর দিন। খাবার আর্থ্রাইটিসের চিকিৎসার বিকল্প নয়, তবে শক্তি ধরে রাখতে সাহায্য করে। শাকসবজি, ফল, দানাশস্য, বাদাম ও প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার রাখুন এবং সারাদিন পর্যাপ্ত পানি পান করুন।
চতুর্থত, কাজ ভাগ করে শক্তি বাঁচান। প্রতিটি কাজ একটানা শেষ করতে হবে, এই ধারণা ছাড়ুন। ঘরের কাজ ছোট ভাগে করে মাঝে বিরতি নিন, সবজি কাটার সময় বসুন, দরকারি জিনিস হাতের কাছে রাখুন এবং অকারণে ঘরময় হাঁটাহাঁটি কমান। যুক্তরাষ্ট্রের একটি শীর্ষ স্বাস্থ্য গবেষণা প্রতিষ্ঠান ব্যায়াম ও বিশ্রামের ভারসাম্য রাখার পরামর্শ দেয়। দীর্ঘক্ষণ বিছানায় না থেকে ছোট ছোট বিরতি নেওয়া বেশি উপকারী।
পঞ্চমত, ক্লান্তিকে গুরুত্ব দিন, লজ্জা পাবেন না। যুক্তরাজ্যের গবেষণায় অংশ নেওয়া লুপাস ও স্যোগ্রেন্স সিনড্রোমে আক্রান্ত এক রোগী বলেছেন, বাগানে কাজ করলে পরদিন তাঁর আর বেশি ক্লান্ত ও শরীর খারাপ বোধ করেন। এমন অভিজ্ঞতা অনেকেরই। পরিবারের সদস্যদের বুঝিয়ে বলুন যে ক্লান্তি রোগেরই অংশ, আর কোনো দিন শরীর ভালো, কোনো দিন খারাপ থাকতে পারে। ওই খবরে একটি আর্থ্রাইটিস সহায়তা সংস্থার কর্মকর্তা বলেছেন, ক্লান্তি অনেক সময় চিকিৎসকদের চোখেই পড়ে না, আর সাধারণ ওষুধে তা সবসময় কমে না। তাই চিকিৎসককে নিজে থেকেই বিষয়টি জানানো জরুরি।
তবে সব ক্লান্তির জন্য আর্থ্রাইটিসকে দায়ী করা ঠিক নয়। ক্লান্তি হঠাৎ বাড়লে বা নতুন ওষুধের পর বাড়লে চিকিৎসককে জানান, কারণ এটি রোগ নিয়ন্ত্রণে না থাকার ইঙ্গিত হতে পারে। অ্যানিমিয়া, থাইরয়েডের সমস্যা বা সংক্রমণও ক্লান্তির কারণ হতে পারে। উপসর্গ ও চিকিৎসার ইতিহাস দেখে চিকিৎসক প্রয়োজনীয় পরীক্ষা দেবেন। নিজে থেকে ওষুধ বন্ধ বা বদল করবেন না।
আর্থ্রাইটিস মানেই ক্লান্তি মেনে নেওয়া নয়। রোগ নিয়ন্ত্রণ, পরিমিত নড়াচড়া, ভালো ঘুম আর পরিকল্পিত কাজের ভাগাভাগি, এই চারটির সমন্বয়ে দৈনন্দিন জীবন অনেক সহজ হতে পারে। লক্ষ্য সারাক্ষণ কর্মক্ষম থাকা নয়, বরং চলাফেরা আর বিশ্রামের মধ্যে টেকসই ভারসাম্য খোঁজা।
সূত্র: টাইমস অফ ইন্ডিয়া, লিমেরিক লিডার (পি এ মিডিয়া), ইটিভি ভারত।



