যে মা কখনো ভালো দিন দেখেননি

ছবি: আগামীর সময়
সংসার ও সন্তানদের জন্য আজীবন লড়ে গেছেন। এখন তিনি ক্যানসারে আক্রান্ত। তাকে বাঁচানোর লড়াইয়ে নেমেছেন বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া কন্যা। বিস্তারিত আখলাকুজ্জামান অনিকের লেখায়
ঈদের আগের রাত। বাকি সবার ঘরে তখন সেমাইয়ের ঘ্রাণ, শিশুদের কলরব। কিন্তু ময়মনসিংহের ছোট্ট বাসায় সেই রাতে একটি মেয়ে তার মায়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন। মেয়েটির নাম ক্যামেলিয়া শারমিন চূড়া। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগের শিক্ষার্থী। বগুড়ার মেয়ে। সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান। আর তার মা, যিনি সারাজীবন শুধু দিয়েই গেছেন, কখনো কিছু চাননি, তিনি এখন বিছানায় শুয়ে মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করছেন।
নওগাঁর এক প্রত্যন্ত গ্রামে জন্ম তার মা শাহীন সুলতানার। ভাঙা পরিবার, অভাবের ছায়া, ছোটবেলা থেকেই সংগ্রাম। খুব অল্প বয়সে বিয়ে। তারপর সংসার, তিনটি সন্তান। শাহীন সুলতানা বলতেন, ‘আমার পুরো জীবনটাই যুদ্ধের ছিল। কিন্তু তোরা জন্মানোর পর মনে হলো, এই যুদ্ধ লড়ে দেওয়ার জন্য তিনজন সৈনিক এসে গেছে।’
সেই সৈনিকদের বড় করতে গিয়ে মা নিজে কখনো থামেননি। স্বামীর বদলির চাকরিতে দিনাজপুর, বগুড়া, ময়মনসিংহ যেখানেই গেছেন, পরিবারকে এক হাতে আগলে রেখেছেন। কোনো প্রাইভেট টিউটর ছিল না সন্তানদের জন্য; নিজেই পড়াতেন। চূড়ার বাবা মো. আব্দুর রহমান পাশে বসে বুঝিয়ে দিতেন। সেই ভালোবাসার আলোয় চূড়া পরীক্ষায় ভালো ফল করেছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছেন।
পাড়ার মানুষ বললেন, এই মায়ের মতো দয়ালু মানুষ তারা দেখেননি। কেউ একবার এলে দুবেলা না খাইয়ে ছাড়তেন না। নিজে কম খেয়েছেন, কিন্তু অতিথির থালা কখনো ফাঁকা রাখেননি। সেই মা এখন অন্যের সাহায্যের অপেক্ষায়।
ঈদের ঠিক আগের দিন মায়ের শরীর হঠাৎ একেবারে ভেঙে পড়ল। ডাক্তার জানালেন, বায়োপসি করাতে হবে। রিপোর্ট আসতে সাত দিন। সেই দিনগুলো চূড়া কীভাবে পার করেছে, তা হয়তো ভাষায় প্রকাশ করা অসম্ভব। রাতে ঘুম নেই, দিনে ভয়, বুকের ভেতরে এক অজানা আতঙ্ক। তারপর রিপোর্ট এলো। রেকটাল অ্যাডেনোকার্সিনোমা। সহজ ভাষায় ক্যানসার। চতুর্থ স্টেজে। মলদ্বারের গ্রন্থি থেকে সৃষ্ট এই ক্যানসার শরীরের অন্যান্য দূরবর্তী অঙ্গে, যেমন— লিভার বা ফুসফুসে ছড়িয়ে পড়ে। এই জননীর লিভার ও ফুসফুস আক্রান্ত। শরীরের ভেতরে আরও ছড়িয়ে পড়েছে। চূড়া বললেন, ‘সেদিন মনে হয়েছিল, মাটি সরে যাচ্ছে পায়ের নিচ থেকে। আমরা পুরো পরিবার যেন রাতারাতি ভেঙে পড়লাম।’ চূড়াদের পরিবার পাঁচজনের। বাবা অবসরপ্রাপ্ত চাকরিজীবী। সরকারি চাকরি ছিল না; তাই পেনশন নেই। বড় বোন কানিজ শারমিন একটি উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক। ছোট ভাই সবে এসএসএসি পরীক্ষা দিয়েছে। আর বাবা? তিনি প্রায় অসাড় শরীর নিয়ে এক মাস ধরে বগুড়ার ছোট্ট বাড়িটার কাগজপত্র ঠিক করছেন। কারণ, স্ত্রীর চিকিৎসার টাকা জোগাড়ের জন্য বাড়ি বিক্রি করে দেবেন। আধা-পক্ষাঘাতগ্রস্ত, হাঁটতে পারেন না ঠিকমতো, তবু থামেননি।
চূড়া এখন ঢাকায়। পরিচিতদের বাসায় থেকে মাকে নিয়ে এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে ছুটছেন। প্রথম কেমো শুরু হয়েছে। কিন্তু সামনে দীর্ঘ পথ— কেমোথেরাপি, টার্গেটেড থেরাপি, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, হাসপাতালের খরচ। চিকিৎসকরা বলছেন, দুই বছরে খরচ হতে পারে ৫০ থেকে ৭০ লাখ টাকা। পুরো পরিবারের যা সম্পদ, সব বিক্রি করলেও সে টাকা হবে না। চূড়া নিজেও স্বেচ্ছাসেবী। ২০১৬ সাল থেকে পাহাড়ধস, বন্যা, কারখানার অগ্নিকাণ্ডসহ বিভিন্ন দুর্যোগে মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন। রক্ত সংগ্রহ করেছেন, ত্রাণ পৌঁছে দিয়েছেন। আজ তিনিই সাহায্য চাইছেন সবার কাছে। বললেন, ‘জানি না এতে কতটা কাজ হবে। কিন্তু আমি যাদের জন্য দৌড়িয়েছি, বিশ্বাস করি, তারা আমার পাশে দাঁড়াবেন।’ আরও বললেন, ‘আম্মু কখনো ভালো দিন দেখেননি। সারা জীবন শুধু সংগ্রাম করেছেন। আমরা যখন একটু ভালো অবস্থায় যাব, তিনি একটু স্বস্তির শ্বাস নেবেন— এই স্বপ্ন ছিল আমাদের। সেই সময় আসার আগেই তাকে হারিয়ে ফেলার কষ্ট বইতে পারব না।’
সাহায্য করার উপায়
KAMELIYA SHARMIN
অ্যাকাউন্ট নাম্বার : ১৪৮১৫৭০৪৯৭৬৬১
শ্যামলী ব্রাঞ্চ
ডাচ্-বাংলা ব্যাংক পিএলসি
KANIJ SHARMIN
অ্যাকাউন্ট নাম্বার : ১৫৫১১০৪৫২৭৭৬৫০০১
উত্তরা জসিমউদদীন অ্যভিনিউ ব্রাঞ্চ
ব্র্যাক ব্যাংক পিএলসি
বিকাশ ও নগদ: ০১৭৯১৯৩১৫৩১





