লিসবনে কালচারাল শক

লেখকের সঙ্গে মিস বিআ ও মিস্টার পাওলো
পর্তুগাল পৌঁছেই পেয়িং গেস্ট হিসেবে উঠলেন এক প্রবীণ দম্পতির বাসায়। বিচিত্র সব অভিজ্ঞতা হলো। সেসব নিয়েই লিখেছেন হুমায়ূন আহমেদ শ্রাবণ
পর্তুগিজ মিস বিআ ও সাউথ আফ্রিকান বংশোদ্ভূত মিস্টার পাওলোর বাসায় উঠি গত বছরের আগস্ট মাসে। ঘরভর্তি নানান পেইন্টিং। হাজার মাইল দূরের শহরে কোনো মানুষ ছিল না আমাকে রিসিভ করার। গুগল ম্যাপ আর রাইড শেয়ারিং অ্যাপসের সুবাদে সব কিছু জলবৎ তরলং হয়ে গেল। আগের দিনে যারা দেশের বাইরে একা পড়াশোনা করতে যেত, তারা কীভাবে যে ম্যানেজ করত!
লিসবনের এয়ারপোর্টে নেমে যখন কীভাবে কী করব বুঝতে পারছিলাম না, তখন হোয়াটসঅ্যাপে মিস বিআর টেক্সট এলো পর্তুগিজ ভাষায়। গুগল ট্রান্সলেটর দিয়ে চেক করে যা বুঝলাম তা হলো, তারা দুজনই বাসায় আমার জন্য অপেক্ষা করছে। আমার মনে হলো, মানুষগুলো নিশ্চয়ই ভীষণ আন্তরিক ।
বাসার সামনে গাড়ি থামতেই নিচে নেমে এলো ৮০-ঊর্ধ্ব মিস্টার পাওলো। আমার লাগেজ নিজে নিয়ে সিঁড়িতে ওঠালেন! অবাক হলাম, এত শক্তি কীভাবে এই বয়সে! আসলে পর্তুগিজ বয়োজ্যেষ্ঠ মানুষদের মনের শক্তি অনেক।
ওপরে গিয়ে দেখা হলো মিস বিআর সঙ্গে। বয়স ঠিক অনুমান করা যায় না। এখনো খুব পরিপাটি, সুন্দর একজন মানুষ। দেখে অনুমান করা যায়, তরুণ বয়সে তিনি আরও বেশি সুন্দরী ছিলেন। মিস বিআ জানালেন, তারা বাটার চিকেনকারি আর রুটি খুব পছন্দ করেন। একদিন আমাকে নিয়ে ইন্ডিয়ান রেস্টুরেন্টে খেতে যেতে চান। মিস বিআ ইংরেজি জানেন না, তাই তার হাজব্যান্ড ইংরেজিতে আমাকে অনুবাদ করে দিচ্ছিলেন। এমন আন্তরিকতা সহজ করে দিল পর্তুগালে আমার প্রথম দিনটা।
শুনেছি, কালচারাল শক বলে নাকি অনেক কিছু হয় ভিনদেশের মাটিতে। আমি ভাবতাম, আমার সম্ভবত এমন কিছু হবে না। কিন্তু তবুও ধাক্কা খেলাম, যখন দেখলাম আমার ঘরের দরজায় কোনো লক নেই। দরজা শুধু ভিড়িয়ে রাখা যাবে। অস্বস্তি নিয়ে জিজ্ঞেস করতেই মিস্টার পাওলো বললেন, ‘কেউ ঘরে ঢোকে না, এখানে রুম লক করার প্র্যাকটিস নেই।’
ওয়াশরুমে গিয়ে দেখলাম, সেখানেও লক নেই! এবার কেমন যেন বোধ হলো, একেই হয়তো কালচারাল শক বলে। মিস্টার পাওলো বললেন, ‘তুমি দরজা ভিড়িয়ে রাখলে আর কেউ যাবে না।’ ওয়াশরুমে গিয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলাম। আমার একটা দড়ি প্রয়োজন, কী করা যায়? ট্রাউজারের ফিতা খুলে দরজার সঙ্গে বাথরুমের সেলফে বাঁধলাম, যাতে চট করে কেউ ঢুকে যেতে না পারে। তাও মনে হচ্ছিল, এই বুঝি কেউ ঢুকে পড়বে!
রাতে রান্নাঘরে গিয়ে জানতে পারলাম, আমি চুলা ব্যবহার করতে পারব না। কারণ, হাউজরেন্টের শর্তে সেটাই লেখা ছিল ওয়েবসাইটে। এবার ঠিক বুঝলাম না, কী হচ্ছে! অনলাইনে ওয়েবসাইটে ঢুকে দেখলাম, হাউজ রুলসের ৫ নম্বর পয়েন্টে স্পষ্ট ভাষায় ইংরেজিতে লেখা, ‘চুলা ব্যবহার করা নিষেধ।’
নিজেকে বোঝালাম— মাত্র আড়াই মাসের বুকিং এখানে। কেটে যাবে পাউরুটি, দুধ, ডিম সিদ্ধ, কলা খেয়ে।
আম্মু যখন কল করে জানল আমি ভাত খাইনি, কান্না শুরু করল।
কয়েক দিন পর মিস বিআকে জিজ্ঞেস করলাম, রাইস কুকার ব্যবহার করা যাবে কি না? বলতেই পরের দিন আমার জন্য রাইস কুকার কিনে এনে দিলেন নিজেই। পর্তুগিজদের আন্তরিকতায় আবার মুগ্ধ হলাম।
পাওলো একদিন জিজ্ঞেস করল, আমি ভেজিটেবল ফ্রাইড রাইস খাই কিনা। তাহলে আমার জন্যও বানাবে। শুনে খুশি হলাম, কারণ ফ্রাইড রাইস আমি পোলাও-বিরিয়ানির চেয়েও বেশি পছন্দ করি।
কিন্তু বিপত্তি হলো খেতে গিয়ে। এই ফ্রাইড রাইস কোনোভাবেই আমার চেনা ফ্রাইড রাইস না। ভাতটা ছিল আঠালো আর সবজির গন্ধটাও ঠিক নিতে পারছিলাম না। কিন্তু না খেলে অভদ্রতা হবে ভেবে অনেক কষ্টে খাওয়ার চেষ্টা করলাম। উনারা ডিনার টেবিল থেকে সরতেই প্লেটের বাকি খাবার টিস্যুতে মুড়ে পকেটে রেখে দিলাম, যেন বুঝতে না পারেন যে আমি খেতে পারিনি।
একদিন দ্বিধা ভেঙে পাওলোকে জিজ্ঞেস করলাম, কেন চুলা ব্যবহার করার নিয়ম নেই? পাওলো জানাল, চুলাতে যান্ত্রিক ত্রুটি আছে এবং রান্না করলে অনেক জিনিস লাগে, যেগুলোর জায়গা তাদের নেই। তারা চান, এমন কেউ পেয়িং গেস্ট হিসেবে থাকুক, যারা বাইরে খাবে কিংবা ফ্রোজেন ফুড নিয়ে এসে মাইক্রোওয়েভে গরম করে খাবে।
গত বছরের অক্টোবরে এই বাসার সঙ্গে আমার জার্নি শেষ হয়েছে। এরপর আরও দুইটা বাসায় থাকা হয়েছে, আরও কিছু নতুন মানুষ ও নতুন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছি। তবে পর্তুগালে আমার প্রথম দুই মাস চিরকালই স্মরণীয় হয়ে থাকবে।




