‘নিঃসঙ্গতার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার নাম প্রবাসজীবন’

নটিংহামের ওলাটন হলের সামনে লেখক
বিশ্বায়নের এই জমানায় বিলেতে বহু কিছু মিললেও মেলে না তপ্ত বিকালে বন্ধুর সঙ্গে টঙে আড্ডা, চিরপরিচিত অলিগলি, রিকশার বেল, হাঁকাহাঁকি, মায়ের হাসি আর রাত আটটা পেরোলে বাবার ফোন পেয়ে একটু ঘাবড়ে যাওয়া; পরিশেষে, হয় না নিজের ভাষায় কথা বলতে পারা।
এসব আরও গ্রাস করে যখন বুঝি ওই জীবনটা পেছনে ফেলে এসেছি। নিজেরই দেশে এখন যাব ছুটি কাটাতে, কী আশ্চর্য ব্যাপার।
বিলেত এক আজব দেশ! এ দেশে বৃষ্টি আর রোদের একেবারেই সমঝোতা নেই, যে যখন পারবে ঝাঁপিয়ে পড়বে। পাঁচ মিনিটেই আলো ছায়ার খেলা, এক দিনেই বহুবার। পেছনে তাকালে দেখা যায় ঘন মেঘে ছাওয়া আকাশ আর সামনে ঝলমলে রোদ্দুর। আর ষড়ঋতুর দেশের যে কেউই যখন শুধু কনকনে শীত আর তীব্র গরম ঋতুর মাঝে এসে পড়বেন, বলেই বসবেন, ‘এ কী!’ শীতে দীর্ঘতর রাত আর গ্রীষ্মে দীর্ঘদিন দেখে প্রথম দিকে একটু হকচকিয়ে যাওয়াই স্বাভাবিক। গ্রীষ্ম মানে মাঠে কিংবা পার্কে শিশু-কিশোরের খেলাধুলা, ঘাটে ক্যানালে ছিপ পেতে মাছ ধরা, ফরেস্ট ক্যাম্পিং, সি বিচে সানক্রিম মেখে রৌদ্র পোহানো। বিলেতে (ইউকে) ঋতুরাজ বসন্ত নয়, সেই উপাধি কেড়ে নেয় হেমন্ত। গ্রীষ্মে ঝাঁকড়া চুলের মতো বেড়ে ওঠা গাছের পাতাগুলো নেয় হলুদাভ বরণ। প্রকাণ্ড সেঞ্চুরি পাতা লালচে-হলদে রঙে ফুটপাতগুলোকে আবৃত করে রাখে; তা দেখে ধীরে ধীরে সবাই গ্রীষ্মের উষ্ণতা ছেড়ে শীতের প্রস্তুতি নিতে ছোটে। এই শীতের আমেজও কম নয়। লন্ডনের মতো বড় শহর যেমন ম্যানচেস্টার, লিভারপুল, রবিন হুডের নটিংহাম, বিবিধ সিটি সেন্টারে আড়ং জমে। মেরি-গো-রাউন্ড, আইস-রিংক, শুটিং গেমস ইত্যাদি রাইডের পাশাপাশি হটডগ, লিক্যারিশ, ফাজ আর পাইন্ট গ্লাসে এইল, লাগার, বিয়ার পান করে সব বয়সের ইংরেজ ম্যাম, জেন্টরা। অস্বাভাবিক রকমের মিশুক এরা। আবহাওয়া কেমন সে নিয়ে একটু আলাপ শুরু করলেই ট্রেন বা চলতি পথেই ঘণ্টা পাড়ি দেওয়া যায়। লন্ডন কেমন? শরৎচন্দ্র দেবদাস উপন্যাসে যেমন বর্ণনা দিয়েছেন তেমনই: ট্রাফালগার স্কয়ার, ওয়েস্টমিনস্টার অ্যাবে, ইংলিশ মোনার্কের বাসস্থান বাকিংহাম প্যালেস, ব্রিটিশ পার্লামেন্ট বা বিগ বেন, টেমসের ধারে টাওয়ার অফ লন্ডন, লন্ডন টাওয়ার ব্রিজ, লন্ডন ব্রিজ, ব্রিটিশ ন্যাশনাল মিউজিয়াম আর লন্ডনের বিখ্যাত কবুতর। হাইড পার্ক থেকে দেখবেন রয়েল ফ্যামিলির আর এক বাসস্থান কেন্সিংটন প্যালেস। পুরো লন্ডন দেখতে হলে আই অফ লন্ডন তো আছেই।
তবুও এত কিছুর মাঝে নিঃসঙ্গতার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার নাম প্রবাসজীবন। ঈদ-পুজোয় ছুটি নেই, ক্লাস কিংবা কাজ থাকবেই। ইস্টার সানডে, বড় দিন, নতুন বছর উদযাপন করা গেলেও আপন মনে হয় না।
তবু যে দেশে রোমান, ভাইকিং, ফ্রেঞ্চ, জার্মানিক সভ্যতার আঁচ আছে, তা নিয়ে একটি লেখা যথেষ্ট নয়। পরিবার-পরিজন ছেড়ে একা আছি বটে, তবে এরই মাঝে এত কিছু দেখার, করার, শেখার, নিজেকে ঢেলে পুনরায় সাজানো, তাইবা কম কী?




