ইউরোপে গেলেই জীবন সুন্দর কথাটা সত্যি নয়

পরিবারের সঙ্গে লেখিকা
ইউকেতে যেবার এলাম, সময়টা ছিল শীতকাল। ২০২৩ সালের ডিসেম্বর মাস। তখন যে বিষয়টি আমাকে সবচেয়ে বেশি নাড়া দিয়েছিল, সেটা হলো ডার্কনেস। একটা শহরকে সূর্যের আলোয় দেখা আর অন্ধকারের মধ্য দিয়ে দেখার অনেক পার্থক্য রয়েছে। বাংলাদেশ থেকে আসার পর শীতের অন্ধকারাচ্ছন্ন পরিবেশটা আমার কাছে নতুন ছিল।
পুরো পরিবার— হাজবেন্ড আর বাচ্চা নিয়ে একসঙ্গে মুভ করেছিলাম। ফলে একা বিদেশে আসার যে শূন্যতা বা অচেনা অনুভূতি, সেটা প্রথম দিকে খুব একটা কাজ করেনি।
তবে সবচেয়ে অবাক করেছে এখানকার পরিবেশ। পরিচ্ছন্নতার বিষয়টিও বেশ চোখে পড়েছে। আমি অবশ্য মূল শহরে ছিলাম না, সাউথ ওয়েস্টের দিকে ছিলাম। লন্ডন হয়তো কিছুটা নোংরা; কিন্তু সাউথ ওয়েস্ট কিংবা অন্য ছোট জায়গাগুলো নোংরা নয়।
ইংরেজি জানার কারণে কাজের জায়গায় বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হয়নি; বরং অনেক সময় শুনতে হয়েছে, ‘তুমি বাঙালি হয়ে এত ভালো ইংরেজি বলতে পারো?’ কারণ অনেকের ধারণা, এশিয়ান বা বাঙালিরা খুব ভালো ইংরেজি বলতে পারে না।
বাংলাদেশি হিসেবে নির্দিষ্ট কোনো অসুবিধা কাজের জায়গায় ফেস করিনি। তবে এশিয়ান হিসেবে, ইউরোপিয়ান বা ব্রিটিশ না হওয়ার কারণে রেসিজমের অভিজ্ঞতা হয়েছে। নিজের দেশের মানুষকে সবার আগে প্রাধান্য দেওয়ার বিষয়টি সব জায়গাতেই থাকে। এখানেও আছে। আমাদের স্যালারি স্কেলও ব্রিটিশদের মতো নয়। তাদের সময়ের সঙ্গে প্রমোশন হয়, বেতন বাড়ে, কাজের একটা ব্যালান্স আছে। আমাদের ক্ষেত্রে ওয়ার্ক-লাইফ ব্যালান্স বলে কিছু নেই।
একবার এক বৃদ্ধ মহিলা আমার হাতে খাবার খেতে খেতে মারা যান। ঘটনাটি আমাকে এতটাই মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করেছিল যে তিন দিন ছুটিতে থাকতে হয়েছিল
ইউকেতে এখন বৃদ্ধদের কেয়ার গিভার হিসেবে কাজ করছি। কাজটা শুরুতে সহজ ছিল না। মুসলমান হিসেবে কারও জন্য বেকন সার্ভ করাও অস্বস্তিকর ছিল। খাবারের গন্ধ, তাদের খাবার প্রস্তুত করার ধরন সবকিছুই আলাদা। একটা বেড আমরা যেভাবে প্রস্তুত করি, তারা অন্যভাবে করে। একটা কাপড় আমরা যেভাবে রাখি, তারা অন্যভাবে রাখে। সময়ের সঙ্গে এসবের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া গেছে।
কেয়ার গিভার হিসেবে সবচেয়ে কঠিন দিক হলো মানুষের মৃত্যু চোখের সামনে দেখা। একবার এক বৃদ্ধ মহিলা আমার হাতে খাবার খেতে খেতে মারা যান। ঘটনাটি আমাকে এতটাই মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করেছিল যে তিন দিন ছুটিতে থাকতে হয়েছিল। কাজ করতে পারিনি। এ ধরনের পরিস্থিতি একজন কেয়ার ওয়ার্কারের জন্য খুব কঠিন।
নতুন যারা বিদেশে আসতে চায়, তাদের জন্য সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো টাইম ম্যানেজমেন্ট, সততা, ভাষার ন্যূনতম দক্ষতা এবং নিজের যোগ্যতা। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো নিজেকে ভেঙে নতুন করে গড়ার মানসিকতা।
বিশেষ করে ইউকেতে আসতে চাইলে ইংরেজি শেখা জরুরি। ন্যূনতম ইংরেজি দক্ষতা ছাড়া এখানে সারভাইভ করা কঠিন। নতুন আসা বাঙালিদের একটি সমস্যা হলো তারা নতুন করে শেখার সুযোগ রাখতে চায় না; বরং শর্টকাট খোঁজে। মিথ্যা বলা, ফাঁকিবাজি করা কিংবা ফেক ম্যারেজের মতো বিষয়গুলো শুধু ব্যক্তির জন্য নয়, পুরো বাংলাদেশি কমিউনিটির ভাবমূর্তির জন্যও সমস্যা তৈরি করে।
সমুদ্র আমার খুব প্রিয়। তাই সোয়ানেজ ও ডারডল ডোর আমার পছন্দের জায়গা। লন্ডনের অ্যামিউজমেন্ট পার্কগুলোও ভালো লাগে।
ইউরোপে গেলেই জীবন সুন্দর কথাটা পুরোপুরি সত্যি নয়। জীবন সুন্দর হবে কি না, সেটা অনেকটাই নির্ভর করে একজন মানুষ নিজেকে কীভাবে তৈরি করছে তার ওপর। ইউরোপে এসেও বাংলাদেশের চেয়ে খারাপ জীবনযাপন করা সম্ভব। সবাই যে ভালো থাকবে, এমন নয়। নিজেকে কীভাবে তৈরি করছি তার ওপর অনেক কিছু নির্ভর করে। তবে জীবন সুন্দর করার সুযোগ এখানে অনেক বেশি।





