পাখির সঙ্গে পরমানন্দে কেটেছে মোদের দিন

পক্ষীবিদ ইনাম আল হক। ছবি: সাজ্জাদ হোসেন
প্রথিতযশা পক্ষীবিদ ইনাম আল হক বাংলাদেশ বার্ড ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা। বিমানবাহিনীর প্রাক্তন এই উইং কমান্ডার উত্তর মেরু ও অ্যান্টার্কটিকা ভ্রমণ করেছেন। তার সঙ্গে কথা বলেছেন মুনির রানা ও ইশতিয়াক হাসান। ছবি তুলেছেন সাজ্জাদ হোসেন
বিজ্ঞানের প্রতি আপনার যে ঝোঁক, এর সঙ্গে পাখি দেখার যে নেশা— তার কোনো সম্পর্ক আছে?
এমনিতে ছোটবেলা থেকেই পাখি ভালোবাসতাম, তবে ওটা তো বিজ্ঞান না। পৃথিবী কেমন করে চলে— এসব প্রশ্ন খুব কম বয়সেই আমার মনে আসত। আমার একটা মস্ত বড় সুবিধা হলো, গ্রামে দাদির কাছে মানুষ হয়েছি। যতক্ষণ দিনের আলো থাকত, ততক্ষণ নদীতে, বনে-জঙ্গলে ঘুরে বেড়াতাম। লেখাপড়া ছিল না বললেই চলে। গ্রামের ছেলেদের কাছেই গাছপালা, মাছ, পাখপাখালি সম্পর্কে চিনতে শিখেছি। অনেকে পাখির ডাক হুবহু নকল করতে পারত। ওদের কাছ থেকেই আমি এগুলো নতুন করে শিখেছি।
আর লেখাপড়া?
বাড়ির সামনে ছনের ঘর দিয়ে একটা স্কুল করে দেওয়া হয়েছিল। সেখানে ক্লাস ওয়ান এক বেঞ্চে আর ক্লাস টু অন্য বেঞ্চে বসত। একজন শিক্ষক ছিলেন; কোনোদিন আসতেন, কোনোদিন আসতেন না। এমন স্কুলে পড়া একটা শিশুর জন্য ভাগ্যের ব্যাপার। এর ফলটাও টের পেয়েছি যখন ফরিদপুর হাই স্কুলে ক্লাস ফাইভে ভর্তি হলাম। দেখলাম, ২০০ নম্বরের ইংরেজিতে প্রথম পত্রে ২ আর দ্বিতীয় পত্রে ৩ পেয়েছি! তবে গ্রামে থেকে আমার লাভই হয়েছে বেশি। নইলে প্রকৃতিকে এত নিবিড়ভাবে হয়তো জানা হতো না।
তখনকার গ্রামে বনাঞ্চল কি অনেক বেশি ছিল?
তা তো বটেই। এক বাড়ি থেকে আরেক বাড়িতে কোনো বাচ্চা একা যেতে পারত না। দুই বাড়ির মাঝখানের বন-বাগানগুলোতে অনেক সাপ ও বন্য শূকর থাকত। শীতকালে বাঘও (চিতাবাঘ) আসত। যদিও এরা মানুষ খেত না, কিন্তু মানুষ ভয় পেত। আমাদের গ্রামে একটা পরিত্যক্ত নীলকুঠি ছিল। নীলের বড় বড় হাউজ ঝোপ-জঙ্গলে ঢেকে গিয়েছিল এবং তার ভেতরেই বাঘটা এসে লুকিয়ে থাকত। প্রতি বছর এসে ছাগল বা কুকুর ধরে নিয়ে যেত।
কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ছাড়া ফরিদপুর থেকে হেঁটে ঢাকায় আসাটাই আমি জীবনের সবচেয়ে বড় অভিযান মনে করি। মাত্র ২-৩ টাকা পকেটে করে প্লাস্টিকের চপ্পল পায়ে গলিয়ে হেঁটে ফরিদপুর থেকে ঢাকা রওনা হই। সঙ্গে একটা ম্যাপ ছিল
এটি কত সালের ঘটনা?
১৯৬১-৬২ সালের, ইন্টারমিডিয়েটে পড়ি তখন। ট্রেন থেকে নেমে আমরা ঘোড়ার গাড়ি বা গরুর গাড়িতে করে নদীর ঘাট পর্যন্ত যেতাম। নদী পার হয়ে এক-দেড় কিলোমিটার হাঁটলে আমাদের গ্রাম। সেবার রাতে নদীর ঘাটে এসে পৌঁছালাম। সবাই বলল, গ্রামে বাঘ এসেছে; হেঁটে যাওয়া নিরাপদ নয়। সঙ্গে আমার ছোট বোন ছিল। মাঝিরা আট আনা পয়সার লোভে আমাদের বাড়ির ঘাটে পৌঁছে দিতে চাচ্ছিল। এমন সময় এক লোক এসে বললেন, ‘চলো হেঁটে যাই। তিনজন গেলে বাঘ কিছু করতে পারবে না।’ রওনা দেওয়ার কিছু পরেই টের পেলাম ফেউ ডাকছে। ফেউ মানে শিয়াল। বাঘ এলে শিয়ালরা স্বাভাবিক ডাকের বদলে এক ধরনের বিশেষ ডাক দেয়। তা শুনেই বোঝা যায়, আশপাশে বাঘ আছে। ঠিকই। পরদিন সকালে শোনা গেল, বাঘ একটা বাছুর মেরেছে। একবারে পুরো গরু খেতে পারেনি, সামান্য খেয়ে চলে গেছে। অর্থাৎ পরের দিন বাঘটি আবার আসবে। তো, এই সুযোগে গ্রামের লোকজন মাচা বেঁধে বাঘের জন্য অপেক্ষা করতে লাগল এবং ওই রাতেই বাঘটাকে গুলি করে মারল। আমাদের সেই স্কুলেই বাঘটাকে কাটা হলো এবং টুকরো টুকরো করে পুরো বাঘটা বিক্রি করা হলো। দশ গ্রামের লোকজনে ওষুধ হিসেবে বাঘের কলিজা অনেক বেশি দামে এবং মাংস অল্প অল্প করে কিনে নিল। বিক্রির পুরো টাকাটা গেল স্কুল ফান্ডে।
আপনার জন্ম কি এই গ্রামেই?
হ্যাঁ। ওখানেই শৈশব কেটেছে। পরে ফরিদপুর হাই স্কুলে পড়েছি এবং ফরিদপুর রাজেন্দ্র কলেজ থেকে বিএসসি পাস করেছি। বাবার ইচ্ছা ছিল আমাকে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করার। কিন্তু আমি বিএসসি পরীক্ষা দিয়েই ফরিদপুরের চরভদ্রাসন থানার কায়েদে আজম হাই স্কুলে চাকরিতে যোগ দিই। পদ্মা নদীর পাড়ের ওই স্কুলে আমি ও আমার এক সহপাঠী ছিলাম প্রথম সায়েন্স টিচার। গ্রামে তখন সায়েন্স শিক্ষকের ছিল বিশাল সম্মান, লোকজন পা ধুইয়ে দিতে আসত। এরই মধ্যে আমার আরও দুটি চাকরি হয়ে যায়। সবচেয়ে বেশি বেতন যেখানে— মাসে ২০০ টাকা— আমি সেখানেই যোগ দিলাম; নারায়ণগঞ্জের ঢাকা জুট মিলে কোয়ালিটি কন্ট্রোল অফিসার হিসেবে চাকরি শুরু করলাম। তখন কাঁচপুর ব্রিজ ছিল না; ডেমরা থেকে নৌকায় ওপারে যেতে হতো। এর মধ্যে আবার রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এক্সটার্নাল ছাত্র হিসেবে এলএলবিতে ভর্তি হলাম। কারণ বাবাকে কথা দিয়েছিলাম, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হব।
এরপর কোথায় গেলেন?
মাস ছয়েক পর জুট রিসার্চ ইনস্টিটিউটে যোগ দিলাম গবেষণা সহকারী হিসেবে, বেতন ২৫০ টাকা। এক বছর পর ১৯৬৯ সালে ক্যাডেট হিসেবে বিমানবাহিনীতে যোগ দিলাম।
বিমানবাহিনীতে যাওয়ার সিদ্ধান্তের পেছনে কি পাখি দেখার অভিজ্ঞতা কোনো ভূমিকা রেখেছে?
একদম। পাখির সঙ্গে উড়োজাহাজের মিল আছে— কেবল এ কারণেই আমি এয়ারফোর্সকে বেছে নিই।
পোস্টিং হয়েছিল কোথায়?
আমাকে ছয় মাস প্রাথমিক প্রশিক্ষণ নিতে হলো। করাচিতে পাকিস্তানের একমাত্র অ্যারোনটিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের ছাত্র হলাম। ১৯৭১ সালের ১ জানুয়ারি পাকিস্তান এয়ারফোর্সের পাইলট অফিসার হলাম এবং রাডার বিশেষজ্ঞ হওয়ার জন্য ছয় মাসের প্রশিক্ষণে পাঠানো হয়। ওই প্রশিক্ষণ চলাকালেই মার্চ মাসে বাংলাদেশ স্বাধীনতা ঘোষণা করে।
প্রত্যেক মানুষের জীবনে দু-এক বছর জেল খাটা উচিত! আমি জীবনে যত লেখাপড়া করেছি, তা জেলের দুই বছরেই করেছি এবং সেই জ্ঞান দিয়েই আজও চালিয়ে যাচ্ছি
তখন কী করলেন?
২৬ মার্চ সকালে ক্লাসে যাই। ১৮ জন অফিসারের মধ্যে আমরা দুজন মাত্র বাঙালি, দুজন সিন্ধি আর বাকিরা পাঞ্জাবি। পাকিস্তানি মিডিয়ার খবর শুনে পাঞ্জাবি এক অফিসার আমাকে বললেন, ‘তোদের তো এখন সব ঠান্ডা। সামরিক অ্যাকশনে শেখ মুজিবের খেল খতম হয়ে গেছে।’ তারা শুনেছিল, শেখ মুজিবুর রহমান একজন এমপি হয়েও তার ইচ্ছামতো দেশ চালাচ্ছিলেন এবং কেন্দ্রীয় সরকারের কোনো নিয়ন্ত্রণ ছিল না ঢাকায়। আমি বলেছিলাম, ‘তোমরা বোঝইনি, আজ সকাল থেকে পাকিস্তান শেষ হয়ে গেছে। তোমরা যত অ্যাকশনই নাও না কেন, এটি আর কোনোদিন জোড়া লাগবে না।’ দুপুর ১২টার দিকে কলেজের প্রিন্সিপাল আমাকে তলব করলেন। আমার জবানবন্দি নেওয়া হলো।
তার পর?
তার পর থেকেই হাউজ অ্যারেস্ট ছিলাম। ক্লাস শেষ করে অফিসার মেসের গণ্ডিতেই থাকতাম। ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরে আমাদের পেশোয়ারের জেলে ঢুকিয়ে দেওয়া হলো। সেখানে দীর্ঘ দুবছর বন্দি ছিলাম। পরে ১৯৭৩ সালের শেষের দিকে (নভেম্বর বা ডিসেম্বরে) রেড ক্রসের মাধ্যমে আমি বাংলাদেশে ফিরে আসি।
জেলের ভেতরের পরিবেশটা কেমন ছিল?
খুব সুন্দর ছিল। আমার তো মনে হয়, প্রত্যেক মানুষের জীবনে দু-এক বছর জেল খাটা উচিত! জেলে সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, মনোযোগ বিক্ষিপ্ত হওয়ার কোনো আশঙ্কা থাকে না। সব ধরনের সামাজিক টানাপড়েন থেকে মুক্ত থাকা যায়। এই দুবছর ছিল আমার জীবনের অসাধারণ এক সময়। আমি জীবনে যত লেখাপড়া করেছি, তা ওই দুই বছরেই করেছি এবং সেই জ্ঞান দিয়েই আজও চালিয়ে যাচ্ছি।
বই পেতেন কীভাবে?
জেলে যাওয়ার সময় আমি নিজেই ৩০-৩২টা বই নিয়ে গিয়েছিলাম। সেখানে প্রায় ৫০০ বাঙালি বন্দি ছিলেন, যার মধ্যে খুব কম লোকই ছিলেন, যিনি সঙ্গে বই নেননি। আমরা একে অপরের বই ধার নিয়ে পড়া শুরু করি। পরে দুই খাটের মাঝখানের সামান্য জায়গায় ৩০০ বইয়ের একটা লাইব্রেরি বানিয়ে ফেলি; খাতায় লিখে বই ইস্যু করতাম। বার্ট্রান্ড রাসেলের ‘আ হিস্টরি অব ওয়েস্টার্ন ফিলোসফি’ বইটি আমি আলতাফ হোসেন চৌধুরীর (পরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী) কাছ থেকে নিয়েছিলাম ‘ফিফটি ইয়ারস অব পাঞ্চ’ বইটির বিনিময়ে। সে আমলে বাঙালি তরুণদের মধ্যে বই পড়ার ভালোই প্রচলন ছিল। ৫০০ বাঙালি অফিসারের কাছ থেকে এই যে ৩০০ বই পাওয়া গেল, তা ৫০০ পাঞ্জাবি কিংবা পাঠানের কাছ থেকে হয়তো সম্ভব হতো না।
বই পড়া ছাড়া আর কী করতেন?
বই নিয়ে আলোচনা, বক্তৃতা চলত। ডাক্তাররা প্রতিদিন চিকিৎসাবিজ্ঞানের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে মিটিং করতেন। আর যারা গান জানতেন, তারা গানের স্কুল খুলে বসলেন। স্টিলের কাঁটাচামচ মেঝেতে ঘষে ঘষে ধারালো করে জেলখানায় রান্নার কাঠের টুকরো কেটে গিটার বানিয়ে ফেলেছিলেন! সেই গিটার দিয়েই গানের ক্লাস হতো। ক্যাপ্টেন সিনহার মতো অনেকেই সেখানে গান শিখিয়েছেন। সব মিলিয়ে আমরা প্রত্যেকেই জেলের ভেতরে সৃজনশীল কিছু না কিছু করেছি।
স্বাধীন দেশে ফেরার পর কী করলেন?
বিমানবাহিনীতে যোগ দিলাম। ১৯৭৩-৭৪ সালের দিকে দেশে বিমান ছিল হাতে গোনা, অফিসেও তেমন কাজ থাকত না। তাই ভাবলাম, পড়াশোনাটা শেষ করি। বাবাকে যে কথা দিয়েছিলাম, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ব। ততদিনে বাবা মারা গিয়েছেন, তবু...।
কোন সাবজেক্টে মাস্টার্স করলেন?
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়েই আইবিএর সান্ধ্যকালীন কোর্সের কথা জানতে পারি। চাকরির পাশাপাশি রাতে ক্লাস করে চার বছরের কোর্সে ভর্তি হলাম। এমবিএ শেষ করলাম প্রথম স্থান নিয়ে।
বাবা তো দেখে যেতে পারলেন না।
এই আফসোস তো আছেই— বাবা যদি এটি দেখে যেতে পারতেন! বড় ছেলে তখনো এমএ পাস করতে পারেনি— এই কষ্টটা নিয়েই তিনি মারা যান ১৯৬৬ সালে। তবে একটা বিষয় এখন বুঝি, বাবার কথা শুনে তখনই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলে তিনি মারা যাওয়ার পর আমি অসহায় হয়ে পড়তাম। চাকরি ছিল বলেই সংসারটা টিকে ছিল।
আপনারা ভাইবোন কয়জন ছিলেন?
আট ভাইবোন ছিলাম। বেঁচে আছি মাত্র তিনজন। আমার জীবনের বড় সৌভাগ্য, আমি চারজন মা পেয়েছিলাম। আসলে মা এবং তিনজন বড় বোন— এরা সবাই আমার মা; ওরাই আমাকে পরম স্নেহে মানুষ করেছেন। এই চার নারীর সান্নিধ্যে বড় হওয়ার কারণেই নারীদের প্রতি আমার মনে গভীর শ্রদ্ধা তৈরি হয়েছে। আমি ছোটবেলা থেকেই বিশ্বাস করি, ছেলেদের চেয়ে মেয়েরা অনেক বেশি মানবিক, অনেক গোছানো আর যত্নশীল।
একটু অন্য প্রসঙ্গে যাই। বাংলাদেশ বার্ড ক্লাব প্রতিষ্ঠার ভাবনা কীভাবে মাথায় এলো?
১৯৯৫ সালে উইং কমান্ডার হিসেবে বিমানবাহিনী থেকে পূর্ণ পেনশনে অবসর নিই। তবে অবসরের আগেই, নব্বইয়ের দশকের দিকে আমি নিয়মিত পাখি দেখা শুরু করি। বনে-জঙ্গলে-জলাশয়ে পাখি খুঁজতে গিয়ে খসরু চৌধুরী ও প্রখ্যাত বন্যপ্রাণী বিজ্ঞানী ড. রেজা খানের মতো মানুষের সঙ্গে পরিচয় হয়। এ দেশে তখন পাখি দেখার শখটি মোটেই জনপ্রিয় ছিল না। যারা পাখি দেখতেন, তারা মূলত বিদেশি। পাখিপ্রেমীদের মধ্যে তখন নিয়মিত যোগাযোগের কোনো মাধ্যম ছিল না। অবসর নেওয়ার পর আমি ফজলে হোসেন আবেদের আহ্বানে ব্র্যাকে যোগ দিয়েছিলাম। তখন মহাখালীতে বাসা নেওয়ার পর ভাবলাম, মাসে অন্তত একদিন সবাইকে ডেকে আড্ডা ও পাখি নিয়ে আলোচনা করা যাক। এভাবেই ১৯৯৬ সালে বার্ড ক্লাবের শুরু। প্রথম সভায় আমি ও দন্তচিকিৎসক রোনাল্ড হালদার ছাড়া বাকি চারজনই ছিলেন বিদেশি। পরের সভায় সদস্য সংখ্যা বেড়ে ১৬ হলো, যার ১২ জনই বিদেশি। ২০২৩ সালে কসমস থেকে প্রকাশিত ‘বিদেশী বার্ডার’ নামে আমার বইটি মূলত এই বিদেশিদের নিয়েই লেখা, যারা এ দেশে আমাদের প্রথম শিক্ষক ছিলেন। ধীরে ধীরে বিদেশিরা চলে যান এবং দেশি সদস্য বাড়তে থাকে। ২০১০ সালের পর থেকে আমি বাংলাদেশ বার্ড ক্লাবের পরিচালনা পর্ষদে নেই; প্রতি বছর গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত নতুন কমিটি আসে। এখন ক্লাবের প্রতিটি সভায় ৫০-৫৫ জন দেশি পাখিপ্রেমী আসেন।
এখন তো অনেক জেলাতেও বার্ড ক্লাব হয়েছে।
প্রথমে চট্টগ্রাম ও শেরপুরের বন্ধুরা তাদের এলাকায় বার্ড ক্লাবের শাখা খোলার প্রস্তাব নিয়ে এসেছিলেন। আমি তাদের স্বতন্ত্র ক্লাব গড়ে স্বাধীনভাবে কাজে নামার পরামর্শ দিই। শাখা খুললে মানুষ কেন্দ্রের দিকে তাকিয়ে থাকে, নিজেরা শক্তিশালী হতে পারে না। আজ শেরপুর, রাজশাহী, বগুড়াতেও স্বাধীন বার্ড ক্লাব নিজস্ব গতিতে চলছে।
আপনার মধ্যে তো একটা অভিযাত্রী সত্তাও বিরাজ করে। অ্যান্টার্কটিকা, উত্তর মেরু গিয়েছেন। সবচেয়ে রোমাঞ্চকর ছিল কোনটা?
পদব্রজে ফরিদপুর থেকে ঢাকা যাত্রা। ম্যাট্রিক পাস করার পর গৃহশিক্ষক ওয়াহেদ সাহেবকে বললাম, চলেন হেঁটে ঢাকায় যাই। উনিও সঙ্গে সঙ্গে রাজি। ১৯৬৪ সালের কথা। মাত্র ২-৩ টাকা পকেটে করে প্লাস্টিকের চপ্পল পায়ে গলিয়ে হেঁটে ফরিদপুর থেকে ঢাকা রওনা হই। সঙ্গে একটা ম্যাপ ছিল। পথে পথে উপজেলার নাম জিজ্ঞেস করে করে এগোতে থাকি। চিড়ে খেয়ে, হাটের মাচায় রাত কাটিয়ে শেষে বছিলা হয়ে সদরঘাটে পৌঁছাই। ওয়াহেদ সাহেবের পা-টা একটু ফুলে গিয়েছিল, এ ছাড়া বিশেষ কোনো সমস্যা হয়নি। আমি উত্তর মেরু ইত্যাদি সব জায়গায় গেছি; কিন্তু ওগুলো ছিল সাজানো-গোছানো ভ্রমণ। কিন্তু কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ছাড়া ফরিদপুর থেকে হেঁটে ঢাকায় আসাটাই আমি জীবনের সবচেয়ে বড় অভিযান মনে করি।
আপনি তো দুবার অ্যান্টার্কটিকা ভ্রমণ করেছেন?
হ্যাঁ, ১৯৯৭ সালে প্রথমবার একটি ট্যুর কোম্পানির মাধ্যমে ১২ দিনের জন্য অ্যান্টার্কটিকায় যাই। এর দীর্ঘ ২৬ বছর পর, ২০২৪ সালে দ্বিতীয়বার ২০ দিনের সফরে অ্যান্টার্কটিকা যাই। দ্বিতীয় সফরে ৩০ জন বাঙালির একটি দল ছিল।
২৬ বছরের ব্যবধানে কী কোনো পরিবর্তন চোখে পড়েছে?
২০২৪ সালের সফরে আগের চেয়ে অনেক বেশি সিল, কিং-পেঙ্গুইন এবং প্রায় একশ হাম্পব্যাক তিমি দেখেছি। অনেক কিলার হোয়েলও দেখেছি। তিন দশক ধরে তিমি শিকার বন্ধের আন্তর্জাতিক উদ্যোগের কারণে এটি হতে পারে। এ সফরে আমরা গালাপাগোস দ্বীপপুঞ্জে গিয়েছিলাম এবং দক্ষিণ আমেরিকার আমাজনের জঙ্গলও ঘুরে এসেছি।
২০০৭ সালে উত্তর মেরু ভ্রমণের ক্ষেত্রে আপনার স্ত্রীর বিশেষ অবদান ছিল শুনেছি।
আসলে তখনো আমাদের বিয়ে হয়নি। কিন্তু আর্থিকভাবে আমাকে সহায়তা করেছিলেন। তার নাম মাজেদা হক। ব্র্যাকে দেড় বছর চাকরি করার সময়ে তার সঙ্গে পরিচয় এবং এটাই ছিল ব্র্যাক থেকে আমার জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। আমরা দুজনেই অনেক বয়সে কোনো আনুষ্ঠানিকতা ছাড়াই বিয়ে করি। তিনি পুরুষদের আধিপত্যবাদী আচরণকে অপছন্দ করতেন; কিন্তু আমার মধ্যে সেই আশঙ্কা না দেখেই বিয়েতে রাজি হন। মাজেদা অত্যন্ত চমৎকার ও উদার মনের মানুষ ছিলেন এবং বার্ড ক্লাবের প্রাণকেন্দ্রে পরিণত হন। দুর্ভাগ্যবশত, ২০১৯ সালে ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে তিনি মারা যান। যারা তাকে চিনতেন, তারা জানেন তিনি কত অসাধারণ একজন মানুষ ছিলেন।
আপনার স্ত্রীরও কি পাখি দেখার নেশা ছিল?
আগে ছিল না; আমার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা হওয়ার পর থেকে ছিল। পাখি দেখা, পাখির ছবি তোলা, পাখি গণনায় অংশ নেওয়া ও পাখি গবেষণা ক্যাম্পে দীর্ঘ সময় কাজ করায় অফুরন্ত উৎসাহ ছিল তার। হাকালুকি ও টাঙ্গুয়ার হাওর এবং গজনী ও রেমা-কালেঙ্গা বনে তাঁবু ফেলে আমরা বহুবার রাত্রিযাপন করেছি। উপকূলে ও সুন্দরবনে একাধিকবার সে ট্রলার ও নৌকায় সপ্তাহব্যাপী থেকেছে। থাইল্যান্ডের বিখ্যাত ‘কো-মান-নাই’ দ্বীপে এবং ‘খাও-ডিন্সো’ পাহাড়ে পাখি গবেষণা ক্যাম্পে সে যোগ দিয়েছে একাধিকবার। পাখি দেখার জন্য বহুবার সে গেছে প্রতিবেশী দেশ মালয়েশিয়া, শ্রীলঙ্কা, ইন্ডিয়া, নেপাল ও ভুটানে। পাখি দেখতে আমরা আফ্রিকা মহাদেশের মাদাগাস্কার, কেনিয়া ও দক্ষিণ আফ্রিকার বন-বাদাড় ও জলাশয়ে ভ্রমণ করেছি। পাখির পাশে পরমানন্দে কেটেছে আমাদের সেসব দিন।
(২৯ জুন, সকাল ১১টা, বনানী, ঢাকা)







