এই শহর আমার কাছে মায়ের মতো

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
শিল্পী ধ্রুব এষের শহরবাসের ইতিকথা ৪০ বছর বয়সী। ঢাকা শহরে একরকম চিলেকোঠার বাসিন্দা তিনি। ব্রাশের আঁচড় টানা কাগজ ঘরের মেঝেতে ছড়ানো। দেয়ালে রঙের দাগ, টেবিলে শূন্য চায়ের কাপ, তুলি, পড়ে থাকা অসমাপ্ত কাজ আর অজস্র বই। কোনোদিন বৃষ্টি নামলে বাইরে টিনের চাল ছাওয়া বারান্দায় ঝমঝম শব্দ ওঠে, কখনো ক্লান্ত দুপুরে কাক ডাকে। নির্জনতায় নিমগ্ন হয়ে বইয়ের প্রচ্ছদ আঁকেন ধ্রুব। কোলাহলে পিষ্ট এ শহরের বিপরীত এক চরিত্র ধ্রুব অবিশ্রান্তভাবে তৈরি করে চলেন বিচিত্র বইয়ের অসংখ্য প্রচ্ছদ।
এ শহরে মানুষের কোলাহল, দম আটকে থাকা ভিড়, যানজট, হাইরাইজ ভবনের দানবীয় উপস্থিতির মাঝে এক নির্জন আত্মা ধ্রুব এষ। সাদাসিধে তার জীবন। আরও সাধারণ তার পোশাক। বিশেষ বৈশিষ্ট্য, পায়ে থাকা একজোড়া স্পঞ্জের স্যান্ডেল। একদা রিকশায় অথবা হেঁটে পথে ঘুরে বেড়ানো প্রিয় শখ ছিল। আজকাল ব্যাটারিচালিত রিকশার উৎপাতে রিকশায় ভ্রমণ সীমাবদ্ধ হয়েছে। প্রশ্ন করেছিলাম, এ ঢাকাকে ভালো লাগে?
ধ্রুব এষের সোজা উত্তর, ‘এই শহর আমার কাছে মায়ের মতো। তার লক্ষ লক্ষ সন্তান; কিন্তু সে তার কোনো সন্তানকে দূরে ঠেলে দেয় না। কাকে আশ্রয় দেয়নি এই শহর? কাকে অন্নের জোগান দেয়নি, কাকে বাঁচিয়ে রাখে না? শহরটা অন্নদাত্রী মায়ের মতো আগলে ধরে রাখে সবাইকে।’
‘প্রকৃতি ভালোবাসেন আপনি, আবার কংক্রিটে মোড়া শহরকেও ভালোবাসেন। এই বিপরীত অনুভূতির কারণ কী?’
‘একদা আমি একটি ছড়া লিখেছিলাম,
এই শহরের খাই
এই শহরের পরি
এই শহরের যত পারি দুর্নামও করি।
কাকে অন্নের জোগান দেয়নি, কাকে বাঁচিয়ে রাখে না? শহরটা অন্নদাত্রী মায়ের মতো আগলে ধরে রাখে সবাইকে
এই ঢাকা শহরে আমার নাগরিক জীবনের শুরু ১৯৮৪ সাল থেকে। চারুকলায় ভর্তি হওয়া, একটু একটু করে শহরটার সঙ্গে পরিচিত হওয়া। কত গল্প এই শহরে, কত চরিত্রের বেঁচে থাকা। ঢাকায় আমার বেঁচে থাকার যুদ্ধের শুরু। ঢাকা আমাকে কখনো বিমুখ করেনি। এখানে অনেক সংকট আছে, যন্ত্রণা আছে জানি। বহু মানুষ এখানে বেঁচে থাকে, জীবনযাপনের জন্য সব সুবিধা ব্যবহার করে; অথচ তারাই আবার শহরটার সমালোচনায় মুখর হয়। আমি সবকিছু নিয়েই এই শহরকে ভালোবাসি।’
‘এই শহর ঠিক কোন সময়টা প্রিয়?’
‘গোধূলি। মানুষ দিনের সব কাজ মিটিয়ে তখন বাড়ি ফেরে। শহরকে তখন অন্য রঙের আলোয় ভিন্ন বলে মনে হয়। নির্জন না হয়েও এক ধরনের নির্জনতা এসে ভর করে সর্বত্র। সেই সময়টা আমার খুব প্রিয়।’
ধ্রুব এষের নির্জন শহর পছন্দ। করোনার সময়ে বাড়ি থেকে বের হয়ে চলে গিয়েছিলেন রমনা পার্কে। বেড়ে ওঠা গাছপালা, উপচে পড়া ফুল আর চেনা-অচেনা পাখির ডাকের মধ্যে তার মনে হয়েছিল, অরণ্যমুখর এক শহর হয়ে উঠেছে ঢাকা। সেই অদ্ভুত ছবিটা আজও মনের মধ্যে গেঁথে আছে।
আজও সপ্তাহের শুক্রবার দিনটায় কাজের চাকা বন্ধ রেখে ঘুরে বেড়ান ধ্রুব। আশির দশকের ফাঁকা শহরের স্মৃতি আজও আন্দোলিত করে তার আত্মাকে। কিন্তু আজকের এ পরিবর্তনের বাস্তবতাকেও মেনে নেন তিনি। মানুষ বেড়েছে এ শহরে। কাজের খোঁজে, আশ্রয়ের খোঁজে মানুষের স্রোত শহরমুখী। সেখানে এ শহরটা যে সব নির্জনতা হারিয়ে বসেছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। মনে মনে ভাবেন, কত পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে ঢাকার জীবন ছুটে চলেছে অজানার উদ্দেশে। ঢাকার বদলে যাওয়া জীবনপ্রবাহ ব্যক্তি স্বাধীনতাকেও অনেকটা খর্ব করেছে বলেই তার ধারণা। আগের মতো অনেক কিছুই আর নিজের ইচ্ছায় করা সম্ভব হয় না।
এখন ছবি আঁকছেন ধ্রুব। ঘরে ছড়িয়ে রাখা ক্যানভাস।
‘ঢাকার ছবি আঁকতে ইচ্ছে হয়?’
‘শুরু করলাম আঁকার কাজ। দেখি, আঁকব কখনো।’
কথার অন্তিমে প্রশ্ন করেছিলাম, এই ঢাকা নগরীর আত্মাকে স্পর্শ করে দেখেছেন কখনো? উত্তরে ধ্রুব বললেন, ‘খোঁজার প্রক্রিয়াটা চলছে মনের মধ্যে। ছুঁতে পেরেছি কি না জানি না। শহরের আত্মাকে খুঁজে পাওয়া কঠিন তো।’
ছবি: লেখক







