ঢাকা শহরে কুনুমতে বাঁইচা আছি

রাজধানীর উত্তরা এলাকায় তালপাতার পাখি বিক্রি করছেন নিজামউদ্দিন ছবি: লেখক
‘বয়স কত হইল আপনার?’
‘কত হইব, পঁচাশির মতোন।’
‘এই তালপাতার পাখি বিক্রি কইরা দিন চলে কেমনে?’
‘দিন আর চলে না বাবা, চলাইয়া নিতে হয়।’
পঁচাশি বছর বয়সী নিজামউদ্দিন প্রতিদিন খুব ভোরবেলা গাজীপুর থেকে বাসে চেপে ঢাকার উত্তরা এলাকায় আসেন। হাতে ধরা থাকে তালপাতার তৈরি একগুচ্ছ পাখি। প্রতিটি পাখি সুতায় বাঁধা। হাতে নিয়ে ঘোরাতে হয়; শিশুদের খুব সাধারণ একটা খেলনা। এই খেলনা বিক্রি করে সংসার চলে নিজামউদ্দিনের। গোটা মুখে তার বয়সের বলিরেখা। চোখের দৃষ্টি ধূসর হয়ে এসেছে ক্রমে; হাত-পা ভীষণ শীর্ণ। প্রতিদিন রোদ অথবা বৃষ্টিতে হেঁটে খেলনা পাখি বিক্রি করেন তিনি। বেঁচে থাকার জন্য তার সামনে আর কোনো পথ খোলা নেই।
নিজের গ্রামের বাড়ির কথা প্রায় ভুলতে বসেছেন নিজামউদ্দিন। গাইবান্ধায় একদা বসবাস ছিল। প্রায় চল্লিশ বছর হয়ে গেল গ্রাম ছেড়ে শহরের দিকে চলে এসেছেন। এখন মাঝে মাঝে যেতে হয়। বয়সের কারণে পথ চিনে সেখানে যেতেও ঝামেলা হয় তার। গ্রামের বাড়িতে এখন আর স্বজনরাও কেউ থাকে না। পরিবারের সদস্য তিন মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে। কোনো পুত্রসন্তান নেই তার। মেয়েরা মাঝেমধ্যে খোঁজ নেয় বাবার। এখন গাজীপুর মূল শহর থেকে একটু দূরে একটা বাড়িতে থাকেন। সেই বাড়িতে বেঁচে আছেন শুধু অসুস্থ স্ত্রী।
‘আপনার পরিবারে আয়-রোজগার করার আর কেউ নাই?’
প্রশ্নটা শুনে কেমন এক অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকান নিজামউদ্দিন। তারপর একটু থেমে বললেন, ‘না, আর কেউ নাই। চাইট্টা ভাত খাইতে আমারেই কাজ করতে হয়।’
‘পাখি বিক্রি কইরা কত টাকা পান?’
‘কোনো কোনো দিন কপাল ভালা হইলে চাইর-পাঁচশ টাকা জোটে, কোনো দিন শতখানেক।’
ভোরবেলা উত্তরার নির্দিষ্ট কয়েকটা রাস্তায় হেঁটে হেঁটে পাখি বিক্রি শুরু হয় তার। একটা পাখি দশ টাকা। এর বেশি চাওয়ার সক্ষমতাও নেই তার। ভোরবেলা ভাত খেয়ে বাড়ি থেকে বের হন। দুপুরে আর কিছু খাওয়া হয় না। আবার সন্ধ্যাবেলা বাড়িতে ফিরে পান্তাভাত বাসি তরকারি দিয়ে খেয়ে ঘুমিয়ে পড়েন। প্রশ্ন করতে জানালেন নিজামউদ্দিন, তার ভাত খেতে ভালো লাগে। সঙ্গে একটু সবজি থাকলে তার চলে যায়। মাছ বা মাংস খেয়েছেন মাস দুই আগে।
পাঁচশ পাখি তৈরি করাতে প্রায় হাজার চারেক টাকা কারিগরের মজুরি গুনতে হয় তাকে। এত টাকা জোগাড় করা সবসময় সম্ভব হয় না। তবে পাখি কেনা ছাড়াও অনেক মানুষ তাকে টাকা দিয়ে সাহায্য করেন। সেই সামান্য টাকাই তার বড় সম্বল।
কয়েক মাস পরপর তাকে গাইবান্ধায় যেতে হয় তালপাতার পাখি বানিয়ে আনতে।
‘এত দূর পথ আপনের যাইতে কষ্ট হয় না?’
‘হ বাবা, অনেক কষ্ট হয়। একটা পা ফুইলা থাকে সবসময়; হাঁটতে অনেক কষ্ট হয়।’
‘ডাক্তারের কাছে যান?’
‘পারি না। হাতে ট্যাকা থাকে না। এলাকার একজন ডাক্তার আছে, হে মাঝে মাঝে ওষুধ দেয়।’
প্রায় চল্লিশ বছর পাতার পাখি বিক্রি করেন নিজামউদ্দিন। তার আগে গ্রামে চাষাবাদের কাজ করতেন।
‘এত বছর ঢাকা শহরের সঙ্গে যোগাযোগ, কেমন লাগে এই শহরটাকে?’
এবার দন্তহীন মাড়ি বার করে সামান্য হাসেন তিনি। উত্তরে বললেন, ‘ভালাই লাগে। দিন চইলা যাইতেছে এই অনেক বড় কথা। এই শহরে তো কিছু একটা কইরা ভাত খাইতে পারতেছি। উত্তরার মানুষ অনেক সাহায্য করেন। তাগো সাহায্য নিয়া তবুও কুনুমতে বাঁইচা আছি।’
সময়টা ছিল দুপুর। হেমন্তকালেও তীব্র রোদে পুড়ে যাচ্ছে পথঘাট, মানুষ। চলে আসার সময় দেখি, মাথা নিচু করে হাতে ধরা একটা পাতার পাখি ঘোরাতে ঘোরাতে ধীরে ধীরে চলে যাচ্ছেন নিজামউদ্দিন। জীবনের অনিশ্চিত পথ তার সামনে। সে পথের শেষ কোথায় কেউ কি জানে? নিজামউদ্দিনও জানেন না।




