এক চিলতে ছাদে এক টুকরো অরণ্য

ঢাকায় দিন দিন ছাদবাগানের আধিক্য বাড়ছে। ছবিটি সম্প্রতি রাজধানীর রামপুরা এলাকা থেকে তোলা। ছবি: মহুবার রহমান
ইট-পাথরের তীব্র দাবদাহের প্রভাবে ঢাকা যখন তপ্ত উনুনের মতো আঁকুপাঁকু করে, তখন নগরবাসীর জন্য কিছুটা স্বস্তির ঠিকানা হয়ে উঠছে ভবনের ছাদবাগানগুলো। যান্ত্রিক শহরের রুক্ষতা পেরিয়ে প্রতিদিন এসব সবুজ ছাদ মানুষকে তাজা ফলমূল, বিশুদ্ধ বাতাস আর খানিকটা প্রশান্তির আশ্রয় দিচ্ছে। ঢাকা শহরের ছাদবাগানগুলোর প্রয়োজনীয়তা, এর সম্ভাবনা, নানা চ্যালেঞ্জ এবং নগরের টিকে থাকার লড়াই নিয়ে লিখেছেন শম্পা বিশ্বাস
জুন মাসের খাঁখাঁ দুপুর। কারওয়ান বাজারের মোড়ের ট্রাফিক সিগন্যালে দাঁড়িয়ে থাকা যেকোনো চালককে জিজ্ঞেস করলেই বলবে— ঢাকা শহরটা একটা তন্দুর রুটির তপ্ত চুলা। এ শহরের কাচের সুউচ্চ টাওয়ার আর পিচঢালা সড়কগুলো সারা দিন সূর্যের তাপ শুষে নেয়। রাতে আবার সে আঁচই ছাড়তে থাকে পুরো নগরীতে। কেতাবি ভাষায় একেই বলে ‘অারবান হিট আইল্যান্ড’। এ উত্তপ্ত নরককুণ্ডে দাঁড়িয়ে যখন সবুজ খোঁজা প্রায় অসম্ভব, ঠিক তখনই শহরের বিভিন্ন ভবনের ওপর চোখ রাখলে আজকাল দেখা যায় এক ভিন্ন গল্প। ধূসর দালানের মাথায় এখন আর শুধু ঝুলন্ত তার আর জলের ট্যাংকের একচ্ছত্র রাজত্ব নেই। কোথাও কোথাও দেখা মেলে এক চিলতে অরণ্যেরও। এর নাম ছাদবাগান।
রাজধানীর ইট-পাথরের দেয়ালগুলো যখন অনুভূত তাপমাত্রা ৪-৫ ডিগ্রি বাড়িয়ে দিচ্ছে, ঠিক তখনই নিঃশব্দে লড়াই চালাচ্ছে এ ছাদবাগানগুলো। শহুরে শৌখিন মানুষের এ বনায়ন শুধু বাতাস ঠান্ডাই করে না, বরং সূর্য আর ইটের মাঝখানে ঢাল হয়েও দাঁড়ায়। যে ছাদ সারা দিন রোদ শুষে পুরো বাড়িকে তপ্ত উনুন বানিয়ে রাখত, সে ছাদেই এখন ফলছে বিষমুক্ত টমেটো, আম, লেবু, পেয়ারা, মাল্টা, ডালিম, কুলসহ নানা ফল-ফুল এবং ভেষজ উদ্ভিদ। তবে এক্ষেত্রে অনেকের মনে প্রশ্ন জাগতেই পারে; দু-একটি ছাদবাগান দিয়ে কি সত্যিই এত বড় শহরের তাপমাত্রা বৃদ্ধি রোধ করা সম্ভব? উত্তর হলো— বিন্দু বিন্দু জল জমে যেমন মহাসাগর হয়, তেমনি প্রতিটি ছাদের এ ক্ষুদ্র প্রচেষ্টাই একসময় একত্রিত হয়ে গড়ে তুলবে এক বিশাল ‘ভার্টিক্যাল ফরেস্ট’। অন্যদিকে, ছাদবাগান যে শুধু তাপমাত্রা কমাচ্ছে এমনটি নয়; এটি শহরের পাখিজাতীয় জীববৈচিত্র্য ফিরিয়ে আনতেও সাহায্য করছে। আজকাল ছাদবাগানের ছোট গাছগুলোতে চোখে পড়ে চড়ুই, শালিক, দোয়েল, বুলবুলির আনাগোনা।
জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব কমাতে বর্তমানে গাছের কোনো বিকল্প নেই। বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি একটি নগরে অন্তত ২০ থেকে ২৫ শতাংশ সবুজ বেষ্টনী থাকে, তবে সেখানকার গড় তাপমাত্রা ২ থেকে ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত কমিয়ে আনা সম্ভব। নগর পরিকল্পনাবিদ এবং পরিবেশবিদদের মতে, বর্তমানে রাজধানীতে সবুজায়নের পরিমাণ ৫ শতাংশেরও কম। অথচ গবেষণা বলছে, একটি নগ্ন কংক্রিটের ছাদ সারা দিন যে পরিমাণ তাপ শোষণ করে, তার ওপর যদি সবুজের আস্তরণ থাকে তবে সেই তাপ শোষণ প্রায় ৭০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যায়। ফলে ঢাকার মতো নগর যেখানে গাছ লাগানোর মতো পর্যাপ্ত জায়গা নেই, সেখানে ছাদই একমাত্র ভরসা। ইটের বুকে ছাদবাগানের গাছের পাতাগুলো যেন এক-একটা প্রাকৃতিক এয়ার কন্ডিশনার। ইদানীং রাজধানীর বারিধারা, বনানী, ধানমন্ডি, মিরপুর, উত্তরা, কিংবা কাঁঠালবাগান; অনেক ভবনের ছাদেই চোখে পড়ে সবজি, ফল ও হরেকরকমের ফুলের বাগান।
পরিবেশবিদরা বলছেন, ঢাকায় দিন দিন ছাদবাগানের আধিক্য বাড়ছে। তবে পাশাপাশি তারা এটাও মনে করছেন; ঢাকার পরিবেশ পুনরুদ্ধারে শুধু ব্যক্তিগত উৎসাহই যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন সরকারি প্রণোদনা। সেই লক্ষ্যে দক্ষিণ ও উত্তর সিটি করপোরেশনও ছাদবাগানকে উৎসাহিত করতে বেশ কিছু ইতিবাচক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। বিশেষ করে যেসব বাড়ির ছাদে নির্দিষ্ট মানদণ্ড বজায় রেখে ছাদবাগান রয়েছে, তাদের জন্য বিধান রাখা হয়েছে ১০ শতাংশ পর্যন্ত হোল্ডিং ট্যাক্সে রেয়াত (ছাড়) দেওয়ার। কিন্তু এই ছাড় কি আদতেই কোনো প্রভাব ফেলছে নগরবাসীকে ছাদবাগানে আগ্রহী করতে? মিরপুরের এক বাড়ির মালিক বনি ইবনে কামালকে এ কথা জিজ্ঞেস করতেই হেসে বললেন, ‘কর ছাড়ের পেছনে দৌড়ানো ঝামেলার। তাই কখনো এই নিয়ে সিটি করপোরেশনে যাইনি। তবে আমার ছাদে টমেটো, কাঁচা মরিচ, শশা, পুঁইশাক, বেগুন হয়; নিজের হাতে লাগানো তাজা সেসব সবজি খেতে পারি এটাই বড় শান্তি।’
ছাদবাগান এখন আর কোনো বিলাসিতা নয়, বরং রাজধানীকে বায়ুদূষণ আর দাবদাহ থেকে বাঁচাতে এটা সময়ের দাবি। নগর পরিকল্পনাবিদদের পরামর্শ, নতুন ভবন নির্মাণের নকশা অনুমোদনের সময়ই বাড়ির মালিকদের জন্য ছাদবাগান বাধ্যতামূলক করা উচিত। তবে ছাদবাগানের কারণে ভবনের পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থায় যেন কাঠামোগত কোনো ক্ষতি না হয় কিংবা বাগানে জমা পানি এডিস মশার নীরব প্রজননস্থলে পরিণত না হয়, সে বিষয়েও সতর্ক থাকার পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের।
মেগাসিটি ঢাকার ভূমিতে নতুন করে বনায়নের জায়গা আর অবশিষ্ট নেই। সুতরাং এ শহরকে বাঁচাতে এখন একমাত্র বিকল্প— আকাশের কাছাকাছি থাকা ফাঁকা ছাদগুলো। ঢাকার বুকে যদি প্রতিটি ছাদ সবুজ হয়ে ওঠে তবে এ শহরটা হয়তো কোনোদিন বেঁচে থাকার নতুন সংজ্ঞা খুঁজে পাবে। কংক্রিটের জঙ্গল ভেঙে হয়তো গহিন অরণ্য পাওয়া যাবে না ঠিকই; তবে রুক্ষ-শুষ্ক ঢাকা রূপ নিতে পারে এক প্রাণবন্ত, সতেজ ও বসবাসযোগ্য ভালোবাসার নগরে। মাথার ওপর পড়ে থাকা শত শত একর খালি ছাদকে সবুজ সুতোয় গেঁথে এ ধূলিমলিন ধূসর নগরীকে ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব তার হারিয়ে যাওয়া জীবন, যা এই তপ্ত ঢাকা শহরের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার শেষ হাতিয়ার।






