ঢাকা যখন শ্বাসকষ্টে, রমনা তখন লাইফ সাপোর্ট

ছবি: আশিকুর রহমান
ইট-পাথরের ধূসর খাঁচায় বন্দি ঢাকা যখন দূষণ আর বিষাক্ত বাতাসে হাঁসফাঁস করে, তখন এক টুকরো স্বস্তির ঠিকানা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে চিরসবুজ রমনা পার্ক। যান্ত্রিক জীবনের ক্লান্তি ছাপিয়ে প্রতিদিন হাজারো মানুষকে বিশুদ্ধ অক্সিজেন, নির্মল পরিবেশ আর খানিকটা প্রশান্তির আশ্রয় দেয় এ উদ্যান। ৪০০ বছরের পুরনো রমনা পার্কের ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং টিকে থাকার নীরব সংগ্রামের গল্প লিখেছেন শম্পা বিশ্বাস
ঢাকা— ইট-পাথরের এক বিশাল কংক্রিটের খাঁচা। যার সকাল হয় ধোঁয়া আর সিসার বিষে, রাত হয় ফুসফুস ক্ষয়ে যাওয়া মুমূর্ষুর কাশিতে। এ ধূসর ক্যানভাসের বেড়াজালেই আটকে আছে নগরবাসীর দৈনন্দিন জীবনচক্র। কিন্তু ঢাকা যখন একটুখানি বুক ভরে শ্বাস নেওয়ার জায়গা খোঁজে, তখন একটি নামই সবার আগে মনে পড়ে— রমনা পার্ক।
মরণব্যাধি ধূসরতার ঠিক মাঝখানেই বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা রমনা পার্ক আসলে ঢাকার পাথুরে বুকে পরম মমতায় জন্ম নেওয়া এক চিরসবুজ জাদুকর। প্রাচীন মহীরুহ আর সুবিশাল লেকের এ স্নিগ্ধ রাজ্যটি ঢাকাবাসীকে মনে করিয়ে দেয় শহরটা যতই আধুনিক হোক না কেন, বেঁচে থাকতে হলে দিনশেষে প্রকৃতির শরণাগত হওয়া ছাড়া আর কোনো গতি নেই।
রমনা পার্কের ইতিহাস ঢাকা শহরের পত্তন এবং বিকাশের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তবে এর নামকরণ নিয়ে মতভেদ আছে। ইতিহাসবিদদের মতে, ১৬১০ সালে মোগল সুবেদার ইসলাম খান যখন ঢাকাকে বাংলার রাজধানী ঘোষণা করেন, তখন রমনা ‘বাগ-ই-পাদশাহন’ বা বাদশাহী বাগান নামে পরিচিত ছিল। সে সময় পারস্য থেকে বহু উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ঢাকায় আসতেন, যারা রাজধানীর এই উন্মুক্ত স্থান বা বাগানটিকে ‘রামনাহ’ (ফারসি শব্দ রামনাহ অর্থ উন্মুক্ত মাঠ বা বাগান) বলে ডাকতেন। পরবর্তীকালে লোকমুখে বিবর্তিত হয়ে এ পুরো এলাকাটি রমনা নামেই পরিচিত হয়ে ওঠে। অন্য একটি মত অনুযায়ী, এই এলাকার চোখজুড়ানো সবুজ সৌন্দর্য ও মনোরম পরিবেশের কারণে সংস্কৃত ‘রম্য’ (সুন্দর) বা ‘রমণীয়’ (উপভোগ্য) শব্দ থেকে ‘রমনা’ শব্দের উৎপত্তি হয়েছে।
আধুনিক রমনা পার্কের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয় ১৯৪৯ সালে। ২৪ কোটি টাকা ব্যয়ে এ পার্কের স্থায়ী রূপ দেওয়ার কাজ শুরু হয়েছিল, যার নকশা করেছিলেন তৎকালীন সরকারের স্থাপত্য বিভাগের স্থপতি ফজলুল করিম। তবে এর আগে লর্ড কার্জনের সময়ও রমনা এলাকার ব্যাপক উন্নয়ন হয়। বর্তমানে রমনা পার্কের মোট আয়তন প্রায় ৬৮ দশমিক ৫ একর। এর ঠিক মাঝখানে রয়েছে প্রায় ৮ দশমিক ৭৬ একরের একটি মনোরম কৃত্রিম লেক। ১৯৪৯ সালের পর পার্কের সৌন্দর্যবর্ধন এবং ভূগর্ভস্থ পানির স্তর বজায় রাখার জন্য এ লেকটি খনন করা হয়েছিল। বর্তমানে পার্কের ভেতরে তৈরি করা হয়েছে প্রায় সাড়ে তিন কিলোমিটার দীর্ঘ সুপ্রশস্ত ওয়াকিং ট্র্যাক বা হাঁটার পথ। এ ছাড়া শিশুদের বিনোদনের জন্য রয়েছে আলাদা কর্নার।
রমনা পার্কের তাপমাত্রা চারপাশের কংক্রিটের এলাকার চেয়ে ২ থেকে ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত কম থাকে
প্রতিদিন ভোরে হাজারো মানুষ ছুটে আসেন রমনা পার্কে। তবে কোনো প্রেয়সী কিংবা বিনোদনের টানে নয় বরং বিষাক্ত বায়ুর এ শহরে থেকে প্রতিদিন যে আয়ুটুকু কমে যাচ্ছে, বুক ভরে শ্বাস নিয়ে খাঁটি অক্সিজেনে তা একটুখানি বাড়িয়ে নেওয়ার আশায়। তাদেরই একজন সত্তরোর্ধ্ব ইশতিয়াক আহমেদ। রোজ সকালে তিনি হাঁটতে আসেন রমনা পার্কে। বলছিলেন, ‘শ্বাসকষ্টের রোগী আমি। তার ওপর ডায়াবেটিস আছে। এই শহরের বাতাসে ধুলো আর বিষ ছাড়া তো কিছু নেই। প্রতিদিন খোলা বাতাসে হাঁটতে বলেছে ডাক্তার। কিন্তু এ রমনা ছাড়া আর তেমন জায়গা কোথায় ঢাকায়? আমাদের মতো বুড়োদের জন্য রমনাই হলো ইট-পাথরের খাঁচায় বেঁচে থাকার শেষ আশ্রয়।’
ইশতিয়াক আহমেদের মতো এমন হাজারো মানুষ প্রতিদিন একটুখানি খাঁটি অক্সিজেনের খোঁজে ছুটে আসেন রমনায়। রাজধানীর এ উদ্যানটি আজ তাই শুধু এক টুকরো বাগান নয়, এটি মুমূর্ষু মেগাসিটির বেঁচে থাকার একমাত্র সচল ‘ফুসফুস’। শাহবাগ কিংবা মৎস্য ভবনের মোড়ে গাড়ির চাকার কর্কশ গর্জন আর ধুলোর ঝড়ে বিপর্যস্ত পথিকও কখনো কখনো ছোটেন অদূরের রমনা পার্কের শীতল ছায়ায় দুদণ্ড জিরোতে। মৃদু তন্দ্রায় রাজধানীর তপ্ত রাস্তায় ছুটন্ত গাড়ির চাকার ঘর্ষণের কর্কশ শব্দ ছাপিয়ে তার কানে আসে পাখির কলকাকলি। তবে রমনা শুধু সৌন্দর্য আর হাঁটার জায়গা নয়। বরং এ পার্কটিকে ঢাকার ‘উদ্ভিদ উদ্যান’ও বলা যায়। গণপূর্ত অধিদপ্তরের এক জরিপ অনুযায়ী, এ পার্কে প্রায় ৭১ প্রজাতির গুল্ম, ২১১ প্রজাতির বৃক্ষ এবং কয়েক ডজন ঔষধি ও বিরল প্রজাতির উদ্ভিদ রয়েছে।
প্রতি ঋতুতে রমনায় ফোটা ফুলের সমারোহ রাজধানীবাসীকে মনে করিয়ে দেয় ঋতুর পালাবদলের কথা। বর্ষায় কদম-কেয়া আর বসন্তে কৃষ্ণচূড়া, রাধাচূড়া, জারুল, সোনালুর মেলা বসে এ পার্কে। শুধু গাছপালা আর ফুলফলই নয়, এ পার্কটি পাখিদেরও সবচেয়ে নিরাপদ আবাসস্থল।
এখানেই শেষ নয়, কংক্রিটের ঢাকার জন্য রমনার অবদান আরও। বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত বায়ুর শহরের তালিকায় ঢাকা যখন শীর্ষস্থানে পৌঁছায়, তখন রমনা পার্ক একাই ঢাকাবাসীকে বাঁচিয়ে রাখার নীরব লড়াই করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের গবেষণা বলছে, রমনা পার্কের হাজার হাজার গাছ প্রতিদিন টন টন কার্বন ডাইঅক্সাইড শোষণ করে। ফলে এই এলাকার তাপমাত্রা চারপাশের কংক্রিটের এলাকার চেয়ে গড়ে ২ থেকে ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত কম থাকে, যা ঢাকাকে ‘আরবান হিট আইল্যান্ড ইফেক্ট’ বা তাপদ্বীপ প্রভাব কমাতে সাহায্য করছে।
বাঙালির ঐতিহ্যের সঙ্গেও রমনার সম্পর্ক নিবিড়। প্রাণের উৎসব ‘পহেলা বৈশাখ’ এ পার্কেরই বটমূলে উদযাপিত হয়। ১৯৬৭ সাল থেকে ছায়ানটের বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে রমনার বটমূল বাঙালি সংস্কৃতিরও এক অবিচ্ছেদ্য ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে। তবে দিন দিন সেই ঐতিহ্যের ধারক রমনাও আক্রান্ত হচ্ছে দূষণে। প্রতিদিন পার্কটিতে বেড়াতে আসা অসচেতন দর্শনার্থীদের কারণে এর পরিবেশ হুমকির মুখে পড়ছে। যেখানে-সেখানে প্লাস্টিক বর্জ্য, লেকের পানির দূষণ আর গাছের ডালপালা ভাঙার মতো ঘটনা ঘটছে অহরহ। তাই এ দূষণ থেকে ঢাকার প্রাচীন ‘ফুসফুস’কে বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্ব নিতে হবে সবার। সরকার, নগরবাসী, দর্শনার্থী; প্রত্যেকের। কারণ, রমনা বাঁচলে চলবে ঢাকাবাসীর প্রশ্বাস।





