নাম ছিল তার ‘মুড়ির টিন’

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
কাঠ ও টিনের কাঠামো, ইঞ্জিনের গর্জন আর গাদাগাদি যাত্রার চিরচেনা ‘মুড়ির টিন’ বাস শুধু একটি গণপরিবহন ছিল না, বরং এটি ছিল ঢাকার ইতিহাসের এক জীবন্ত অধ্যায়। মওলা বখশ সরদারের হাত ধরে শুরু হওয়া এই বাসের বিবর্তন, নস্টালজিয়া এবং নগরজীবনের পরিবর্তনের চিত্র তুলে ধরেছেন সাজিদ রহমান
একসময় ঢাকার রাস্তায় চলত কাঠ আর টিনে মোড়ানো অদ্ভুত এক বাস। ইঞ্জিনের গর্জন, কাঠের বডির কাঁপুনি আর যাত্রীদের গাদাগাদি— সব মিলিয়ে চলার ধরন ছিল অন্যরকম। নাম তার ‘মুড়ির টিন’। ঢাকার পুরনো দিনের মানুষের কাছে মুড়ির টিন ছিল এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের নাম। একসময় এই বাসেই মানুষ ছুটত কর্মস্থলে, বাজারে কিংবা দূরের জনপদে। ঢাকার পরিবহন ইতিহাসে এই বাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে একজন দেশীয় উদ্যোক্তার নাম— মওলা বখশ সরদার।
মোটরযন্ত্রের প্রতি মওলা বখশের আকর্ষণ ছিল প্রবল। ত্রিশের দশকে ঢাকায় মোটরসাইকেল ছিল দুটি; একটির মালিক ছিলেন ব্রিটিশ ম্যাজিস্ট্রেট, অন্যটি মওলা বখশের নিজের। কলকাতায় যাওয়ার সময় তিনি মোটরসাইকেলটির যন্ত্রাংশ খুলে বস্তায় ভরে ট্রেনে নিয়ে যেতেন, আর সেখানে পৌঁছে আবার জোড়া লাগিয়ে চালাতেন। যন্ত্রের প্রতি এই টানই পরবর্তী সময়ে তাকে মোটর মেরামত ও পরিবহন ব্যবসায় টেনে নিয়ে যায়। কলকাতার বেঙ্গল মোটর ওয়ার্কসে গাড়ি মেরামতের কাজ শিখেছিলেন মওলা বখশ। ঢাকায় ফিরে নবাবপুরের এক ওয়ার্কশপে কাজও শুরু করেন। এরপর ১৯৩২ সালে ফরাশগঞ্জে নিজের ওয়ার্কশপ ‘ইন্ডিয়া মোটর ওয়ার্কস’ গড়ে তোলেন। এটি ছিল তৎকালীন পূর্ববঙ্গে বাঙালি মুসলমানের মালিকানাধীন প্রথম দিককার অটোমোবাইল ওয়ার্কশপগুলোর একটি। তখন ঢাকায় মোটরগাড়ি ছিল হাতেগোনা। মওলা বখশের নিজের দুটি গাড়িও ভাড়ায় চলত, মূলত ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রুটে। এরপর এলো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। যুদ্ধ শেষে মিত্র বাহিনীর ব্যবহৃত ট্রাক নিলামে বিক্রি হতে থাকল। মওলা বখশ চট্টগ্রামের ডিপো থেকে প্রায় সাত-আটটি পুরনো ট্রাক কিনে আনলেন। স্থানীয় কাঠমিস্ত্রি, কামার ও অন্যান্য কারিগরের সহায়তায় যাত্রীবাহী বাসে রূপান্তর করলেন। প্রচলিত তথ্যমতে, বাসগুলোর চেসিস ছিল ফোর্ডের আর ইঞ্জিন শেভ্রোলের। এভাবেই ১৯৪৬-৪৭ সালের দিকে ঢাকার রাস্তায় পরিচিতি পেতে শুরু করে মুড়ির টিন। বাসগুলোর কাঠের কাঠামোর ওপর লাগানো হতো টিনের আবরণ। দেখতে অনেকটা মুড়ি রাখার টিনের পাত্রের মতো হওয়ায় নামটি প্রচলিত হয়। অন্য একটি ব্যাখ্যাও চালু আছে, বাসের ভেতরে মুড়ির মতো ঠেসে যাত্রী তোলা হতো বলে এই নাম।
বিংশ শতাব্দীর ষাট ও সত্তরের দশকে মুড়ির টিন ছিল ঢাকার পরিচিত দৃশ্য। চারপাশে কাঠের বেঞ্চের মতো আসন, মাঝখানে দাঁড়ানোর জায়গা। কোনো কোনো বাসে ২০-২২ জন বসতে পারতেন; দাঁড়িয়ে যেতেন আরও ৪০-৫০ জন। শুরুর দিকের কিছু বাসে ছোট কেবিন থাকত, যেখানে মূলত ব্যবসায়ীরা নগদ টাকা নিয়ে যাতায়াত করতেন। প্রথমদিকে ইঞ্জিন চালু করতে হতো হাতল ঘুরিয়ে। ড্রাইভারের পাশে থাকত রাবারের বলের মতো হর্ন, যা চাপ দিলে শব্দ হতো। ডানে-বামে যাওয়ার সময় ড্রাইভার কাঠের টুকরো ব্যবহার করে সিগন্যাল দিতেন। গরমের দুপুরে খোলা জানালা দিয়ে ধুলো উড়ে আসত, ইঞ্জিনের শব্দে পাশের যাত্রীর কথাও ঠিকমতো শোনা যেত না। রাস্তার খানাখন্দে পড়লেই কাঠের বডি কেঁপে উঠত আর ভেতরে বসা ও দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলো দুলে উঠতেন। সেই কাঁপুনি, শব্দ আর গাদাগাদি মিলিয়েই তৈরি হয়েছিল ঢাকার গণপরিবহনের এক স্বতন্ত্র স্মৃতি।
বাহাদুর শাহ পার্ক থেকে নারায়ণগঞ্জ ছিল মুড়ির টিনের প্রধান রুট। পরে চকবাজার, মিরপুর, সাভার, কালিয়াকৈর ও চন্দ্রার মতো রুটেও এ ধরনের বাস চলাচল করত। এই পরিবহন ব্যবসায় মওলা বখশ ছাড়াও ছিলেন হাবিবুর রহমান খান, আলী আহমেদ সরদার প্রমুখ। জনপ্রিয় হিন্দি চলচ্চিত্র কিসমত, পুকার, আজাদ, তাজমহল-এর নামে নাম ছিল বাসগুলোর। ১৯৬৭ সালে মওলা বখশের ছেলে আজিম বখশ পরিবহন ব্যবসায় যুক্ত হয়ে বাসগুলোতে সেলফ স্টার্টার ও বৈদ্যুতিক হর্ন সংযোজন করেন। নতুন একটি দেশের রাজধানী শহর তখন পুরান ঢাকার সীমানা ছাড়িয়ে বিস্তৃত হচ্ছিল। মানুষ নতুন এলাকায় বসতি গড়ছিল; বাড়ছিল কর্মস্থল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দূরত্ব। সেই পরিবর্তনশীল শহরে সাধারণ মানুষের যাতায়াতের প্রয়োজন মেটাচ্ছিল এই বাসগুলো। আরাম কিংবা নিরাপত্তার বিচারে এর সীমাবদ্ধতা ছিল অনেক; কিন্তু স্বল্প আয়ের মানুষের চলাচলে এর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। আশির দশকের শেষভাগেও ঢাকার রাস্তায় মুড়ির টিন দেখা যেত; নব্বইয়ের দশকে তা ক্রমে বিরল হয়ে যায়।
২০২৩ সালে কোক স্টুডিও বাংলার মুড়ির টিন গানেও সেই গল্প রয়েছে। সেই গানে লোকাল বাসের গাদাগাদি যাত্রা, চালক-হেলপারের হাঁকডাক আর আঞ্চলিক ভাষার প্রাণচাঞ্চল্যকে সংগীতে রূপ দেওয়া হয়েছে। গানটি মওলা বখশের বাসের ইতিহাস নয়; তবে উঠে এসেছে বাংলাদেশের গণপরিবহনের দীর্ঘ সাংস্কৃতিক স্মৃতি— যেখানে একটি বাস শুধু বাহন নয়, মানুষের দৈনন্দিন জীবনেরও অংশ। একসময় যে ঢাকার রাস্তায় কাঠ আর টিনের মুড়ির টিন মানুষকে গন্তব্যে পৌঁছে দিত, সেই ঢাকাতেই আজ ছুটে চলে আধুনিক যোগাযোগব্যবস্থা মেট্রোরেল। যানবাহন বদলেছে, বদলেছে শহরের গতি-প্রকৃতি; কিন্তু নগরজীবনের সেই পুরনো প্রশ্নটি আজও রয়ে গেছে— কীভাবে মানুষকে নিরাপদে, স্বাচ্ছন্দ্যে ও সময়মতো গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়া যায়।
মওলা বখশের মুড়ির টিন শুধু অতীতের স্মৃতি নয়; এটি ঢাকার গণপরিবহনের অতীত থেকে বর্তমানকে দেখারও একটি জানালা।



