রান্না যখন বিশ্ব ভ্রমণের পাসপোর্ট
- শেফের সাদা অ্যাপ্রোন বিশ্বমঞ্চে পা রাখার প্রথম টিকিট

রন্ধনশিল্প চার দেয়ালের রান্নাঘরে আটকে থাকা কোনো পেশা নয়; এটি গ্ল্যামারার্স ও প্রভাবশালী ক্যারিয়ার। সোশ্যাল মিডিয়া, টিভি শো আর আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার মাধ্যমে একজন শেফ হয়ে উঠতে পারেন বিশ্ব জুড়ে পরিচিত এক আইকন। কেননা, ইংরেজি, ফ্রেঞ্চ কিংবা ম্যান্ডারিন— বিদেশি কোনো ভাষা না জেনেও একটি ভাষায় সারা বিশ্বের মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব; সেটি খাবারের ভাষা।
তাই যারা শুধু একটি চাকরি নয়; বরং খাবারের সেই চিরন্তন ভাষাকে কাজে লাগিয়ে খ্যাতি, সম্মান আর দুনিয়া জুড়ে প্রভাব বিস্তারের স্বপ্ন দেখেন, তাদের জন্য শেফের সাদা অ্যাপ্রোনটি শুধু একটি পোশাক নয়, এটি বিশ্বমঞ্চে পা রাখার প্রথম টিকিট।
ক্যারিয়ার গড়ার প্রথম ধাপ
বাংলাদেশে শেফ হওয়ার জন্য রয়েছে সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। যেখানে রান্না শেখার পাশাপাশি আরও জেনে যাবেন আন্তর্জাতিক মানের খাবার তৈরি ও পরিবেশন করা (ফুড অ্যান্ড বেভারেজ), হাসিমুখে অতিথিদের সামলানো (ফ্রন্ট অফিস), হোটেলের সৌন্দর্য ও পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা (হাউজকিপিং) কিংবা জিভে জল আনা কেক ও পেস্ট্রি বানানোর (বেকারি) কলাকৌশল। এককথায়, আতিথেয়তা শিল্পের প্রতিটি দিক সম্পর্কে আপনাকে বিশেষজ্ঞ করে তোলা হবে।
সরকারি শিক্ষাঙ্গন
বাংলাদেশে হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্টে বিশ্বমানের ও সাশ্রয়ী শিক্ষার জন্য সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোই শীর্ষে। এ বিষয়ে উচ্চশিক্ষার গোড়াপত্তন করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, যার ‘ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট’ বিভাগটি আজও দেশের অন্যতম সেরা হিসেবে স্বীকৃত। এ ছাড়া দেশ জুড়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় (কুষ্টিয়া), নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং রাঙামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো শীর্ষ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এ বিষয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি করার সুযোগ রয়েছে।
- ন্যাশনাল হোটেল অ্যান্ড ট্যুরিজম ট্রেনিং ইনস্টিটিউট: বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন পরিচালিত এই প্রতিষ্ঠান দেশে এ খাতে সবচেয়ে বিখ্যাত। এখানকার ‘ডিপ্লোমা ইন ফুড অ্যান্ড বেভারেজ প্রোডাকশন’ কোর্সটি শেফ হওয়ার জন্য আদর্শ। দেশ-বিদেশে এর সনদের রয়েছে ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা।
একজন দক্ষ শেফের কোনো ভৌগোলিক সীমানা নেই; তার কাজের পরিধি দুনিয়া জুড়ে
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান
হাতে-কলমে আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ পেতে চাইলে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোও দারুণ।
- বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়: ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস অ্যাগ্রিকালচার অ্যান্ড টেকনোলজির মতো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো ‘ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট’-এ স্নাতক ডিগ্রি শেফ হওয়ার পাশাপাশি ব্যবস্থাপনার জ্ঞানও দেয়।
- বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান: টমি মিয়া’স হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট ইনস্টিটিউট এবং টনি খান কালিনারি ইনস্টিটিউটের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো সরাসরি হাতে-কলমে আধুনিক রান্না শেখানোর জন্য জনপ্রিয়। এখান থেকে দ্রুত কোর্স শেষ করে দেশ-বিদেশে চাকরির জন্য নিজেকে প্রস্তুত করা সম্ভব।
কোর্সের ধরন
- ডিপ্লোমা বা সার্টিফিকেট কোর্স (১-২ বছর): দ্রুত হাতে-কলমে কাজ শিখে চাকরিতে যোগ দেওয়ার জন্য অসাধারণ।
- স্নাতক অথবা ডিগ্রি কোর্স (৪ বছর): যারা শুধু রান্না নয়; বরং ভবিষ্যতে হোটেল বা রেস্টুরেন্ট পরিচালনা করতে চান, তাদের জন্য এই ডিগ্রি উপযুক্ত।
সম্ভাবনার অপার প্রান্তর
- দেশি প্রেক্ষাপট: পাঁচতারকা হোটেল থেকে শুরু করে ছোট ক্যাফে পর্যন্ত, হোটেল ও রেস্টুরেন্ট সবখানেই দক্ষ শেফের চাহিদা ব্যাপক। পাশাপাশি এ পেশায় উদ্যোক্তা হিসেবে নিজের রেস্টুরেন্ট, ক্যাফে বা ক্যাটারিং ব্যবসা শুরু করারও দারুণ সুযোগ রয়েছে। তা ছাড়া শেফের কাজ এখন শুধু রান্নাতেই সীমাবদ্ধ নয়; ফুড ব্লগার, টিভি শো, ফুড কনসালট্যান্ট, এমনকি বিভিন্ন খাদ্য প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানেও কাজের সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে।
- আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডল: বাংলাদেশি শেফদের জন্য বিদেশের দরজা সবসময় খোলা। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যে, বিশেষ করে বিলাসবহুল ক্রুজ শিপে রন্ধনশিল্পীদের রয়েছে চাহিদা ও সম্মান। বিদেশে বেতন কাঠামোও আকর্ষণীয়। পাশাপাশি একজন দক্ষ শেফের কোনো ভৌগোলিক সীমানা নেই; তার কাজের পরিধি দুনিয়া জুড়ে। এ ক্ষেত্রে শিল্পই তার পাসপোর্ট।
প্রেরণার বাতিঘর
রন্ধনশিল্পের দারুণ সম্ভাবনার চমৎকার উদাহরণ এক্সিকিউটিভ শেফ শীতল বটলেরু। তার গল্পটি শুরু হয়েছিল মায়ের রান্নাঘরের এক কোণ থেকে, যা আজ তাকে ইন্টারকন্টিনেন্টাল ঢাকার মতো বিশ্বমানের হোটেলের নেতৃত্বে নিয়ে গেছে। তিনি বললেন, ‘শেফ হওয়া সহজ নয়। এর জন্য প্রয়োজন ধৈর্য, খাবারের প্রতি ভালোবাসা এবং যেকোনো ত্যাগ স্বীকার করার মানসিকতা।’ স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে তিনি দেশ-বিদেশে বিভিন্ন কোর্স সম্পন্ন করেন এবং দুবাইয়ের জুমেইরা গ্রুপের মতো বিশ্বসেরা প্রতিষ্ঠানে ১৮ বছরের বেশি সময় কাজ করেছেন।
শুধু আবেগ আর রান্নার দক্ষতাকেই সফলতার একমাত্র চাবিকাঠি মনে করেন না শীতল। তার মতে, আজকের প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে একজন শেফকে অনেক গুণে গুণান্বিত হতে হয়।
তরুণদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘রন্ধনশিল্প এমন একটি পেশা, যেখানে বেকার থাকার সুযোগ নেই। একজন দক্ষ শেফের চাহিদা বিশ্ব জুড়ে।’
কৃতজ্ঞতা : দ্য অ্যাকাডেমি অব কালিনারি অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট
ছবি: সাজ্জাদ হোসেন







