‘শৃঙ্খলা থাকলে জীবনের যেকোনো সময়ে এগিয়ে যাবেন’

আগামীর সময় কার্যালয়ে ক্যারিয়ার ক্লাব আয়োজিত ‘করপোরেট ইনসাইডার: সাফল্যের পিছনের গল্প’ শীর্ষক সেশনে অথিতিরা
সাফল্য কোনো নির্দিষ্ট গন্তব্য নয়; বরং এটি জীবনের এক ধাপ থেকে আরেক ধাপে এগিয়ে যাওয়ার ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। প্রতিভা, পরিশ্রম, দক্ষতা ও সম্পর্ক তৈরির পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি সাফল্যের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো শৃঙ্খলা। নিয়মিত কাজ, শেখার আগ্রহ এবং নিজের লক্ষ্য সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা থাকলে ক্যারিয়ারে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব—এমন মত দিয়েছেন মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের (এমজিআই) চিফ মার্কেটিং অফিসার কাজী মো. মহিউদ্দিন।
আজ শনিবার বেলা ১১টায় রাজধানীর কারওয়ান বাজারে আগামীর সময়ের নিজস্ব কার্যালয়ে ক্যারিয়ার ক্লাব আয়োজিত ‘করপোরেট ইনসাইডার : সাফল্যের পিছনের গল্প’ শীর্ষক সেশনে তিনি এসব কথা বলেন।
সেশনে নিজের কর্মজীবনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে কাজী মো. মহিউদ্দিন বললেন, সাফল্যের কোনো শেষ নেই। জীবনের একটি পর্যায়ের সাফল্য মানুষকে পরবর্তী পর্যায়ে নিয়ে যায়। তাই একটি অর্জনকে জীবনের শেষ গন্তব্য হিসেবে দেখলে চলবে না। বরং প্রতিটি অর্জনের পর নতুন লক্ষ্য নির্ধারণ করে সামনে এগিয়ে যেতে হবে।
তার জীবনের সফলতার পেছনের কথা বলতে গিয়ে তিনি বললেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্সে পড়ার সময় একটি ব্যতিক্রমী বিজ্ঞাপন তার কর্মজীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। ‘ইউনিট’ নামের একটি বিজ্ঞাপনী সংস্থার নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দেখে তিনি আবেদন করেন। প্রথম চাকরিতে তার বেতন ছিল ১৮ হাজার ৩০০ টাকা। চাকরির সাক্ষাৎকারের অভিজ্ঞতাটিও ছিল ব্যতিক্রমী। অন্য প্রার্থীরা যেখানে প্রস্তুত স্লাইড নিয়ে এসেছিলেন, সেখানে তিনি সাদা খাতায় নিজের ধারণাগুলো লিখে উপস্থাপন করেন। তার আত্মবিশ্বাস, চিন্তার ধরন এবং সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা নিয়োগদাতাদের নজর কাড়ে। শেষ পর্যন্ত তিনি চাকরিটি পান এবং সেখানে প্রায় সাড়ে চার বছর কাজ করেন।
এরপর ইতালিয়ান-ডাচ প্রতিষ্ঠান পারফেটি ভ্যান মেলেতে ব্র্যান্ড ম্যানেজার হিসেবে প্রায় আড়াই বছর কাজ করেন। ২০১০ সালে বিজ্ঞাপনী সংস্থা মিডিয়াকমে যোগ দিয়ে ২০১৭ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। পরে তিনি মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজে যোগ দেন। তার দীর্ঘ কর্মজীবনের প্রায় অর্ধেক সময় কেটেছে কমিউনিকেশন ও বিজ্ঞাপন খাতে, আর বাকি সময় মার্কেটিংয়ে।
তরুণদের ক্যারিয়ার গঠনের ক্ষেত্রে কাজী মো. মহিউদ্দিন পাঁচটি বিষয়কে বিশেষ গুরুত্ব দেন। প্রথমত, শেখার জন্য বাড়তি সময় দিতে হবে। শুধু দায়িত্ব পালন করলেই হবে না, কাজটি কীভাবে আরও ভালোভাবে করা যায় তা শেখার জন্য অন্যদের তুলনায় বেশি সময় দিতে হবে। ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে শেখার পেছনে দেওয়া সময় ভবিষ্যতে বড় বিনিয়োগ হিসেবে কাজ করে।
দ্বিতীয়ত, মানুষকে বুঝতে হবে। কর্মক্ষেত্রে শুধু নিজের কাজ জানলেই সফল হওয়া যায় না। সহকর্মী, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও ক্লায়েন্টের ব্যক্তিত্বের ‘সফট’ ও ‘হার্ড’ দিক বুঝে তাদের সঙ্গে কার্যকর সম্পর্ক তৈরি করতে হয়। মানুষের আচরণ ও প্রয়োজন বুঝে যোগাযোগ করার দক্ষতা ক্যারিয়ারে বড় ভূমিকা রাখে।
তৃতীয়ত, হার্ড ওয়ার্ক ও স্মার্ট ওয়ার্ক—দুটিই গুরুত্বপূর্ণ। তার মতে, দুটির মধ্যে কোনো বিরোধ নেই। সফলতার কোনো শর্টকাট নেই। এ প্রসঙ্গে ক্রিকেট কিংবদন্তি শচীন টেন্ডুলকারের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, প্রতিভা থাকলেই দীর্ঘদিন সফল থাকা যায় না; প্রতিভাকে কাজে লাগাতে নিয়মিত কঠোর পরিশ্রম প্রয়োজন।
চতুর্থত, প্রতিভার চেয়ে শৃঙ্খলা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। একজন মানুষ হয়তো প্রতিভাবান; কিন্তু নিয়মিত অনুশীলন ও পরিশ্রম না করলে সেই প্রতিভা কাজে আসে না। নিয়মিত ঘুম, পড়াশোনা, কাজ, শরীরচর্চা এবং নিজের দায়িত্ব পালনের অভ্যাস দীর্ঘদিন ধরে বজায় রাখাই শৃঙ্খলার মূল কথা।
পঞ্চমত, জীবনে বড় লক্ষ্য থাকতে হবে। লক্ষ্য যত পরিষ্কার হবে, পথে আসা ছোটখাটো অপমান, ব্যর্থতা, বাধা কিংবা হতাশা তত কম প্রভাব ফেলবে। বড় লক্ষ্য মানুষকে সাময়িক ব্যর্থতার বাইরে গিয়ে দীর্ঘমেয়াদি সাফল্যের দিকে তাকাতে শেখায়।
কাজী মো. মহিউদ্দিন বলেছেন, ক্যারিয়ারে এক দিনে বড় সাফল্য আসে না। প্রতিদিনের ছোট ছোট অভ্যাসই একসময় বড় ফল তৈরি করে। প্রতিভা একজন মানুষকে শুরুতে এগিয়ে দিতে পারে; কিন্তু নিয়মিত পরিশ্রম ও শৃঙ্খলা তাকে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে সাহায্য করে। তরুণদের জন্য তার অভিজ্ঞতার সারকথা হলো—শেখার জন্য অতিরিক্ত সময় দেওয়া, মানুষের সঙ্গে সুসম্পর্ক তৈরি, কঠোর ও বুদ্ধিদীপ্ত পরিশ্রম, নিয়মিত জীবনযাপন এবং একটি বড় লক্ষ্যকে জীবনের অভ্যাসে পরিণত করতে পারলে ক্যারিয়ারে এগিয়ে যাওয়ার পথ অনেকটাই সহজ হয়। সাফল্য তাই শুধু মেধাবীদের জন্য নয়; বরং যারা নিজেদের লক্ষ্য ঠিক করে প্রতিদিন একই নিষ্ঠায় কাজ করে যেতে পারেন, দীর্ঘমেয়াদে তারাই এগিয়ে যান।
আগামীর সময়ের সম্পাদক মোস্তফা মামুন বললেন, ক্যারিয়ার ক্লাবের নতুন অধ্যায়ের দ্বিতীয় আয়োজনের লক্ষ্য ছিল মিডিয়াকে সামাজিক কাজের প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজে লাগানো। নিয়মিত পাঠকদের সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করে তাদের ‘মিডিয়া অ্যাম্বাসেডর’ হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একজন উপকৃত মানুষ আরও পাঁচজনকে, তারা আরও দশজনকে উপকৃত করলে কল্যাণের পরিধি বাড়বে।
অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন আগামী সময়ের নির্বাহী সম্পাদক এহসানুল হক, ক্যারিয়ার ক্লাবের পরিচালক সাইদুজ্জামান রওশন (দন্ত্যস রওশন), ক্রিয়েটিভ রিসার্চ অ্যান্ড ইভেন্টের ডেপুটি হেড নাজির হোসেন।









