অভিজ্ঞতার আলো
গ্লোবাল চাকরির সহজপাঠ

বিদেশি দূতাবাস ও আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থায় কাজের মাধ্যমে দেশে অবস্থান করেই পাওয়া যায় আন্তর্জাতিক কর্মপরিবেশের অভিজ্ঞতা। মডেল: নীহারিকা নাজ। ছবি: সাজ্জাদ হোসেন
দেশে অবস্থান করেই বিদেশি দূতাবাস ও আন্তর্জাতিক সংস্থায় কাজের বাস্তব অভিজ্ঞতা, সুযোগ-সুবিধা এবং প্রবেশের কার্যকর কৌশল নিয়ে বিশদ আলোকপাত করেছেন আলীমূল হাসান
আন্তর্জাতিক পরিসরে কাজের স্বপ্ন থাকলে দেশের বাইরে পাড়ি জমানোই একমাত্র পথ নয়। বিদেশি দূতাবাস ও আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থায় কাজের মাধ্যমে দেশে অবস্থান করেই পাওয়া যায় আন্তর্জাতিক কর্মপরিবেশের অভিজ্ঞতা। কূটনৈতিক সম্পর্ক, উন্নয়ন সহযোগিতা, গবেষণা, নীতিনির্ধারণ ও বৈশ্বিক বিভিন্ন ইস্যুতে কাজের সুযোগ থাকায় তরুণদের জন্য এ খাত হতে পারে সম্ভাবনাময় ক্যারিয়ার ক্ষেত্র।
নেপথ্যে যে কাজ
একটি বিদেশি দূতাবাস শুধু দুজন রাষ্ট্রদূতের যোগাযোগের স্থান নয়; এটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, সংস্কৃতি, কূটনীতি এবং ভিসা ব্যবস্থাপনার সমন্বিত কেন্দ্র। কূটনৈতিক পদের বাইরে স্থানীয় বাংলাদেশি পেশাজীবীদের জন্য রয়েছে কাজের বিশাল সুযোগ। গবেষণা ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক হিসেবে কাজের সুযোগ আছে। এ ক্ষেত্রে উন্নয়নশীল দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, অর্থনীতি ও সামাজিক পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করে মূল কার্যালয়ে প্রতিবেদন পাঠানোর কাজ করতে হয়। আবার ভিসা ও কনস্যুলার সার্ভিসেও কাজের সুযোগ দেখা যায়। ভিসা আবেদন যাচাই, ইন্টারভিউ গ্রহণ এবং প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনা করতে হয়। আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ কাজের জায়গা হচ্ছে প্রেস ও তথ্য বিভাগ। সংশ্লিষ্ট দেশের সঙ্গে স্থানীয় গণমাধ্যমের যোগাযোগ রক্ষা এবং জনসংযোগ পরিচালনার কাজের সুযোগ আছে। এ ছাড়া বাণিজ্য ও বিনিয়োগ কর্মকর্তা হিসেবে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য বৃদ্ধি, বিনিয়োগ আকর্ষণ ও স্থানীয় বাজারের তথ্য বিশ্লেষণে কাজ আছে। আবার দূতাবাসের প্রশাসনিক, আইটি ও ফাইন্যান্স বিভাগে দৈনন্দিন দাপ্তরিক কাজ, আইটি অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ এবং হিসাব পরিচালনার কাজের ক্ষেত্রে আছে।
শিক্ষাগত যোগ্যতা
আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোতে কোনো নির্দিষ্ট একটি বিষয়ের একক আধিপত্য নেই। কাজের ধরনের ওপর ভিত্তি করে এখানে মেধার প্রয়োজন হয়। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সাধারণত আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও উন্নয়ন অধ্যয়নের শিক্ষার্থীদের কাজের নানা সুযোগ রয়েছে। কূটনীতি, বৈশ্বিক নীতি এবং উন্নয়ন প্রকল্প সম্পর্কিত কাজের জন্য আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বা পাবলিক পলিসির শিক্ষার্থীরা অগ্রাধিকার পান অনেক সময়। আবার আইন ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের শিক্ষার্থীরাও কাজের সুযোগ পান। রাজনৈতিক বিশ্লেষণ, চুক্তি সম্পাদন এবং নীতি প্রণয়নের ক্ষেত্রে আইন ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের পটভূমি অত্যন্ত সহায়ক বলে তাদের কাজের সুযোগ অনেক। বিশেষভাবে ব্যবসা ও অর্থনীতি-সংশ্লিষ্ট কাজের জন্য বাণিজ্য কূটনীতি, অর্থায়ন এবং মনিটরিং কাজের ক্ষেত্রে অর্থনীতি, অর্থায়ন, কিংবা এমবিএ সম্পন্নকারীদের প্রচুর চাহিদা রয়েছে। আবার প্রকৌশল ও সিভিল অবকাঠামোর জন্য বিভিন্ন সংস্থা যখন সেতু, মেট্রোরেল বা বিদ্যুৎকেন্দ্র তৈরিতে কাজ করে, তখন সিভিল বা মেকানিক্যাল প্রকৌশলীদের প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্টে যুক্ত করা হয়।
প্রস্তুতির ধাপ
শিক্ষাজীবনেই কিছু অতিরিক্ত প্রস্তুতি শিক্ষার্থীকে বহুদূর এগিয়ে রাখে। প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্ট প্রফেশনালসের মতো সনদ অর্জন প্রজেক্টকেন্দ্রিক চাকরির সুযোগ বহু গুণ বাড়িয়ে দেয়। আবার ডেটা অ্যানালিটিকস ও আইটি ক্ষেত্রে এসপিএসএস, স্টাটা, কিংবা আধুনিক ডেটা ভিজ্যুয়ালাইজেশন টুলস শেখা থাকলে মনিটরিং পদের পথ সুগম হয়। এ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে আন্তর্জাতিক সংস্থা, ইউএন ভিলেজ বা বিভিন্ন দূতাবাসের গবেষণা প্রকল্পে ভলান্টিয়ার বা ইন্টার্ন হিসেবে কাজ করার অভিজ্ঞতা ইন্টারভিউ বোর্ডে সবচেয়ে বড় শক্তি হিসেবে কাজ করে।
বিদেশি সংস্থা ও দূতাবাসে টিকতে হলে ইংরেজি ভাষার ওপর পূর্ণ দক্ষতা থাকতে হবে
দক্ষতা ও ভাষাজ্ঞান
বিদেশি সংস্থা ও দূতাবাসে টিকতে হলে সাধারণ সনদের চেয়ে পেশাগত দক্ষতা ও মানসিক পরিপক্বতা বেশি গুরুত্ব পায়। ইংরেজি ভাষার ওপর পূর্ণ দক্ষতা থাকতে হবে। প্রাতিষ্ঠানিক লিখিত ও মৌখিক ইংরেজিতে সাবলীল হওয়া আবশ্যক। রিপোর্ট রাইটিং এবং প্রেজেন্টেশনে পেশাদারিত্ব থাকতে হবে। কোনো দূতাবাস বা সংস্থায় আবেদনের ক্ষেত্রে সে দেশের ভাষা জানা থাকলে তা বিশেষভাবে বিবেচনা করা হয়। জাপানি, জার্মান বা মান্দারিন ভাষা জানা থাকলে প্রার্থী তালিকায় সরাসরি শীর্ষে থাকা যায়। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক সংস্থায় কাজ করতে হলে সাধারণত দেশি এনজিও, গবেষণা সংস্থায় দু-তিন বছরের কাজের অভিজ্ঞতা থাকলে চাকরি পেতে সুবিধা হয়।
ছকের বাইরের দক্ষতা
দূতাবাসের কাজের জন্য সাংস্কৃতিক সংবেদনশীলতা থাকা প্রয়োজন। বহুজাতিক দলের সঙ্গে কাজ করার মানসিকতা এবং ভিন্ন সংস্কৃতিকে সম্মান জানানোর মানসিকতা থাকা দরকার। আবার সমস্যা সমাধান ও ডেটা বিশ্লেষণ-সংশ্লিষ্ট দক্ষতা থাকতে হবে; ডেটাভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ, সংকট নিরসন এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা।
কাজের সুযোগ
দূতাবাসের পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের সরকারি আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থাগুলো বাংলাদেশে শত শত কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প পরিচালনা করে থাকে। এসব সংস্থায় স্থানীয় পেশাজীবীদের জন্য কাজের সুযোগ আছে। প্রোগ্রাম বা প্রজেক্ট ম্যানেজার হিসেবে অবকাঠামো, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিবেশ বা সুশাসনভিত্তিক প্রকল্প পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে ক্যারিয়ারের সুযোগ আছে। বিভিন্ন প্রোগ্রামে মনিটরিং অ্যান্ড ইভালুয়েশন বিভাগে প্রকল্পগুলোর মাঠ পর্যায়ের কাজ সঠিকভাবে চলছে কি না এবং অর্থের সঠিক ব্যবহার হচ্ছে কি না, তা মূল্যায়নের কাজ করতে পারেন।
নিয়োগ প্রক্রিয়া ও ইন্টারভিউ কৌশল
আন্তর্জাতিক সংস্থায় নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ মেধাভিত্তিক এবং অত্যন্ত স্বচ্ছ। এটি কয়েকটি ধাপে সম্পন্ন হয়। আবেদন ও সিভি স্ক্রিনিংয়ের সময় সাধারণ সিভির বদলে আন্তর্জাতিক ফরম্যাট অনুসরণ করতে হয়। সিভিতে অর্জনের ওপর জোর দিতে হয়। অনেক সময় লিখিত পরীক্ষা হয়। নির্ধারিত পদের ওপর প্রার্থীর বাস্তবিক জ্ঞান পরীক্ষা করা হয়। এতে পরিস্থিতিভিত্তিক প্রশ্ন, কেস স্টাডি বা নীতি বিশ্লেষণী রিপোর্ট লিখতে দেওয়া হয়। কোনো কোনো সময় বিদেশি ও দেশি প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে গঠিত প্যানেল ইন্টারভিউ নেয়। সেখানে শুধু প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞান নয়; প্রার্থীর আত্মবিশ্বাস, চাপের মুখে কাজ করার ক্ষমতা এবং পেশাদার আচরণ যাচাই করা হয়।
নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি
অনেক সময় এসব পদের নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি সাধারণ পত্রিকায় সহজে চোখে পড়ে না। সঠিক জায়গায় চোখ রাখাটা এখানে প্রথম ধাপ। প্রতিটি বিদেশি দূতাবাস ও উন্নয়ন সংস্থার ওয়েবসাইটে ক্যারিয়ার পেজ রয়েছে। আবার বিভিন্ন সংস্থার অফিসিয়াল লিংকডইন থেকে তথ্য পেতে পারেন। বিভিন্ন গ্লোবাল পোর্টালে নিয়মিত বাংলাদেশের সার্কুলার পাওয়া যায়। আবার জাতীয় দৈনিকে নিয়মিত সার্কুলার প্রকাশিত হয়।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা সমাধানের ইতিবাচক মানসিকতা
বিদেশি দূতাবাস
বা বৈশ্বিক সংস্থায় কাজ করতে হলে নিজেকে কেবল ভালো ফলাফলের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে
না। বিশ্বরাজনীতি, আন্তর্জাতিক অর্থনীতি এবং স্থানীয় উন্নয়নের সংযোগস্থলগুলো বুঝতে
হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সমস্যা সমাধানের ইতিবাচক মানসিকতা ও স্পষ্ট যোগাযোগ
দক্ষতা।
এই খাতের অন্যতম আকর্ষণ হলো পেশাদার কর্মপরিবেশ, প্রতিযোগিতামূলক বেতন ও নানা ধরনের সুযোগ-সুবিধা। অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আন্তর্জাতিক মানের বেতন-ভাতা পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।
দেশে অর্জিত অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে পরে জেনেভা, টোকিও, নিউ ইয়র্ক বা ওয়াশিংটন ডিসির মতো আন্তর্জাতিক কেন্দ্রগুলোতে কাজের সুযোগ তৈরি হতে পারে। জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থায় পরে কনসালট্যান্ট হিসেবেও ক্যারিয়ার গড়ে তোলা সম্ভব। তাই কঠিন পরিস্থিতিতেও পেশাদারিত্ব, দায়িত্বশীলতা ও মানিয়ে নেওয়ার সক্ষমতা ধরে রাখতে পারলে আন্তর্জাতিক কর্মক্ষেত্র হতে পারে আপনার ক্যারিয়ারের সম্ভাবনাময় একটি গন্তব্য।
লেখক : ডেপুটি প্রোগ্রাম ম্যানেজার, জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা)




