নাটকের রানী করবী

রিফাত করবী। ছবি: সাজ্জাদ হোসেন
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের থিয়েটার অ্যান্ড পারফরম্যান্স স্টাডিজ বিভাগের ছাত্রী রিফাত করবী অনার্স ও মাস্টার্সে বিভাগে প্রথম। অনার্সে কলা অনুষদের সব ছাত্রীর মধ্যে সবচেয়ে ভালো ফলাফল করায় জয় করেছেন বেগম মরিয়ম ইমদাদ ট্রাস্ট স্কলারশিপ। তাকে নিয়ে লিখেছেন হিমেল আহমেদ ও সিফাত শান্তা। ছবি তুলেছেন সাজ্জাদ হোসেন
শুয়ে শুয়ে বই পড়ছিলেন রিফাত করবী। এমন সময় বিভাগের সুপারভাইজারের ফোন, ‘আগামী তিন দিন পর তোমাকে ডিনস অব অনার অ্যাওয়ার্ড দেওয়া হবে।’ শুনে চমকে গেলেন। ভালোও লাগছিল। ঠিক করলেন, অনুষ্ঠানে মা-বাবাকে নিয়ে যাবেন। যোগাযোগও করেছিলেন তাদের সঙ্গে। কিন্তু তারা তো গাজীপুরে থাকেন। মেজো বোনের ছোট সন্তান আছে। তাকে আবার দেখে রাখতে হয়। ফলে তারা আর যেতে পারলেন না। খালাতো বোনকে নিয়ে নিজের শিক্ষাজীবনের অনন্য এই অর্জনটির স্বীকৃতি মঞ্চে হাজির হলেন করবী। এখনো এই স্মৃতি মনে পড়লে একটু খারাপ লাগে তার। এই মা-বাবা তাকে সবসময় উৎসাহ দিয়েছেন, যে কাজই করতে চেয়েছেন। মানসিকভাবে সাহস জুগিয়ে গিয়েছেন। তাদের সাহায্য ছাড়া কখনোই এত ভালো ফলাফল করতে পারতেন না তিনি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের থিয়েটার অ্যান্ড পারফরম্যান্স স্টাডিজ বিভাগের এই ছাত্রী অনার্সে পেয়েছেন ৩.৯২ আর মাস্টার্সে পেয়েছেন ৩.৯৭ সিজিপিএ। অনার্সে কলা অনুষদের সব ছাত্রীর মধ্যে সবচেয়ে ভালো ফলাফল করায় জয় করেছেন বেগম মরিয়ম ইমদাদ ট্রাস্ট স্কলারশিপ। ভালো গবেষণার সুবাদে লাভ করেছেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বৃত্তি। পেছন ফিরে তাকিয়ে করবীর মনে হয়, এত ভালো ফলাফলের পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ ছিল নিয়মিত পড়াশোনা, ক্লাসে উপস্থিত থাকা ও নিজের কাজের প্রতি শতভাগ আন্তরিকতা। তিনি কখনো পরীক্ষার জন্য শেষ মুহূর্তে প্রস্তুতি নেননি। শুরু থেকেই ধারাবাহিকভাবে পড়াশোনা করেছেন। তাদের বিষয়টি এমন যেখানে শুধু বই পড়লেই হয় না; বিশ্লেষণী চিন্তার পাশাপাশি প্রায়োগিক দক্ষতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। তাই ক্লাস, ল্যাব, রিহার্সাল ও গবেষণা— সবকিছুর মধ্যে সমন্বয় করে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন। নির্দিষ্ট সময় বেঁধে পড়া হতো না তার। ক্লাসের বাইরে প্রতিদিন পড়াগুলো নিয়মিত পড়ে রাখতেন। পরীক্ষার সময় অনেক সময় ধরে পড়তেন। বিশেষ করে তত্ত্বীয় পরীক্ষার আগের রাতগুলোতে প্রায়ই রাত জেগে পড়তেন এবং পরীক্ষা শেষ করে বাসায় ফিরে ঘুমাতেন।
বিখ্যাত লেখক আহমদ ছফার ‘মরণ বিলাস’ উপন্যাসটি পড়ে সেটিকে নাট্যরূপ দিয়েছিলেন করবী। শোয়ের দিন সকালে একজন অভিনেতা এলেন না। মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল করবীর
এই পরীক্ষা নিয়েই অন্য রকমের একটি স্মৃতি জমা আছে তার। চতুর্থ বর্ষে নাটক নির্দেশনা দিতে হয় তাদের। বিখ্যাত লেখক আহমদ ছফার ‘মরণ বিলাস’ উপন্যাসটি পড়ে সেটিকে নাট্যরূপ দিয়েছিলেন করবী। এখন মঞ্চে নামানোর পালা। সেট, লাইট নিয়ে মেতে উঠতে হলো। শোয়ের আগের দিন পর্যন্ত কাজের জন্য রিহার্সাল দিতে পারলেন না। শোয়ের দিন সকালে একজন অভিনেতা এলেন না। মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল করবীর। বিভাগের অধ্যাপক আশিকুর রহমান লিয়ন তখন এগিয়ে এলেন। তিনি কিছুটা বদলে দিলেন নাটকটি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে বার্ষিক নাট্য উৎসবে মঞ্চায়ন হলো। প্রধান দুটি চরিত্র এত ভালো অভিনয় করল যে দর্শক নাটক শেষে তাদের অটোগ্রাফ নিতে লাগলেন। খুশিতে ঝলমল করে উঠলেন রিফাত করবী। এই পরীক্ষার জন্য অন্যসব পরীক্ষার মতো নিজের সবটুকু দিয়ে চেষ্টা করেছেন তিনি। আলাপে বললেন, ‘এ তো ব্যবহারিক পরীক্ষা ছিল। তত্ত্বীয় পরীক্ষার জন্য আমি পুরো সেমিস্টার নিয়মিত পড়েছি। পরীক্ষার আগে মূল বিষয়গুলো রিভিশন দিয়েছি। গুরুত্বপূর্ণ নোটগুলো পড়েছি। বিষয়গুলো বিশ্লেষণ করে বোঝার চেষ্টা করেছি এবং পরীক্ষার হলে আত্মবিশ্বাস নিয়ে লিখেছি বরাবর। খাতায় সবসময় উত্তর দিয়েছি বিশ্লেষণ আকারে। শুধু তথ্য উপস্থাপন নয়; যুক্তি, উদাহরণ, গবেষণালব্ধ তথ্য যুক্ত করার চেষ্টা করেছি। উত্তরগুলো পরিপাটি ও ধারাবাহিকভাবে দিয়েছি।’ তিনি শিক্ষকদের এমন সহযোগিতা বরাবরই পেয়েছেন। তার বিভাগের প্রত্যেক শিক্ষক অত্যন্ত আন্তরিক ছিলেন। পড়া, গবেষণা, প্রযোজনা— যেকোনো অ্যাকাডেমিক সমস্যায় তারা সবসময় সাহায্য করেছেন। এমন দিকনির্দেশনা তার সাফল্যের অন্যতম ভিত্তি ছিল।
ছোটবেলায় যে মেয়েটি খুব বেশি পড়ালেখামুখী ছিল না, সে কীভাবে বদলে গেল বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে? এই প্রশ্নের জবাব লুকিয়ে আছে অ্যাকাডেমিক পরিবেশ ও বিষয়ের প্রতি ভালোবাসার ভেতরে। সেগুলো তার এতই ভালো লেগেছে যে প্রতিটি ক্লাসে শিক্ষকদের গুরুত্বপূর্ণ আলোচনাগুলো নোট করেছেন। পরে রেফারেন্স বই, ইন্টারনেট থেকে তথ্য সংগ্রহ করে নোট তৈরি করতেন।
থিয়েটার অ্যান্ড পারফরম্যান্স স্টাডিজ বিভাগে ব্যবহারিক কাজ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অভিনয়, গান, নাচ, নির্দেশনা, সেট তৈরি, লাইটিং, মেকআপ, কস্টিউম ডিজাইন করতে হয় বাধ্যতামূলকভাবে। এই প্রতিটি কাজ পূর্ণ মনোযোগ ও আন্তরিকতা নিয়ে করে গিয়েছেন তিনি। প্রতিটি পারফরম্যান্সের জন্য দীর্ঘ সময় ধরে অনুশীলন করেছেন তিনি। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত নাটক উপস্থাপনের জন্য বিভাগে কাজ করেছেন। অনেক সময় সপ্তাহের সাত দিনই থিয়েটার ল্যাবরেটরিতে (নাটমণ্ডল) কাজ করেছেন। মাস্টার্সে ‘পাখিদের বিধানসভা’ নাটকের জন্য টানা ছয় থেকে সাত মাস সকাল ৮টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত কাজ করেছেন। দেরিতে যাওয়ার অনুমতিপত্র ছিল তাদের সঙ্গে। এই নাটকের জন্য তারা গিয়েছিলেন উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখানে প্রকৃতির সান্নিধ্যে নাটকটির মহড়া দিয়েছেন। এই কথা মনে হলে আজও ভালো লাগে তার।
অন্য আর ১০ জনের মতো দুর্বল তিনিও ছিলেন। কিছু প্রায়োগিক বিষয় খুব ভালো পারতেন না। নিয়মিত অনুশীলন ও শিক্ষকদের পরামর্শে সেগুলো কাটিয়ে উঠেছেন। বলেছেন, ‘আমার মনে হয়, ধারাবাহিকভাবে চর্চার কোনো বিকল্প নেই।’
থিয়েটার অ্যান্ড পারফরম্যান্স স্টাডিজ বিভাগে পড়েও কীভাবে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বৃত্তি পেলেন— এই প্রশ্নের জবাবে করবী বললেন, “আমি মনে করি, থিয়েটার শুধু বিনোদনের মাধ্যম নয়; এটি রাষ্ট্র, সমাজ, কৃষি, চিকিৎসা প্রতিটি ক্ষেত্রের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। আমার মাস্টার্সে গবেষণার বিষয় ছিল ‘চরিত্রের বিষয়ে অভিনেতার মনস্তাত্ত্বিক কাঠামোগত পরিবর্তন প্রক্রিয়া অনুসন্ধান’। এই গবেষণা চিকিৎসাবিজ্ঞান-সংশ্লিষ্ট গবেষণাক্ষেত্রেও গুরুত্ব পাওয়ায় আমি গবেষণা বৃত্তি লাভ করি।” ভবিষ্যতে তিনি থিয়েটার, অভিনয়, অভিনেতার মনস্তত্ত্ব নিয়ে আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা করতে চান। নাট্যকর্মী হিসেবে শিক্ষা, সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থার সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকতে চান।





