চায়ের চুমুকে চার দশক

চা বানানোয় মগ্ন স্বপন মামা। ছবি: সাজ্জাদ হোসেন
চার দশকের বেশি সময় ধরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অসংখ্য শিক্ষার্থীর পাশে আছেন স্বপন মামা। তার সঙ্গে আড্ডা দিয়ে লিখেছেন সৈয়দ ফরহাদ
দুপুর বা বিকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে ক্লাস শেষ করে কেউ ঘাসের ওপর বসে থাকেন, কেউবা গেটের সামনে রাজনৈতিক কর্মসূচি নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। টিএসসির দেয়ালে কারও গিটারে সুর ওঠে। এই চেনা দৃশ্যগুলোর মাঝেই ফুটপাতের এক কোণে ধোঁয়া ওঠে অ্যালুমিনিয়ামের কেটলি থেকে। সেখানে চায়ের কাপ হাতে কয়েকজন শিক্ষার্থী গল্প করেন। তাদের একজন পকেটে হাত ঢুকিয়ে অপ্রস্তুত মুখে বলে বসেন হঠাৎ, ‘মামা, টাকাটা পরে দিই।’ লোকটি স্মিত হেসে সায় দেন। তিনি একজন চায়ের দোকানি। কিন্তু যারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছেন, তাদের অনেকের কাছে তিনি আড্ডার সঙ্গী, কারও কাছে বিপদের আশ্রয়, আবার কারও কাছে ছাত্রজীবনের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্যদের একজন। পকেটে টাকা নেই? দুপুরে লাঞ্চ করা হচ্ছে না? টিএসসির স্বপন মামা আছেন। অন্তত এক কাপ চা আর একটি কেকের ব্যবস্থা হয়ে যাবে।
আজ থেকে চার দশকের বেশি আগে, ১৯৮৪ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার বাসুদেব গ্রাম থেকে ঢাকায় এসেছিলেন স্বপন মামা। তাকে ঢাকায় নিয়ে এসেছিলেন ভগ্নিপতি। তিনি ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মচারী। গ্রামের বেকার যুবক স্বপনকে একদিন বলেছিলেন, ‘ঢাকা ভার্সিটি আসো, কিছু একটা করে খাওয়া যাবে।’ সেই থেকে শুরু। তার শুরুটি ছিল খুব সাধারণ। টিএসসির একটি বাদামগাছের নিচে বসে ভাজাপোড়া বিক্রি করতেন। আলুর চপ, বেগুনি, পেঁয়াজু, ছোলা ছিল। সন্ধ্যা নামলেই বিক্রি শুরু হতো। কিন্তু তাতে সংসার চলছিল না। তাই এক বছর পর যোগ করলেন চা। চায়ের কাপের সঙ্গে তার দোকানে বাড়তে থাকে মানুষের সংখ্যা। নিয়মিত হতে থাকে আড্ডা। এরপর একসময় দোকানটি আর শুধু দোকান থাকে না; হয়ে ওঠে টিএসসির অনানুষ্ঠানিক মিলনকেন্দ্র।
দোকানি হিসেবে স্বপন মামার সবচেয়ে বড় পুঁজি ছাত্রছাত্রীদের ওপর আস্থা। কোনোদিন একজন শিক্ষার্থী দুপুরে এসে বলেছেন, ‘মামা, আজ টাকা নেই।’ তিনি নির্দ্বিধায় চায়ের কাপটি এগিয়ে দিয়েছেন। টাকা বাকি রেখেছেন। তিনি কখনো হিসাবের খাতাকে সম্পর্কের চেয়ে বড় হতে দেননি। তার ভাষায়, ‘আজ না পারলে কাল দেবে, না হয় পরশু। দু-এক কাপ চায়ের হিসাব নিয়ে আন্তরিকতা নষ্ট করে লাভ কী?’ এভাবে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আত্মার বন্ধনে বাঁধা পড়েছেন স্বপন মামা। চা বানাতে বানাতে তিনি দেখেছেন নতুন প্রজন্মের আগমন, পুরনোর বিদায়, প্রেম, বিচ্ছেদ, আন্দোলন।
স্বপন মামার দোকানে জমে তর্ক। লেখা হয় পোস্টারের খসড়া। নির্বাচন নিয়ে উত্তপ্ত আলোচনা যেমন হয়, তেমনি পরীক্ষার আগের রাতে নোট ভাগাভাগিও। আবার অনেক প্রেমের শুরুও হয় এই দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে। আশির দশকে দোকান শুরু করার পরই তিনি দেখেছেন এরশাদবিরোধী আন্দোলনের উত্তাল দিনগুলো। ক্যাম্পাস তখন প্রায় প্রতিদিনই মিছিল, স্লোগান আর পুলিশের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ায় উত্তপ্ত। রাতভর ছাত্র সংগঠনের কাউন্সিল হয়েছে, তার দোকানের চুলা জ্বলেছে ভোর পর্যন্ত; বিশেষ করে বামপন্থী ছাত্র সংগঠনগুলোর নেতাকর্মীরা তার দোকানকেই নিজেদের আরেকটি ঠিকানা বানিয়ে ফেলেছিলেন। স্বপন মামাও তাদের আপন মানুষ হয়ে উঠেছিলেন। ১৯৯০ সালে ডা. শামসুল আলম খান মিলন হত্যার ঘটনায় হঠাৎ তিনি মামলার সাক্ষী হয়ে যান। কীভাবে তার নাম সাক্ষীর তালিকায় এলো, আজও জানেন না। এরপর কয়েক মাস আদালত, তদন্ত সংস্থা আর পুলিশের কাছে বারবার যেতে হয়েছে। কখনোই তিনি সত্যের বাইরে একটি কথাও বলেননি। সেই অভিজ্ঞতা সম্পর্কে বললেন, ‘মামলার আসামি হওয়া আর সাক্ষী হওয়া একই জিনিস, মামা!’
টিএসসিতে তার দোকান চালানোর অনুমতি নিয়ে নানা সময় জটিলতা তৈরি হয়েছে। প্রশাসনের সিদ্ধান্তে একাধিকবার দোকান বন্ধ হয়েছে। কিন্তু প্রতিবারই স্বপন মামা দেখেছেন, তার জন্য কথা বলেছেন শিক্ষার্থীরাই। ফলে তিনি বিশ্বাস করেন, যতটা না নিজের চেষ্টায়, তার চেয়ে অনেক বেশি টিকে আছেন শিক্ষার্থীদের ভালোবাসায়।
২০১৬ সালে টিএসসিতে স্বপন মামার ৩২ বছরের পথচলা উপলক্ষে বিভিন্ন ছাত্র সংগঠন, বর্তমান ও সাবেক শিক্ষার্থীরা মিলে আয়োজন করেছিলেন ব্যতিক্রমী অনুষ্ঠান
বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে শিক্ষার্থীদের কেউ পঞ্চাশ, কেউ একশ বাকি করেছেন তার দোকানে। তাদের ছোট ছোট অঙ্ক জমে অনেক সময় বড় হয়েছে। কিন্তু তিনি তাদের তাড়া দিয়েছেন, এমন শোনা যায় না। নব্বইয়ের দশকের একটি ব্যাচের পুনর্মিলনী উপলক্ষে সাবেক শিক্ষার্থীরা টিএসসিতে ফিরে এসেছিলেন। আড্ডার একপর্যায়ে কথা ওঠে ছাত্রজীবনে স্বপন মামার দোকানে বাকি খাওয়া নিয়ে। কে কত বাকি রেখেছিলেন, তা আর কারও মনে নেই। সেদিন তারা নিজেদের মধ্যে চাঁদা তুলে প্রায় ১০ হাজার টাকা তার হাতে তুলে দেন।
৪০ বছরের বেশি সময় ধরে হাজারো শিক্ষার্থীর হাতে চায়ের কাপ তুলে দিয়েছেন স্বপন মামা। কিন্তু নিজের জীবনের হিসাব করতে বসলে তার কণ্ঠে এক ধরনের সরল আক্ষেপই ঝরে পড়ে, ‘আমার জীবনে কোনো সঞ্চয় নাই।’ চায়ের দোকান চালিয়ে তার যা আয় হয়েছে, তা দিয়ে
সংসার চলেছে। সন্তানদের পড়াশোনা করিয়েছেন। বড় মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন। আরেক মেয়ে ইডেন কলেজ থেকে স্নাতকোত্তর শেষ করেছেন। ছেলে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার হয়ে এখন সৌদি আরবে কাজ করছেন। ছোট মেয়েও উচ্চশিক্ষা নিচ্ছে। কথা বলতে বলতে তার মুখে বাবার তৃপ্তি ফুটে ওঠে। কয়েক বছর আগে তার স্ত্রীর স্ট্রোক হয়েছিল। নিয়মিত থেরাপি প্রয়োজন পড়েছিল। চিকিৎসকরা সিআরপিতে নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন। কিন্তু সেই ব্যয় বহন করার সামর্থ্য তার হয়নি। তারপরও তাদের জীবন চলেছে।
২০১৬ সালে টিএসসিতে স্বপন মামার ৩২ বছরের পথচলা উপলক্ষে বিভিন্ন ছাত্র সংগঠন, বর্তমান ও সাবেক শিক্ষার্থীরা মিলে আয়োজন করেছিলেন ব্যতিক্রমী অনুষ্ঠান। বিশাল কেক, ফুল, গান, শুভেচ্ছা— সবকিছুরই আয়োজন করা হয়েছিল সংগোপনে। তিনি আগে থেকে কিছুই জানতেন না। হঠাৎ তাকে নতুন পাঞ্জাবি পরিয়ে দেওয়া হলো। কেক কাটা হলো। শিক্ষার্থীরা গান গাইলেন। সেদিনের কথা বলতে গিয়ে তার মুখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে, ‘এইটা আমার জীবনের একটা বিশেষ ঘটনা। সেইদিন খুব ভালো লাগছে। খুব খুশি হইছিলাম।’
স্বপন মামার কিন্তু ঢাকায় আলাদা কোনো বাসা নেই। দিন শেষে দোকান গুটিয়ে তিনি টিএসসির ভেতরেই একটি কক্ষে ঘুমান। এই ক্যাম্পাসের মানুষজনই তার আত্মীয়স্বজন। ৭০ ছুঁইছুঁই বয়সে এসে তার চাওয়া খুব
বেশি নয়। শুধু চান, সন্তানরা যেন ভালো থাকে। যতদিন বেঁচে থাকবেন, ছাত্রদের মাঝেই থাকতে চান।



