পড়ার বিষয় প্রত্নতত্ত্ব
হারানো ইতিহাসের খোঁজে

মুন্সীগঞ্জের ইদ্রাকপুর দূের্গ ফিল্ড ট্যুরে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের শিক্ষার্থীরা। ছবি: শিক্ষার্থীদের সৌজন্যে
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন কলাভবনের তৃতীয় তলায় প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ। এর গবেষণাগারের টেবিলে থাকে মৃৎপাত্রের ভাঙা টুকরো, কাচের বাক্সে সংরক্ষিত পুরনো মুদ্রা, কম্পিউটারের স্ক্রিনে ভেসে ওঠে প্রাচীন স্থাপনার নকশা। এখানে কয়েকশ বা হাজার বছর আগের মানুষের জীবন নতুন করে কথা বলতে শুরু করে।
১৯৯২ সালের জুনে বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেটে এই প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ অনুমোদন লাভ করে। সে বছরের ২ নভেম্বর ২০ শিক্ষার্থী ও চারজন শিক্ষক নিয়ে প্রথম ব্যাচের ক্লাস শুরু হয়। এখন বিভাগে ২১ জন শিক্ষক রয়েছেন। প্রতিবছর ৩৫টি আসনে শিক্ষার্থী ভর্তি নেওয়া হয়। আরও দুটি বিশ্ববিদ্যালয়— ২০০৮ সালে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাস ও প্রত্নতত্ত্ব এবং ২০১৩-১৪ শিক্ষাবর্ষে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ চালু হয়েছে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভাগটিতে স্নাতক, স্নাতকোত্তর, এমফিল, পিএইচডি পর্যায়ে পড়াশোনা ও গবেষণার সুযোগ রয়েছে। জাদুঘর ও ল্যাব সুবিধা আছে। প্রথম বর্ষ থেকেই শিক্ষার্থীদের ফিল্ড আর্কিওলজির বিভিন্ন পদ্ধতির সঙ্গে পরিচয় করানো হয়। জরিপ, মানচিত্র প্রণয়ন, প্রত্নস্থল অনুসন্ধান ও উৎখননের পাশাপাশি জিআইএস, রিমোট সেন্সিং, ডিজিটাল ম্যাপিং এবং ত্রিমাত্রিক মডেলিংয়ের মতো আধুনিক প্রযুক্তিও পাঠ্যক্রমে জায়গা পেয়েছে। সঙ্গে রয়েছে প্রাগৈতিহাসিক যুগ, প্রাচীন দক্ষিণ এশিয়া, নৃবিজ্ঞান, লিপিবিদ্যা, মুদ্রাতত্ত্ব, প্রাচীন শিল্প ও স্থাপত্য, জাদুঘরবিদ্যা, প্রত্নউদ্ভিদবিদ্যা, পরিবেশগত প্রত্নতত্ত্ব, সংরক্ষণ ও ঐতিহ্য ব্যবস্থাপনার মতো বিষয়। প্রতিটি শিক্ষাবর্ষেই শিক্ষার্থীদের জন্য রয়েছে ফিল্ডওয়ার্ক কোর্স। কোর্সের অধীনে শিক্ষার্থীরা শিক্ষকদের কাছে হাতে-কলমে প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা ও উৎখননের শিক্ষা পান। এ পর্যন্ত ফিল্ডওয়ার্কের জন্য কুমিল্লার ময়নামতি, মুন্সীগঞ্জের বিক্রমপুর বৌদ্ধবিহার ও ইদ্রাকপুর দুর্গ, সাতক্ষীরার শালিখা ও তালা, নওগাঁর সোমপুর বিহার ও কুসুম্বা মসজিদ, নরসিংদীর উয়ারী-বটেশ্বর, বগুড়ার মহাস্থানগড়সহ বিভিন্ন ঐতিহাসিক স্থানে গিয়েছেন শিক্ষার্থীরা।
সাতক্ষীরার তালায় উৎখনন করে মাটির ঢিবি, দেড় হাজার বছরের পুরনো বৌদ্ধমন্দিরের প্রাচীন স্থাপত্যশৈলী ও ইটের কাঠামো উন্মোচিত হয়েছে
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণার ইতিহাসে উয়ারী-বটেশ্বরের নাম উল্লেখযোগ্য। নরসিংদীর বেলাব ও শিবপুর অঞ্চলের এই প্রত্নস্থান প্রায় আড়াই হাজার বছর আগের নগরায়ণ, বাণিজ্য ও কারুশিল্পের গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য বহন করে। ছাত্রছাত্রী ও শিক্ষকের গবেষণায় পাওয়া ছাপাঙ্কিত মুদ্রা, পুঁতি, মৃৎপাত্র, সড়ক ও প্রতিরক্ষা কাঠামোর মতো নিদর্শন এ অঞ্চলে প্রাচীন নগরজীবনের কাঠামোকে শক্তিশালী করেছে। এই গবেষণার সঙ্গে অধ্যাপক সুফি মোস্তাফিজুর রহমান জড়িত আছেন। নব্বইয়ের দশক থেকেই তার গবেষকরা এ অঞ্চলের অনুসন্ধানের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ১৯৯৬ সালে এর প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ এবং তার নেতৃত্বে পরিচালিত ২০০০ সালের পদ্ধতিগত উৎখনন ও গবেষণা বাংলাদেশের প্রাচীন নগর ও বাণিজ্য ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। উয়ারী-বটেশ্বরের কাচ ও অর্ধমূল্যবান পাথরের পুঁতি, ছাপাঙ্কিত মুদ্রা এবং পরীক্ষামূলক উৎখনন নিয়ে তার একাধিক গবেষণাও প্রকাশিত হয়েছে। এ ছাড়া সাতক্ষীরার তালায় উৎখনন করে মাটির ঢিবি, দেড় হাজার বছরের পুরনো বৌদ্ধমন্দিরের প্রাচীন স্থাপত্যশৈলী ও ইটের কাঠামো উন্মোচিত হয়েছে। মহাস্থানগড়, ময়নামতি, বিক্রমপুরসহ বিভিন্ন প্রত্নস্থলে জরিপ, অনুসন্ধান ও গবেষণার মাধ্যমে প্রাচীন বসতি, পরিবেশ, কৃষি, স্থাপত্য, শিল্প ও মানুষের জীবনযাত্রা সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে।
প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের আরেক পথিকৃৎ গবেষক অধ্যাপক ড. মো. মিজানুর রহমান বাংলাদেশের প্রথম প্রত্নউদ্ভিদবিজ্ঞানী হিসেবে প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণায় নতুন দিগন্তের সূচনা করেছেন। তার বিজ্ঞানভিত্তিক গবেষণার মাধ্যমে মহাস্থানগড় ও উয়ারী-বটেশ্বরসহ প্রাচীন প্রত্নস্থলগুলো থেকে প্রায় ২৫০০ বছরের পুরনো ধানের প্রজাতিসহ প্রায় ১৪৮ ধরনের শস্যবীজ আবিষ্কৃত ও শনাক্ত হয়েছে। অধ্যাপক এ কে এম শাহনাওয়াজ ইতিহাস, শিল্প, সংস্কৃতি ও প্রত্নতত্ত্ব নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা ও লেখালেখি করছেন।
সাফল্যের পাশাপাশি বিভাগে রয়েছে বেশ কিছু সংকট। বাজেটের সীমাবদ্ধতা, প্রয়োজনীয় লোকবলের ঘাটতি এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক পদ শূন্য থাকায় অ্যাকাডেমিক ও গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনায় সমস্যা হচ্ছে। প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার জন্য গুরুত্বপূর্ণ কম্পিউটার ল্যাবও প্রয়োজনের তুলনায় সীমিত। পুরনো ১২টি কম্পিউটার দিয়ে একটি ব্যাচের ৩৫ থেকে ৪৫ জন শিক্ষার্থীর ল্যাব ক্লাস পরিচালনা করতে হচ্ছে। এতে হাতে-কলমে প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ছে। এ প্রসঙ্গে বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক মালিহা নার্গিস আহমেদ বললেন, ‘এসব সংকট নিরসনে বারবার বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সহায়তা চাওয়া হলেও কোনো সমাধান হয়নি। প্রয়োজনীয় লোকবল নিয়োগ, গবেষণার বাজেট বৃদ্ধি, আধুনিক ল্যাব স্থাপন এবং প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ গবেষণা ও শিক্ষার পরিসর আরও বাড়াতে পারবে।’
বিভাগের শিক্ষার্থীদের প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর, জাদুঘর, বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, ঐতিহ্য সংরক্ষণ প্রকল্প, সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান এবং দেশ-বিদেশের বিভিন্ন গবেষণা উদ্যোগে কাজের সুযোগ রয়েছে। তাদের বিষয়ভিত্তিক নিয়োগের সুযোগ এখনো পর্যাপ্ত নয়, দেশে এই খাতে বিশেষায়িত কোনো কর্মক্ষেত্র না থাকায় সম্প্রতি বিভাগটির শিক্ষার্থীরা বিদেশমুখী হওয়া শুরু করেছেন। এরই মধ্যে বিভাগের দুজন সাবেক শিক্ষার্থী বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেছেন।
বাংলাদেশের প্রত্নস্থল যত বাড়ছে, সেগুলো সংরক্ষণের প্রয়োজনও তত বাড়ছে। প্রয়োজন হচ্ছে প্রশিক্ষিত প্রত্নতাত্ত্বিক, সংরক্ষণবিদ, জাদুঘর বিশেষজ্ঞ, ঐতিহ্য ব্যবস্থাপক ও গবেষকের। তাই উচ্চশিক্ষায় প্রত্নস্থানের বিস্তারের পাশাপাশি এই দক্ষ জনশক্তিকে কাজে লাগানোর মতো কর্মক্ষেত্রও তৈরি করা জরুরি।



