পড়াশোনার ফাঁকে পুষ্টির জোগান

ক্যাম্পাসে নিজের তৈরি মিনি হানি নাটস মিক্স বিক্রি করছেন লোকমান হোসেন। ছবি: সাজ্জাদ হোসেন
লোকমান হোসেন বুটেক্সের ছাত্র। স্বাস্থ্যকর খাবারকে সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে নিয়ে আসার স্বপ্নে বিক্রি করেন নিজের তৈরি প্যাকেটজাত খাবার ‘নিউট্রা’। তাকে নিয়ে লিখেছেন তারেক রহমান
দুপুর গড়িয়ে বিকাল হয়। তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস শেষ করে হাতে একটু সময় পান লোকমান হোসেন। ব্যাগ হাতে বেরিয়ে পড়েন। ব্যাগে থাকে ছোট ছোট প্যাকেটে ভরা নিজের হাতে তৈরি খাবার। কখনো ক্লাসের ফাঁকে, কখনো ক্লাস শেষে রাজধানী ঢাকার ব্যস্ত রাস্তায়, আবার কখনো সন্ধ্যায় মিরপুর মেট্রোর আশপাশে পণ্যটি নিয়ে মানুষের কাছে দাঁড়ান। অপরিচিত কাউকে এগিয়ে গিয়ে বলেন পণ্যের কথা। কেউ অবাক হয়ে জানতে চান, ‘ভাই, এটি আপনার নিজের বানানো?’ পণ্যটি খেয়ে কেউ বলেন, ‘স্বাদ ভালো।’ কেউবা প্যাকেটের সঙ্গে একটি ছোট চামচ রাখার পরামর্শ দেন। কথাগুলো মন দিয়ে শোনেন তিনি। কারণ, তার কাছে প্রত্যেক ক্রেতা তার উদ্যোগের শিক্ষকও। লোকমান বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুটেক্স) এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। মিরপুর-১০ এলাকায় থাকেন। পড়াশোনার পাশাপাশি স্বাস্থ্যকর খাবারকে সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে নিয়ে আসার স্বপ্নে নিজের উদ্যোগে বিক্রি করছেন— ‘নিউট্রা’।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে নিজের পণ্য বিক্রি করা শুরুতে সহজ ছিল না। অনেকেই অবাক হয়ে তাকাতেন। কিন্তু পণ্য খেয়ে দেখার পর বদলাতে থাকে মানুষের প্রতিক্রিয়া
শিক্ষার্থীদের ক্ষুধা লাগলে হাতের কাছে যা পাওয়া যায়, সেটিই খেয়ে নেওয়ার প্রবণতা বেড়েছে। কম দাম ও সহজলভ্যতার কারণে বিভিন্ন ধরনের অস্বাস্থ্যকর স্ন্যাকসের জনপ্রিয়তাও বেশি। তুলনামূলক স্বাস্থ্যকর খাবারের দাম অনেক সময় তাদের নাগালের বাইরে চলে যায়। বিষয়টি ভাবিয়েছে লোকমানকে। তিনি বললেন, ‘আমি চাই স্বাস্থ্যকর খাবারগুলো ছাত্রছাত্রী ও সাধারণ মানুষের জন্য সহজলভ্য হোক। স্বাস্থ্যকর খাবার মানেই যে খুব দামি হতে হবে— এমন নয়।’ এখান থেকেই ‘নিউট্রা’র যাত্রা। শুরুতে বড় কোনো পরিকল্পনা নিয়ে বাজারে নামেননি তিনি। ছোট একটি পণ্য দিয়ে মানুষের প্রতিক্রিয়া বোঝার চেষ্টা করেছিলেন। সেই পণ্যই এখন নিউট্রার মূল পরিচয়— ‘মিনি হানি নাটস মিক্স’। কাজুবাদাম, কাঠবাদাম, চিনাবাদাম, আখরোট, কিশমিশ, খেজুর, সাদা তিল ও মধুর সমন্বয়ে তৈরি স্ন্যাকস। ছোট প্যাকেটের দাম ২৫ টাকা। লোকমান বললেন, ‘আমি চেয়েছি এমন একটি স্বাস্থ্যকর স্ন্যাকস বানাতে, যেটি একজন শিক্ষার্থী নিজের পকেটের টাকা দিয়ে কিনতে পারে।’ ‘নিউট্রা’ নামটিও এসেছে নিউট্রিশন বা পুষ্টির ধারণা থেকে। স্বাস্থ্যকর খাবারের সঙ্গে নামটির একটি সম্পর্ক রাখতে চেয়েছেন তিনি।
যেখানে ক্রেতা, সেখানেই লোকমান
অনেক উদ্যোক্তা পণ্য তৈরি করে অনলাইনে প্রচার চালান। লোকমান সেই পথে না গিয়ে নিজেই পণ্য নিয়ে বেরিয়ে পড়েছেন মানুষের কাছে। ক্লাসের পরে কিংবা ক্লাসের ফাঁকে যখনই একটু সময় পান, তখনই বের হন। শুরুতে কোনো নির্দিষ্ট বিক্রির জায়গা ছিল না তার। যেখানে মানুষের চলাচল বেশি, বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের পাওয়া যায়, সেসব জায়গাতেই গিয়েছেন। মিরপুর মেট্রোর আশপাশে সরাসরি ক্রেতাদের কাছে যাওয়ার অভিজ্ঞতা তার উদ্যোক্তা জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। লোকমান বললেন, ‘আমার কাছে ব্যাপারটি ছিল যেখানে কাস্টমার আছে, সেখানেই আমি যাব।’ তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে নিজের পণ্য বিক্রি করা শুরুতে সহজ ছিল না। অনেকেই অবাক হয়ে তাকাতেন। কিন্তু পণ্য খেয়ে দেখার পর বদলাতে থাকে মানুষের প্রতিক্রিয়া। তাদের মতামতের ভিত্তিতে ধীরে ধীরে প্যাকেজিং ও প্রেজেন্টেশনে পরিবর্তন এনেছেন তিনি। তার কাছে রাস্তায় দাঁড়িয়ে পণ্য বিক্রি শুধু বিক্রি নয়; এটি একধরনের সরাসরি বাজার গবেষণা।
১০ হাজার টাকায় শুরু
‘নিউট্রা’র শুরুটি হয়েছিল মাত্র ১০ হাজার টাকা দিয়ে। এই টাকা তিনি টিউশনের আয় থেকে জমিয়েছেন। অল্প পরিসরে কাজ শুরু করেছিলেন। প্রথম দিকে প্রায় ১০০ প্যাকেট তৈরি করতেন এবং প্রতিদিন বিক্রি হতো ১৮টি প্যাকেট। ধীরে ধীরে ‘নিউট্রা’ নিয়ে মানুষের আগ্রহ বাড়তে থাকে। এখন সপ্তাহে প্রায় পাঁচ হাজার প্যাকেট পর্যন্ত উৎপাদন করছেন তিনি। প্রতিদিন বিক্রি হচ্ছে প্রায় ৪০০ প্যাকেট। নিউট্রায় এখন তার বিনিয়োগ প্রায় দেড় লাখ টাকা। শুরু থেকে তার প্রধান চিন্তা মুনাফাকেন্দ্রিক ছিল না। তিনি বললেন, ‘শুরুতে খুব বেশি লাভ ছিল না। তখনো আমার কাছে লাভের চেয়ে কাস্টমার কী বলছে, মানুষ প্রোডাক্ট কিনছে কি না— এটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল।’
ক্লাসের ফাঁকে কর্মদিবস
ক্লাস, ল্যাব, অ্যাসাইনমেন্ট ও পরীক্ষার চাপের মধ্যেই সময় বের করতে হয় পণ্য তৈরির জন্য। সাধারণত দুপুর ২টার পর নিউট্রার কাজ শুরু করেন লোকমান। বাদাম, কিশমিশ, খেজুর, মধুসহ প্রয়োজনীয় কাঁচামাল সরবরাহকারী ও বাজার থেকে সংগ্রহ করেন। পণ্য তৈরির পুরো প্রক্রিয়াটিও নিজে দেখাশোনা করেন। প্রথমে উপকরণগুলো নির্দিষ্ট পরিমাণে মেপে নেন। এরপর রেসিপি অনুযায়ী মিশ্রণ তৈরি করেন। পরে নির্দিষ্ট পরিমাণ করে প্যাকেটে দিয়ে সিল করেন এবং ব্র্যান্ডিং স্টিকার লাগান। শুরুতে প্যাকেজিং নিয়ে তেমন ধারণা ছিল না তার। পরে ক্রেতাদের মতামত ও নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বুঝেছেন, শুধু ভালো পণ্য হলেই যথেষ্ট নয়; পণ্যটি দেখতেও আকর্ষণীয় হতে হয়। এভাবে এই পথচলায় ব্যবসা সম্পর্কে কিছু বাস্তব শিক্ষাও পেয়েছেন তিনি। লোকমান বললেন, ‘সবচেয়ে বড় যে জিনিসটা শিখেছি, সেটি হলো আইডিয়া থাকা আর বিজনেস করা এক জিনিস না।’ শুরুতে তিনি মনে করতেন, পণ্য ভালো হলেই মানুষ কিনবে। পরে বুঝেছেন, পণ্যের পাশাপাশি প্যাকেজিং, দাম, উপস্থাপন— সবকিছুই গুরুত্বপূর্ণ। কখনো প্রয়োজনের চেয়ে বেশি পণ্য তৈরি করেছেন, আবার প্যাকেজিং নিয়েও ভুল হয়েছে। এখন কোনো কিছু বড় পরিসরে করার আগে ছোট পরিসরে পরীক্ষা করেন। তার ভাষায়, ‘ব্যবসা করতে গেলে ভুল হবেই; গুরুত্বপূর্ণ হলো ভুলটি বুঝে আবার একই ভুল না করা।’
বুটেক্স থেকে বাইরের বাজারে
লোকমান নিউট্রা নিয়ে ওয়াফিলাইফ ও সুপার দুর্গ বিডির সঙ্গে কাজ করেছেন। বিভিন্ন ব্র্যান্ড ও প্রতিষ্ঠান থেকেও সহযোগিতার প্রস্তাব পেয়েছেন। কেউ যৌথভাবে কাজ করার, কেউ বিপণন, আবার কেউ পণ্য বিতরণ নিয়ে আগ্রহ দেখিয়েছেন। তবে সব প্রস্তাব গ্রহণ করেননি। তিনি বললেন, ‘আমার কাছে নিউট্রা শুধু একটি প্রোডাক্ট নয়। এটিকে আমি নিজের একটি ব্র্যান্ড হিসেবে গড়ে তুলতে চাই।’ এখন তার লক্ষ্য— নিউট্রাকে খুচরা দোকান ও সুপারশপের তাক পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া। একদিন মীনাবাজার কিংবা আগোরার মতো প্রতিষ্ঠানেও নিজের পণ্য দেখতে চান তিনি।




