বিভাগে প্রথম গবেষণায় দেশসেরা

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বাংলাদেশে তেলাপিয়ার উৎপাদন দ্রুত বাড়ছে। তুলনামূলকভাবে সহজে চাষ করা যায় এবং অল্প সময়ে ভালো ফলন দেয়। ফলে এটি এখন খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি চাষযোগ্য মাছ। রিদিমা আহমেদ রিয়ার গবেষণার বিষয়বস্তু ছিল এই মাছের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং সুরক্ষামূলক কার্যকারিতা মূল্যায়ন। এখন অনেকেই কম জায়গায় বেশি মাছ চাষ করছেন, ফলে মাছগুলো খুব কাছাকাছি থাকায় রোগ হলে সেটা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং বড় ক্ষতির কারণ হয়। সুপারভাইজারের ঠিক করে দেওয়া তেলাপিয়া মাছ নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে রিয়া তেলাপিয়ার দুটি ব্যাকটেরিয়ার ওপর কাজ করেছেন। এগুলো তেলাপিয়া মাছের খুব সাধারণ কিন্তু মারাত্মক রোগের জন্য দায়ী। Aeromonas hydrophila সাধারণত শরীরে ঘা বা সংক্রমণ তৈরি করে আর Streptococcus agalactiae এমন এক ধরনের রোগ সৃষ্টি করে, যা খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং অনেক মাছ মারা যায়। অনেক সময় দেখা যায়, রোগ শুরু হওয়ার পর খুব অল্প সময়ের মধ্যেই বড় অংশের মাছ নষ্ট হয়ে যায়। তিনি প্রতিরোধের দিকে গুরুত্ব দিয়ে ভ্যাকসিন নিয়ে কাজ করেছেন। তার গবেষণা চলমান। রিয়া জানালেন, তার সুপারভাইজার অধ্যাপক ড. আবদুল্লাহ আল মামুনসহ বিভাগের শিক্ষকরা খুব সহযোগিতা করেছেন। সুপারভাইজারই মূলত শেখার সুযোগ করে দিয়েছেন।
এ ধরনের গাইডেন্স আর প্র্যাকটিক্যাল এক্সপোজার তার আগ্রহকে আরও শানিত করেছে। পরিবার থেকেও তিনি অত্যন্ত সহযোগিতা পেয়েছেন। গাজীপুরে বড় হয়েছেন, তাই ছোটবেলা থেকেই কৃষি গবেষণা, ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো কাছ থেকে দেখার সুযোগ পেয়েছেন। ভবিষ্যতে রিদিমা দেশের মৎস্য খাতে এমন পরিবর্তন দেখতে চান, যেখানে উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি দেশীয় মাছের প্রজাতিগুলোকেও সমান গুরুত্ব দেওয়া হবে। বর্তমানে উৎপাদন বাড়ানোর জন্য কিছু নির্দিষ্ট প্রজাতির ওপর বেশি জোর দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু এর ফলে অনেক দেশীয় মাছ ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে, যা জীববৈচিত্র্যের জন্য ভালো নয়। তিনি মনে করেন, উৎপাদন বাড়ানো যেমন দরকার, তেমনি দেশীয় প্রজাতি সংরক্ষণও খুব প্রয়োজনীয়। কারণ এগুলো পরিবেশ ও পুষ্টির জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। একই সঙ্গে রোগ ব্যবস্থাপনায় আরও বিজ্ঞানভিত্তিক ও প্রতিরোধমূলক পদ্ধতির ব্যবহার বাড়ানোও জরুরি, যাতে চাষিরা সহজে কার্যকর সমাধান পান। তিনি চান, গবেষণার মাধ্যমে ব্যাকটেরিয়াল রোগ নিয়ন্ত্রণ নিয়ে কাজ করতে এবং সুযোগ পেলে দেশীয় মাছের সংরক্ষণ বা উন্নয়ন নিয়েও কাজ করতে।
উৎপাদন যেমন বাড়ানো দরকার, তেমনি দেশীয় প্রজাতী সংরক্ষণও খুব প্রয়োজনীয়। কারণ এগুলো পরিবেশ ও পুষ্টির জন্য গুরুত্বপূর্ণ
সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মাৎস্যবিজ্ঞান অনুষদের ফিশ হেলথ ম্যানেজমেন্ট বিভাগের সেরা ছাত্রী তিনি। অনার্সে তার ফলাফল ৩.৯৮৫ সিজিপিএ। মাস্টার্সের প্রথম সেমিষ্টারে পেয়েছেন ৪.০০। ব্যক্তিগতভাবে কখনোই ‘প্রথম হওয়ার’ জন্য পড়াশোনা করেননি। সবসময় নিজের সেরাটি দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। পরীক্ষার সময়ও ভাবতেন- যা পড়েছি, সেটার সেরাটা যেন ঠিকভাবে লিখে যেতে পারি। তার মতে, নিজের উন্নতির দিকে ফোকাস করলেই ফলাফল ধীরে, ধীরে ভালো আসে। এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো- পরিশ্রম, ধৈর্য আর ধারাবাহিকতা।
গবেষণার মৌলিকত্ব, মেধাতালিকা এবং উপস্থাপনার ভিত্তিতে প্রতি বছর এনএসটি ফেলোশিপ প্রদান করা হয়। সারা দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রতিযোগীদের পেছনে ফেলে তিনি শীর্ষস্থান দখল করেছেন। আগামীতে উচ্চতর গবেষণা সম্পন্ন করে দেশের কৃষিবিপ্লবে সরাসরি ভূমিকা রাখার স্বপ্ন দেখছেন এই গবেষক।
রিদিমা বলেছেন, জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি (এনএসটি) ফেলোশিপ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে খাদ্য ও কৃষিবিজ্ঞান শাখায় নির্বাচিত হওয়াকে আমি অত্যন্ত সম্মানের সঙ্গে গ্রহণ করছি। বর্তমানে মাছের স্বাস্থ্য ও রোগ প্রতিরোধে বায়োফিল্মভিত্তিক ভ্যাকসিন সংক্রান্ত একটি প্রয়োগধর্মী গবেষণায় কাজ করছি।
সুপারভাইজার ড. আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘রিদিমা আহমেদ রিয়ার এই সাফল্য বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য অত্যন্ত গৌরবের। তিনি মাৎস্যবিজ্ঞান (সম্মান) পর্যায়ে তার ব্যাচে প্রথম স্থান অর্জন করেছেন এবং এসএসসি ও এইচএসসি উভয় পরীক্ষায় জিপিএ ৫ অর্জনের মাধ্যমে ধারাবাহিক অ্যাকাডেমিক উৎকর্ষের স্বাক্ষর রেখেছেন। আমাদের শিক্ষার্থীরা গবেষণায় দিন দিন ভালো করছে। রিয়ার এই অবস্থান তারই প্রমাণ।’





