ছবি এঁকে নবনূরের ছয় দশক

নবনূর আলী
ছয় দশকের বেশি সময় ধরে রঙ আর তুলিই সঙ্গী নবনূর আলীর। তার কথা লিখেছেন স্বপন চৌধুরী
রংপুর নগরের নিউ জুম্মাপাড়ার ছোট্ট ঘরটিতে ঢুকলেই চোখে পড়ে সারি সারি ক্যানভাস। কোনোটিতে রঙতুলিতে আঁকা মেঠোপথ, কোনোটিতে নদীতে ভাসছে নৌকা, কোথাও আবার গোধূলির আলোয় গাঁয়ে ফিরছে গরুর পাল। দেয়ালের সঙ্গে হেলান দিয়ে রাখা অসমাপ্ত কয়েকটি ছবি, টেবিল জুড়ে ছড়িয়ে আছে রঙতুলি আর প্যালেট। এক কোণে বসে সাদা ক্যানভাসে ধীরে ধীরে রঙের পরত বসাচ্ছেন একজন মানুষ। বয়স সত্তর ছুঁইছুঁই, নিবিষ্ট মনে ক্যানভাসে দিয়ে যাচ্ছেন তুলির আঁচড়। যেন ফিরে যাচ্ছেন শৈশবের দিনগুলোয়, যখন ছবি আঁকা ছিল নিছক ভালো লাগা।
নাম নবনূর আলী। তার আঁকা ছবি শুধু রংপুর কিংবা দেশের বিভিন্ন প্রান্তেই নয়; পৌঁছে যাচ্ছে লন্ডন, কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতেও। স্থানীয় মানুষের কাছে তিনি যেমন একজন চিত্রশিল্পী, তেমনি প্রবাসী বাংলাদেশিদের কাছে গ্রামবাংলার স্মৃতিকে ক্যানভাসে ফিরিয়ে আনার এক বিশ্বস্ত নাম।
সময় বদলেছে। হাতে আঁকা পোস্টার, ব্যানার কিংবা সাইনবোর্ডের জায়গা অনেকটাই দখল করে নিয়েছে ডিজিটাল ছবি। একসময় যে শহরে অসংখ্য আর্টের দোকান ছিল, সেখানে এখন হাতেগোনা কয়েকজন শিল্পী টিকে আছেন। অনেকেই জীবিকার তাগিদে পেশা বদলেছেন। কেউ ব্যবসা করছেন, কেউ অন্য কাজে চলে গেছেন; কিন্তু নবনূর আলী পারেননি। কারণ, তার কাছে ছবি আঁকা শুধু জীবিকা নয়; এটি অস্তিত্বের অংশ।
নবনূরের জন্ম ১৯৫৮ সালে। রংপুরের একটি সাধারণ পরিবারে। মা-বাবার দেওয়া নাম ছিল নবীনূর আলী। পরে নিজের আঁকা প্রতিটি ছবিতে স্বাক্ষর করার সময় লিখতে শুরু করেন ‘নবনূর’। সেই নামেই পরিচিতি। প্রথম শ্রেণিতে পড়ার সময় থেকেই আঁকাআঁকির শুরু। চারুকলায় পড়ার সুযোগ হয়নি, কোনো শিক্ষকের কাছেও শেখা হয়নি। চোখের সামনে যা দেখতেন, তা-ই আঁকতেন। কল্পনাই ছিল তার সবচেয়ে বড় শিক্ষক। পড়াশোনায় মন বসেনি। কৈলাশরঞ্জন উচ্চ বিদ্যালয়ে দশম শ্রেণি পর্যন্ত পড়লেও এসএসসি পরীক্ষার আগেই লেখাপড়া ছেড়ে দেন। বুঝে গিয়েছিলেন, তার জীবন রঙ আর তুলির সঙ্গেই জড়িয়ে যাবে। পরিবারের আপত্তি ছিল, আশপাশের মানুষও নানা কথা বলেছেন। কিন্তু সেসব তাকে থামাতে পারেনি।
লন্ডনপ্রবাসী এক বাংলাদেশি কয়েকটি ছবি কিনতে চান। এরপর নিউ ইয়র্ক কানাডা, ভারত— একের পর এক দেশ থেকে আসতে থাকে অর্ডার
সেই সিদ্ধান্তই আজ তাকে দিয়েছে পরিচয়। রংপুর শহরে নিজ বাসার সামনেই গড়ে তুলেছেন ‘নবনূর আর্ট’। এখানেই তৈরি হয় তার অধিকাংশ ছবি। বিভিন্ন স্কুল-কলেজ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কিংবা দেয়ালচিত্র আঁকার ডাকও আসে নিয়মিত। কোনো দৃশ্য একবার চোখে পড়লেই হলো, হুবহু তা ক্যানভাসে তুলে আনতে পারেন নবনূর। সবচেয়ে বেশি টানে গ্রামবাংলা। মেঠোপথ, নদী, নৌকা, কাশবন, সবুজ মাঠ, কৃষকের জীবন, গ্রামের সকাল কিংবা বিকালের আলো— এসবই তার ছবির প্রধান বিষয়।
শহরের মানুষ নবনূর, কিন্তু তার ছবিতে শহুরে কোলাহল নেই; আছে প্রায় হারিয়ে যেতে বসা বাংলার চিরচেনা প্রকৃতি।
১৯৭৫ সালে রংপুর শহরের মিঠু হোটেলের মালিক তার একটি ছবি কিনেছিলেন; হোটেল সাজানোর জন্য। এ ঘটনা নবনূরের জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। এরপর ধীরে ধীরে পরিচিতি বাড়তে থাকে। বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে পুরস্কারও জিতেছেন।
তবে নবনূরের কাছে সবচেয়ে বড় পুরস্কার হলো, তার ছবি দেখে মানুষের মুগ্ধ হওয়া। এরই মধ্যে রংপুর আর্ট একাডেমি, স্বপ্ন আর্ট একাডেমি, রংপুর জেলা দোকান মালিক সমিতি ও জেলা কমার্শিয়াল আর্টিস্ট অ্যাসোসিয়েশনসহ বিভিন্ন সংগঠন থেকে সম্মাননাসহ পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন।
সাম্প্রতিক সময়ে তার শিল্পীজীবনে এসেছে নতুন এক অধ্যায়। কয়েক বছর আগে শখ করে নিজের আঁকা কিছু ছবি ফেসবুকে প্রকাশ করেছিলেন। সেখান থেকেই একদিন আসে প্রথম বিদেশি অর্ডার। লন্ডনপ্রবাসী এক বাংলাদেশি কয়েকটি ছবি কিনতে চান। এরপর নিউ ইয়র্ক, কানাডা, ভারত— একের পর এক দেশ থেকে আসতে থাকে অর্ডার। এখন বিদেশে থাকা প্রবাসী বাংলাদেশিরাই বড় ক্রেতা। নবনূর বলেন, ‘শুরুতে ভাবিনি ফেসবুক থেকে কেউ ছবি কিনতে চাইবে। এখন দেশের বিভিন্ন জায়গার পাশাপাশি বিদেশ থেকেও সরাসরি অর্ডার আসে। আঁকা ছবি কুরিয়ারে পাঠিয়ে দিই।’
দেশের বাজারে তার একটি ছবি বিক্রি হয় তিন থেকে চার হাজার টাকায়। বিদেশে একই ধরনের ছবি বিক্রি হয় পাঁচ থেকে ছয় হাজার টাকায়। কিন্তু সেই আয়ে খুব বেশি সচ্ছলতা আসেনি। কারণ রঙ, ক্যানভাস, তুলি— সবকিছুর দাম বেড়েছে কয়েক গুণ। তার ভাষায়, ‘ছবির দাম যতটা বাড়েনি, উপকরণের দাম বেড়েছে তার চেয়ে অনেক বেশি। লাভ খুব একটা থাকে না। তবু ছবি আঁকা ছাড়তে পারি না।’ অর্থনৈতিক হিসাব-নিকাশের চেয়ে শিল্পচর্চার আনন্দই তার কাছে বড় হয়ে ওঠে।
তিন সন্তানের জনক নবনূরের পরিবারে কেউ পেশাদার শিল্পী না হলেও অষ্টম শ্রেণিতে পড়া নাতনি কবরী জান্নাতী এখন তার কাছেই ছবি আঁকা শিখছে। এটিকেই তিনি নিজের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তিগুলোর একটি মনে করেন। ‘অন্তত পরিবারের একজনকে এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত করতে পেরেছি’— বলতে বলতেই মুখে ফুটে ওঠে তৃপ্তির হাসি। জীবনের প্রায় সাত দশক পেরিয়েও প্রতিদিন নতুন করে ক্যানভাসে রঙ মেশান নবনূর আলী। তার প্রতিটি ছবিতে ধরা পড়ে বাংলার প্রকৃতি, মানুষের জীবন আর মাটির গন্ধ। হয়তো এ কারণেই দেশের গণ্ডি পেরিয়ে তার আঁকা ছবিগুলো পৌঁছে যাচ্ছে বিশ্বের নানা প্রান্তে। কারণ তিনি জানেন, কিছু নেশা জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে। নবনূরের কাছে ছবি আঁকাও ঠিক তেমনই— যে নেশা তাকে এখনো প্রতিদিন নতুন ক্যানভাসের সামনে বসতে শেখায়; দেয় নতুন নতুন ছবি আঁকার প্রেরণা।





