ঢাকার মতো একটি জীবন্ত ডিস্টোপিয়ার মাঝখানে যেন এক ‘প্যারালাল জগৎ’।
‘অক্সিজেন ফ্যাক্টরি’র দুই কারিগর

এ ছাদবাগানে দেখা মেলে বুলবুলি, দোয়েল, শালিক আর চড়ুইয়ের। ছবি: লেখক
ঢাকা শহরে যখন একের পর এক গাছ কেটে উঠছে কংক্রিটের দেয়াল, তখন যাত্রাবাড়ীর এক দালানের ছাদ আমাদের শোনাচ্ছে ভিন্ন গল্প। সেখানে যেমন আছে নানা প্রজাতির পাতাবাহার, তেমনি আছে বারোমাসি আম, জামরুল, পেয়ারা, আনারস, ক্যাকটাসসহ আরও কত কী!
এ ছাদবাগানে দেখা মেলে বুলবুলি, দোয়েল, শালিক আর চড়ুইয়ের। কখনো উড়ে আসে নাম না জানা অদ্ভুত সুন্দর পাখি। পাখির ডাক, পাতার শব্দ আর যত্নে গড়ে ওঠা ছাদবাগান যেন ঘিঞ্জি এ শহরের বুকে ছোট্ট এক শ্বাস নেওয়ার জায়গা। মাহবুবা জিন্নাতের ভাষায় ‘অক্সিজেন ফ্যাক্টরি’।
মাহবুব উদ্দিন আহমেদ ও মাহবুবা জিন্নাত দম্পতি এ ‘ফ্যাক্টরির’ কারিগর। প্রায় তিন দশক ধরে নিজেদের শ্রম, মমতা আর ভালোবাসা দিয়ে তারা গড়ে তুলেছেন এক সবুজ পৃথিবী। তখন তারা ছিলেন বয়সে যুবা, এখন বৃদ্ধ। তবে তাদের এ শ্রম, আন্তরিকতার ফলাফল, ঢাকার মতো একটি জীবন্ত ডিস্টোপিয়ার মাঝখানে যেন এক ‘প্যারালাল জগৎ’।
এ জগতের বীজ রোপিত হয়েছিল বহু বছর আগে। গত শতকের নব্বইয়ের দশকে। বাংলাদেশের শহরগুলোয় হাউজ বিল্ডিং লোন নিয়ে বাড়ি করার হিড়িক পড়েছে তখন। তার সঙ্গে হাত ধরাধরি করে শুরু হয়েছে শিল্পায়ন। চারদিকে উঠছে নতুন নতুন দালান। সেই সময় মাহবুবা জিন্নাতের বাবা একদিন আক্ষেপ করে বলেছিলেন, ‘সবাই তো লোন নিয়ে বাড়ি করবে কিন্তু ঢাকা শহরে আর গাছ থাকবে না। মানুষ গাছ কাটবে, আর ভাড়া দেবে।’
বাবার সেই কথাই মেয়ের মনে গেঁথে ছিল বছরের পর বছর। তা ছাড়া শৈশবে নিজের মাকে দেখেছেন ওয়ারীর বাড়িতে বাগান করতে। গাছপালার প্রতি জিন্নাতের মায়ের ছিল অপরিসীম দরদ। ছাদবাগানের অনুপ্রেরণা পেয়েছেন মায়ের কাছ থেকেই। ‘গাছপালার প্রতি মায়া-মমতা আমার রক্তে’— বলছিলেন জিন্নাত।
অন্যদিকে মাহবুব উদ্দিন আহমেদের শৈশব-কৈশোর কেটেছে গাছঘেরা পরিবেশে। বর্তমানে যাত্রাবাড়ীর যে বাড়িতে তারা থাকছেন, এটাই তার পৈতৃক নিবাস। কিন্তু সময় বদলেছে। পৈতৃক বাড়ি ভাগ হয়েছে। এক সময়কার সবুজ উঠান হারিয়ে গেছে কংক্রিটের নিচে। এ আফসোস যেন তাকে আরও উসকে দিয়েছে বৃক্ষের মায়ায় জড়িয়ে যেতে।
মাহবুব তার স্মৃতির জানালা খুলে দিলেন অকৃপণ হস্তে। মজার এক গল্প শোনালেন— ‘তখনো বিয়ে করিনি। কনে দেখতে গিয়েই উপস্থিত হলাম মাহবুবা জিন্নাতদের ওয়ারীর বাড়িতে। আমার হবু শ্যালিকারা দেখি ছাদ থেকে আমাকে গোলাপ ছিঁড়ে এনে দিল। কৌতূহলে ছাদে গেলাম। ওখানে ফুটে থাকতে দেখলাম নানা রঙের গোলাপ।’
ওই ছাদময় গোলাপের বাগানটি ছিল জিন্নাতের মায়ের অর্থাৎ তার শাশুড়ির। সেই গোলাপের বাগান দেখতে কত কত মানুষ আসত তখন!
দুজনের দিকে প্রশ্ন ছুড়ে দিলাম, ‘এ বাগানটা কবে শুরু করলেন?’
ভাগাভাগি করে দুজনই বললেন, ১৯৯৭ সালে বর্তমান এ বাড়ির তিনতলার ছাদ ঢালাই হওয়ার পর শুরু এই ছাদবাগানের যাত্রা। প্রথমে ছিল কয়েকটি টব আর কিছু পাতাবাহার। ধীরে ধীরে চারতলা, পাঁচতলা, ছয়তলা উঠেছে। আর সঙ্গে বেড়েছে ছাদের বাগানও। এখন পাঁচ ও ছয়তলার পুরো ছাদ জুড়েই তাদের সবুজ সংসার।
এ বাগানের শুরুটা ফেলে দেওয়া তেলের জার, পুরনো টব আর জমিয়ে রাখা মাটি এসব দিয়েই। কোথাও ভালোলাগা কোনো গাছ দেখলে তার ডাল ভেঙে এনে লাগিয়ে দিতেন। কখনো বলধা গার্ডেন থেকে ছাঁটাই করা ডাল কুড়িয়ে এনেছেন, কখনো কারও বাসা থেকে পাওয়া ছোট্ট চারা, আজ যাদের অনেকেই বিশাল গাছ।
মাহবুবা জিন্নাত হেসে হেসে বলছিলেন, ‘গাছ কিনে খুব বেশি লাগাইনি, যেখানে যেটা ভালো লেগেছে, সেখান থেকে একটু ডাল এনে পুঁতে দিয়েছি।’
এ স্বভাবটা এখনো বদলায়নি। কোথাও বেড়াতে গেলে তার চোখ আগে খোঁজে গাছ। কোনো নতুন পাতার নকশা, অদ্ভুত রঙের ফুল কিংবা বিরল ক্যাকটাস দেখলে থেমে যান। অনেক সময় আশপাশের মানুষ অবাক হয়ে দেখেন, কেউ একজন গাছের ছোট্ট একটি ডালকে মমতা নিয়ে হাতে ধরে আছে! কিন্তু তার কাছে সেটি শুধু একটি ডাল নয়; বরং ভবিষ্যতের সবুজ সম্ভাবনা।
শুরুতে পাতাবাহারই ছিল তার বেশি প্রিয়। কারণ ফুল ফোটে, আবার ঝরেও যায়। শুকিয়ে যাওয়া ফুল তার মন খারাপ করে দিত। কিন্তু পাতাবাহার সারা বছরই সবুজ থাকে। তবে তার সন্তান মুনওয়ার-এর কথায় ছাদবাগানে অল্প অল্প করে শোভা পেল ফুলগাছ। মুনওয়ার তখন ছোট্ট শিশু। হঠাৎ একদিন বলে বসল, ‘সবার বাসায় ফুল আছে, আমাদের বাসায় কোনো ফুল নাই!’
সেই কথার পরই প্রথম একটি ফুলগাছ আনা। তারপর ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে ফুলের সংখ্যা।
আজ তাদের বাগানে রয়েছে প্রায় আড়াইশ থেকে তিনশ প্রজাতির গাছ। ফল, ফুল, ক্যাকটাস, পাতাবাহার দিয়ে বৈচিত্র্যে ভরা এই ছাদ যেন ছোট্ট এক উদ্ভিদ জাদুঘর। আছে বারোমাসি আম, বড়ই, তেজপাতা, জামরুল, পেয়ারা আর আনারস। আছে বিভিন্ন ধরনের ক্যাকটাস। শুধু ‘কৈলাশ’ নামের পাতাবাহারেরই রয়েছে প্রায় ১৮-১৯টি ভিন্ন রঙ ও ধরন।
গাছগুলোর প্রতি তাদের আবেগ এতটাই গভীর, প্রতিটি টব, প্রতিটি পাতার সঙ্গে জড়িয়ে আছে আলাদা স্মৃতি। কোনো গাছ জিন্নাত নিয়ে এসেছেন মায়ের কাছ থেকে, কোনোটা এসেছে মাহবুব উদ্দিনের কর্মক্ষেত্র থেকে, আবার কোনোটা বহু বছর আগে রাস্তার পাশ থেকে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে গাছগুলো যেমন বড় হয়েছে, তেমনি বেড়েছে তাদের নিয়ে গল্প, স্মৃতি, অভিজ্ঞতা।
মাহবুব উদ্দিন আহমেদ শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক, এরপর উদ্ভিদ রোগতত্ত্ব বিষয়ে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর করে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটে (বারি) বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন। পরে পরিচালক হিসেবে অবসর নেন। বিনয়ী এ মানুষটি পিএইচডি করেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। পিএইচডিতে তার গবেষণার বিষয়বস্তু ছিল ‘স্টাডি অন দ্য ম্যানেজমেন্ট অব সিডলিং ডিজিজেস অব হুইট ইন বাংলাদেশ।’
ছাদবাগান গড়ে তোলার গল্প বলতে বলতে তিনি জানালেন, পেশাগত জ্ঞান থাকলেও এ বাগানের আসল রূপকার তার স্ত্রী জিন্নাত মাহবুব, ‘আমি হয়তো তাত্ত্বিক জ্ঞান দিয়েছি; কিন্তু গাছগুলোর পেছনে আসল শ্রম, যত্ন আর সময় সবই তার।’
স্মৃতির ঝাঁপি মেলে ধরে মাহবুব উদ্দিন শোনালেন তার কর্মজীবনের কথা। অফিস ছিল গাজীপুরে। চাকরির কারণে তাকে প্রতিদিন ভোরে বের হতে হতো। পরে ট্রাফিক জ্যাম এত বেড়ে যায় যে, প্রতিদিন প্রায় ছয় ঘণ্টা রাস্তাতেই কেটে যেত। ফলে বাগানে সময় দেওয়ার সুযোগ কম ছিল। কিন্তু তার স্ত্রী সকাল-বিকাল গাছের পরিচর্যা চালিয়ে গেছেন নিরলসভাবে।
তবে তার কৃষিজ্ঞান বাগানকে দিয়েছে অন্য এক মাত্রা। গাছের পাতার রঙ দেখে, দাগ দেখে বা বৃদ্ধির ধরন দেখে তিনি বুঝে যান রোগের ধরন। এটি ফাঙ্গাস, ব্যাকটেরিয়া নাকি পুষ্টির অভাব— সহজেই শনাক্ত করেন তিনি। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তারা বাগানে রাসায়নিক কীটনাশক ব্যবহার করেন না।
মাহবুব উদ্দিন আহমেদের কথা, ‘তাদেরও অসুখ হয়। কিন্তু সুস্থ রাখার জন্য সবসময় কেমিক্যাল দরকার হয় না।’
এ বিশ্বাস থেকেই, এই দম্পতি এখন একটি বইও লিখছেন। নাম দিয়েছেন ‘ছাদবাগানে বিভিন্ন ফসলের নিরাপদ আবাদ’। বইটিতে কীভাবে নিরাপদ ও জৈব উপায়ে ছাদে ফুল, ফল, শাকসবজি চাষ করা যায়, তা তুলে ধরা হচ্ছে।
কবি ও সাংবাদিক ফরহাদ নাইয়া বইটির পাণ্ডুলিপি সম্পাদনার কাজে সাহায্য করছেন। অর্থাৎ, এ সবুজ উদ্যোগ এখন পুরো পরিবারেরই এক ধরনের যৌথ স্বপ্নে পরিণত হয়েছে। সবচেয়ে সুন্দর বিষয় হলো, বইটিতে স্ত্রীকে সহ-লেখক করেছেন তিনি। কারণ হিসেবে তার ভাষ্য, ‘এ বইয়ের বাস্তব জ্ঞানগুলো তো তার কাছ থেকেই পাওয়া।’
তাদের ছাদবাগান শুধু গাছের আশ্রয় নয়, পাখিদেরও নিরাপদ জায়গা। সকালে বা বিকালে সেখানে বসলে শোনা যায় পাখির কিচিরমিচির। বুলবুলি, দোয়েল, শালিক, চড়ুই নিয়মিত আসে। এ দম্পতির সঙ্গে যখন আলাপে আড্ডায় মেতে উঠেছি, তখন কতবার যে এসব পাখি ডালে ডালে উঁকিঝুঁকি দিয়ে গেল!
এ পুরো বাগানটি তৈরি হয়েছে খুব সীমিত খরচে। বছরে হয়তো ৪-৫ হাজার টাকার মতো খরচ হয়। মাটিও তারা অনেক সময় নিজেরাই তৈরি করেন। ছাদ ঝাড়ু দেওয়ার পর জমে থাকা ধুলো-মাটি আলাদা করে রেখে পরে টবে ব্যবহার করেন।
নিশ্চিত করেই বলা যায়— এ ছাদবাগানের বহু গাছ, আজকের শিশুদের অনেকেই হয়তো দেখেইনি। কারণ, শহরের বেশিরভাগ বাড়িতেই কোনো উঠান নেই, এলাকায় নেই খেলার মাঠ, গাছ, পাখির ডাকও নেই। সেই বাস্তবতায় এ ছাদবাগান সত্যিই অন্য এক পৃথিবী!
মাহবুব উদ্দিন আহমেদের বয়স এখন ৬৮, জিন্নাত মাহবুবও ষাটোর্ধ্ব। তাদের দিনের কর্মব্যস্ততার একটি বড় অংশ কাটে এ বাগান ঘিরে। আর এই ছাদবাগান, শুধু একটি শখের আয়োজনে আটকে নেই এখন, বরং যেন হয়ে উঠেছে তুমুল নগরায়ণ আর দূষণের বিপরীতে দাঁড়িয়ে থাকা এক সজীব ইউটোপিয়া।












