টোটো কোম্পানি
যে জলে আগুন জ্বলে

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার বাড়বকুণ্ড তীর্থধামের অগ্নিকুণ্ড নিয়ে লিখেছেন বাবর আলী
জল আমাদের কাছে আগুন নেভানোর মাধ্যম হিসেবে জ্ঞাত। তবে আমাদের দৈনন্দিনতার চেনা সমীকরণগুলো টাল খাবে, যদি সেই জলেই আগুন জ্বলতে দেখা যায়!
‘যে জলে আগুন জ্বলে’— সেই জল দেখতে যেতে হবে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার বাড়বকুণ্ডে। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কসংলগ্ন বাড়বকুণ্ড বাজারের অবস্থান সীতাকুণ্ড মূল বাজার থেকে ৫ কিলোমিটার দূরত্বে। বাড়বকুণ্ড বাজার থেকে অগ্নিকুণ্ডে যাওয়ার পথ সব মিলিয়ে আড়াই কিলোমিটার। রাস্তার প্রথম অংশটুকু পিচ, এর পরের কিছু অংশ ইটের। বাড়বকুণ্ড বাজার থেকে টমটমে আরামেই আসা যায় ইটের রাস্তা পর্যন্ত অংশে। এই পথের দুই পাশে প্রচুর সবজিক্ষেত। ফাঁকে ফাঁকে চোখে পড়ে পেয়ারাবাগানও। লাল সালুতে মোড়ানো পেয়ারার গাঁইট হাতে বাড়বকুণ্ড বাজারের দিকে এগোতে থাকা স্থানীয় পেয়ারাচাষিদেরও দেখবেন পথে।
ইটের রাস্তার শেষে মাটির রাস্তা। পা দুটোর ওপর ভরসা করতে হয় এখান থেকেই। অপেক্ষাকৃত প্রশস্ত মাটির রাস্তার শেষাংশে একটি টলটলে জলের ঝিরি ছোট ছোট পাথরের ফাঁক গলে পথ করে নিয়েছে। ঝিরি ধরে ডানে এগোলে ২০ মিনিটেই পৌঁছে যাওয়া যায় সুন্দর একটা ঝরনায়। আমাদের গন্তব্য অন্য বলে সোজা পথ ধরলাম। এখান থেকে পায়ে চলার সরু মাটির পথ আর চওড়া একটা পুরনো শ্যাওলায় মোড়ানো সিঁড়ি ধরে স্বল্প চড়াই ভেঙে উঠতে হবে একটা ছোট্ট টিলায়। সিঁড়ি ধরে উঠে গেলেই দেখা মিলবে বাড়বকুণ্ড তীর্থধামের। এই ধামে ছোট-বড় মিলিয়ে বেশ কয়েকটি মন্দির রয়েছে। তবে এই তীর্থস্থানের মূল আকর্ষণ অগ্নিকুণ্ড। মন্দিরের সিঁড়ি বেয়ে নিচের দিকে নেমে গেলে চৌকোনা খোপের মধ্যে কাঁপতে থাকা জলে চোখ আটকে যায়। এই জলের ওপরই জ্বলছে আগুন। থেকে থেকে বুদ্বুদ উঠছে পানি থেকে।
কবে থেকে এই অগভীর কুয়োর জল জ্বলছে, তার সঠিক হদিস জানেন না কেউ। আগুন ছড়িয়ে না পড়ার জন্য সম্প্রতি মজবুত ঢালাই দেওয়া হয়েছে চারপাশে। এই কুণ্ডকে স্থানীয়রা ডাকেন বাড়বানল নামে।
অগ্নিকুণ্ডের ওপাশের দেয়ালের খোঁড়লে রাখা আছে দুটি শিবলিঙ্গ। একসময় যদিও এখানে কষ্টিপাথরের দুটি মূর্তি ছিল। তস্করের হাত পড়ে সেগুলো উধাও হয় বেশ কয়েক বছর আগে। স্থানীয় জনশ্রুতি অনুযায়ী, দুনিয়ার নানা অংশের মতো একসময় এই অঞ্চলেও নরবলি হতো। উদ্দেশ্য, দেবতাকে তুষ্ট করে তার কোপানল থেকে নিজেদের বাঁচানো। একদিন ঘটে অত্যাশ্চর্য এক ঘটনা। যে হাড়িকাঠের ওপর মাথা রেখে নরবলি দেওয়া হতো, সেখানে হঠাৎ আগুন ধরে যায়। এ ঘটনাকে দেবতার অলৌকিক ইশারা ভেবে এর পর থেকে নরবলি বন্ধ হয়ে যায়।
তবে সনাতন ধর্মবিশ্বাস অনুযায়ী, নিজের বাবার আয়োজিত মহাযজ্ঞে স্বামী শিবকে অপমান করা হলে দেবী সতী যজ্ঞকুণ্ডে আত্মাহুতি দেন। স্ত্রীর শোকে কাতর প্রলয়ের দেবতা শিব শুরু করেন প্রলয়নৃত্য। এতে বিশ্বব্রহ্মাণ্ড ধ্বংসের উপক্রম হলে স্থিতির দেবতা বিষ্ণু নটরাজ শিবের সঙ্গিনী সতীর দেহকে ৫১ খণ্ডে বিভক্ত করেছিলেন। তারই একটি খণ্ড এসে এই কুণ্ডে পড়েছিল। জলের ওপর আগুন জ্বলার আশ্চর্য ঘটনারও শুরু সেই থেকে। সেই থেকে এই আগুন নিরবচ্ছিন্নভাবে জ্বলে যাচ্ছে। কারও কারও মতে, এই অনিবার্ণ শিখা শিব জায়া সতীর ডান বাহুর অংশ থেকে উৎপন্ন। ৫১টি শক্তিপীঠের একটি হিসেবেও একে বিবেচনা করেন অনেকে।
পুরাণ থেকে দৃষ্টি সরিয়ে বিজ্ঞানের দ্বারস্থ হলে দেখা যায়, এই অগ্নিকুণ্ডের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যাও আছে। এই অঞ্চলের পাহাড়ের তলায় মিথেন গ্যাস মজুদের প্রমাণ মেলে ঔপনিবেশিক আমলে। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, সেই গ্যাসই এ অগ্নিকুণ্ডের প্রকৃত উৎস। পৃথিবীর উপরিভাগের নানা ফুটো দিয়ে নিঃসৃত মিথেন গ্যাসের সঙ্গে বাতাসের বিক্রিয়ার ফলেই এ আগুনের সৃষ্টি। আবার অনেক ভূতাত্ত্বিকের ধারণা, ১৭৬২ সালের প্রলয়ংকরী আরাকান ভূমিকম্পের ফলেই এই অগ্নিশিখার উৎপত্তি।
এই অগ্নিকুণ্ড সনাতন ধর্মাবলম্বীদের কাছে অতি পবিত্র। খালি পায়ে নানা মানত মনে পুষে রেখে অনেকেই দ্বারস্থ হন এই অগ্নিকুণ্ডের। সংলগ্ন মন্দিরের বিগ্রহগুলোও ভক্তকুলের নিয়মিত নৈবেদ্য পায়। এই তীর্থধামে অগ্নিকুণ্ড ছাড়াও কয়েকটি মন্দির আছে। মন্দিরগুলোর দেয়ালে সম্প্রতি রঙের ছোপ পড়েছে। অগ্নিকুণ্ডের অদূরেই অবস্থান এ অঞ্চলের সবচেয়ে বিখ্যাত উপাসনালয় চন্দ্রনাথ মন্দিরের। শিব চতুর্দশীতে চন্দ্রনাথ মন্দিরের মতো এই অগ্নিকুণ্ডেও প্রচুর পুণ্যার্থীর সমাগম হয়। সনাতন ধর্মবিশ্বাস অনুযায়ী, চন্দ্রনাথ তীর্থ পরিক্রমার শুরু হয় বাড়বকুণ্ডের এই অগ্নিকুণ্ড থেকে।




