ইন্টারন্যাশনাল ট্রেন্ড
বাটার ইয়েলোর স্নিগ্ধ দুনিয়া

ছবি: ইন্টারনেট
আন্তর্জাতিক ফ্যাশনে এখন মাখনের মতো হলুদের রাজত্ব। প্রশান্তি ও আভিজাত্যের ছেঁায়া পেতে বাটার ইয়েলোই ফ্যাশনপ্রেমীদের প্রথম পছন্দ। লিখেছেন সায়মন
ফ্যাশন দুনিয়ায় বিষণ্নতা ছড়ানো রঙের একঘেয়ে যুগ যেন একেবারে শেষ হতে চলেছে! গত কয়েক বছরের অতিরিক্ত উজ্জ্বল বা কড়া রঙের ট্রেন্ড থেকে বেরিয়ে এসে ২০২৬ সালের ফ্যাশনে রাজত্ব করছে মাখনের মতো কোমল একটি হলুদ রঙ, যা বাটার ইয়েলো নামে পরিচিত। এই রঙকে সাময়িক ফ্যাশন ট্রেন্ড বলা যায় না। আধুনিক যুগে শত ব্যস্ততার চাপে মানুষ একটু প্রশান্তি খুঁজে বেড়ায়— বাটার ইয়েলো নিয়ে মাতামাতি সেই সত্যকেই সামনে নিয়ে এসেছে।
রঙটির উঁকিঝুঁকি গত বছর শুরু হলেও চলতি মৌসুমে আরও বেশি প্রাসঙ্গিক ও অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। এটি খুব কড়া বা চোখে লাগার মতো রঙ নয়; আবার একদম ফ্যাকাশেও নয়। ফ্রিজে রাখা মাখনের মতো স্নিগ্ধ এ রঙ আমাদের রোজকার জীবনে এক অন্যরকম স্বস্তি নিয়ে আসে। ফ্যাশন বিশেষজ্ঞরা একে বলছেন পরিমিতিবোধের নতুন যাত্রা, যা তুমুল বর্ষণ শেষে মিষ্টি রোদের ঝিলিকের মতো উষ্ণ অনুভূতি দেয় এবং মানুষের মনকে শান্ত রাখে।
রানওয়ে থেকে রোজকার পোশাকে
রানওয়ে থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন স্টাইল— সব জায়গায় বাটার ইয়েলোর দাপট খুব স্পষ্টভাবে চোখে পড়ার মতো। মিলান ফ্যাশন উইক থেকে শুরু করে শ্যানেল, ডিওর এবং লোয়েভের মতো বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ডগুলোর রানওয়েতে এ রঙের ব্যাপক উপস্থিতি দেখা গেছে। বিখ্যাত ডিজাইনাররা বোহো স্টাইলের মাধ্যমে রঙটিকে সগৌরবে ফিরিয়ে এনেছেন। অন্যদিকে প্রাডার মতো স্বনামধন্য ব্র্যান্ড তাদের পোশাকে এ স্নিগ্ধ রঙের চমৎকার ব্যবহার করেছে। শুধু বিলাসবহুল ব্র্যান্ডই নয়; সাধারণ ক্রেতাদের নাগালের মধ্যে থাকা জনপ্রিয় পোশাকের শোরুমগুলোতেও বাটার ইয়েলো রঙের পোশাক বিক্রির ধুম চলছে। ডিজাইনাররা প্রমাণ করেছেন, অত্যন্ত সাধারণ একটি রঙ দিয়েও কীভাবে চমৎকার আভিজাত্য ফুটিয়ে তোলা সম্ভব। রানওয়েতে এ রঙের সঙ্গে সাদা ক্রিম কিংবা হালকা নীলের পাশাপাশি চকলেট ব্রাউনের মতো রঙের চমৎকার সমন্বয় সবার নজর কেড়েছে।
জনপ্রিয়তার নেপথ্যে
এই ট্রেন্ডের এমন অভাবনীয় জনপ্রিয়তার পেছনে রয়েছে গভীর মনস্তাত্ত্বিক ও অর্থনৈতিক কিছু কারণ। বর্তমান সময়ের বৈরী অর্থনীতি, জীবনযাপনের অতিরিক্ত ব্যয় এবং প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের কারণে চাকরি নিয়ে তৈরি হওয়া দুশ্চিন্তায় মানসিকভাবে অনেকেই বেশ ক্লান্ত ও অবসাদগ্রস্ত। অর্থনীতিবিদদের মতে, আর্থিক চাপ ও মানসিক সংকটের সময়ে মানুষের কেনাকাটার ধরন আরাম ও পরিচিত জিনিসের দিকে বেশি ঝুঁকে পড়ে। অর্থনীতির ভাষায় একে বলা হয় লিপস্টিক ইনডেক্স। সরল অর্থে, মানুষ যখন বড় খরচের হাত থেকে বাঁচতে চায়, তখন ছোট ছোট শৌখিন পণ্য কেনার মধ্যে প্রশান্তি খেঁাজে। রঙ বিশেষজ্ঞদের মতে, এ মাখন-হলুদের মতো উষ্ণ ও স্নিগ্ধ রঙ মানুষের মনে পরম নিরাপত্তা ও যত্নের অনুভূতি তৈরি করে। রঙটি কর্মব্যস্ত দিনের ক্লান্তির বদলে সপ্তাহান্তের অলস সকালের সতেজতার কথাই বেশি মনে করিয়ে দেয়।
তারকাদের প্রথম পছন্দ
আন্তর্জাতিক তারকারা এই স্নিগ্ধ রঙে শুধু মেতেই ওঠেননি; বরং মূলত তারাই একে জনপ্রিয়তার শীর্ষে পৌঁছে দিয়েছেন। মার্কিন পপ তারকা সাবরিনা কার্পেন্টার তার কনসার্ট থেকে শুরু করে বড় বড় ফ্যাশন শো— সব জায়গায় এ রঙের পোশাকে হাজির হয়ে নতুন প্রজন্মের কাছে একে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছেন। অন্যদিকে লন্ডনে শুটিংয়ের ফাঁকে আরেক আমেরিকান তারকা সেলেনা গোমেজকে এ রঙের ঢিলেঢালা প্যান্ট পরতে দেখা গেছে, যা প্রমাণ করে আটপৌরে পোশাকেও রঙটি কতটা মানানসই ও স্বস্তিদায়ক। মার্কিন সুপার মডেল জিজি হাদিদও তার সান্ধ্যকালীন ভ্রমণের জন্য বাটার ইয়েলোর আরামদায়ক প্যান্ট বেছে নিয়েছিলেন। শুধু নারীদের ফ্যাশনে নয়, পুরুষদের মধ্যেও এর রেশ েবশ ছড়িয়ে পড়েছে। হলিউড অভিনেতা টিমোথি শ্যালামের মতো তারকারা অস্কারের আয়োজনে এ রঙের বড় মাপের স্যুট পরে প্রথাগত ফ্যাশন ধারণাকে পুরোপুরি ভেঙে দিয়েছেন এবং প্রমাণ করেছেন— স্নিগ্ধতাও ফ্যাশনের একটি বড় শক্তি হতে পারে।
শুধু পোশাকেই নয়
রূপচর্চার জগতেও বাটার ইয়েলোর বিশাল প্রভাব স্পষ্ট। ভারী মেকআপের বদলে এখন সতেজ ও স্বাভাবিক উজ্জ্বল ত্বকের চল শুরু হয়েছে। মার্কিন মডেল হেইলি বিবারের হাত ধরে এ রঙের নেলপলিশ পরিপাটি লুকের জন্য সারা বিশ্বে দারুণভাবে সমাদৃত। ভারী কন্ট্যুরিং বাদ দিয়ে ত্বকের রঙের সঙ্গে মিলিয়ে হালকা সাজ এখন অনেকেরই প্রথম পছন্দ। প্রতিদিনের লুকের জন্য বাটার ইয়েলোর সঙ্গে সাদা ক্রিম বা হালকা নীল রঙের পোশাক দারুণ মানিয়ে যায়। একটু ভিন্ন ও আকর্ষণীয় লুক তৈরি করতে চাইলে এর সঙ্গে গাঢ় খয়েরি রঙ অনায়াসে ব্যবহার করা যায়।
স্নিগ্ধতার স্টাইল স্টেটমেন্ট
নব্বইয়ের দশকের নস্টালজিয়া এবং বর্তমানের ছিমছাম ট্রেন্ডের দারুণ মেলবন্ধনে বাটার ইয়েলো এখন আন্তর্জাতিক ফ্যাশনের সবচেয়ে শক্তিশালী ও টেকসই একটি নাম। এর উত্থান প্রমাণ করেছে, সবার নজর কাড়তে সবসময় খুব চড়া রঙের পোশাক পরার একদমই দরকার নেই। বরং পরিমিতিবোধ ও স্নিগ্ধতার মাধ্যমেও নিখুঁত আভিজাত্য প্রকাশ করা সম্ভব।




