মেঘবালিকার দিনলিপি

মডেল: মেহজাবীন হোসেন মেধা। ছবি: সাজ্জাদ হোসেন
কৈশোরে একজন মেয়ের শরীর ও মনে ঘটে নানা পরিবর্তন। এর প্রভাবে তার রূপচর্চা, পোশাক-পরিচ্ছদ ও জীবনযাপনে যুক্ত হতে থাকে নতুন ভাবনা ও রুচিবোধ। লিখেছেন রাফেজা বিনতে ঋতু
কৈশোর যেন প্রজাপতির মতো উড়ে উড়ে ঘুরে বেড়ানোর সময়, যেখানে শৈশবের সারল্য আর তারুণ্যের চাঞ্চল্য মিলে তৈরি হয় স্বপ্নিল জগৎ। এ বয়সে মেয়েদের শরীরের পাশাপাশি মনোজগতেও ঘটে গভীর রূপান্তর। হরমোনের প্রভাবে কখনো রোমাঞ্চকর রোদ, কখনো বিষাদের ছায়া, কখনোবা অজানা আশঙ্কা দোলা দেয় মনে। আত্মপরিচয়ের টানাপড়েন ও সংবেদনশীল মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে কিশোরীরা নিজেদের জীবনশৈলী, ফ্যাশন ও রূপচর্চা নিয়ে ভীষণ সচেতন হয়ে ওঠে।
দেহ-মনে ঢেউ
কৈশোরের শুরুতে পিটুইটারি গ্রন্থির প্রভাবে ইস্ট্রোজেন ও প্রোজেস্টেরনের মতো হরমোনের মাত্রা হঠাৎ বেড়ে যায়। এই রাসায়নিক পরিবর্তন শুধু শারীরিক পরিবর্তনই ঘটায় না; মস্তিষ্কের নিউরোট্রান্সমিটারেও প্রচণ্ড প্রভাব ফেলে। ফলে কিশোরীদের মেজাজ যখন-তখন বদলে যায়। এ সময়ে অনেকে বেশ সংবেদনশীলও হয়ে পড়ে। মস্তিষ্কের যে অংশ আবেগ নিয়ন্ত্রণ করে, অর্থাৎ অ্যামিগডালা— তা এ বয়সে বয়ঃপ্রাপ্তি প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যায়। এ কারণে তারা যেকোনো পরিস্থিতি বা আবেগকে প্রাপ্তবয়স্কদের তুলনায় তীব্রভাবে অনুভব করে এবং তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ার ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখা তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। বয়ঃসন্ধিকালে উচ্চতা বৃদ্ধি, শারীরিক গঠন বদলসহ শরীরের দ্রুত পরিবর্তন তাদের মনে অস্বস্তি ও অতিরিক্ত আত্মসচেতনতা সৃষ্টি করে। নিজেদের শারীরিক অবয়বকে অন্যদের সঙ্গে তুলনা করা এবং প্রচলিত মানদণ্ডে নিখুঁত হওয়ার চাপ তাদের আত্মমর্যাদাকে প্রায়ই নাড়া দেয়। শৈশবের নির্ভরতা কাটিয়ে নিজস্ব মতামত, পছন্দ-অপছন্দ এবং একটি স্বতন্ত্র ব্যক্তিত্ব গড়ে তোলার তীব্র তাগিদ অনুভব করে তারা। তাতে অনেক সময় পরিবারের সঙ্গে মানসিক দূরত্ব বাড়ে এবং দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়।
যোগাযোগমাধ্যমের ঝড়
সোশ্যাল মিডিয়ায় ফিল্টার করা ত্বক, নিখুঁত শারীরিক গঠন এবং মানুষের জাঁকজমকপূর্ণ জীবনযাত্রার ছবি ও ভিডিও কিশোরীদের মনে অবচেতনে একটি অবাস্তব মানদণ্ড তৈরি করে। নিজেদের সঙ্গে এর তুলনা করতে গিয়ে তারা প্রায়ই হীনমন্যতায় ভোগে। তা ছাড়া অনলাইন ট্রলিং, বডি শেমিং এবং সাইবার বুলিং কিশোরীদের মানসিক শান্তি তছনছ করে দিতে পারে। ভার্চুয়াল এই চাপ অনেক সময় বাস্তব জীবন থেকে গুটিয়ে নিতে বাধ্য করে তাদের।
মানসিক স্বাস্থ্য ও চ্যালেঞ্জ
হরমোন ও আত্মপরিচয়ের টানাপড়েন অনেক সময় কিশোরীদের মানসিক স্বাস্থ্য ঝুঁকির মুখে ফেলে। পড়াশোনার চাপ, সামাজিক গ্রহণযোগ্যতাজনিত ভয় এবং ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা তাদের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী উদ্বেগ ও বিষণ্ণতা সৃষ্টি করতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় এই পরিবর্তনের সময়কালে কিশোরীদের প্রতি নির্বিচার সমালোচনামূলক আচরণ পরিহার করে বরং অভিভাবকদের উচিত সহানুভূতিশীল ও খোলামেলা যোগাযোগের পরিবেশ গড়ে তোলা। সোশ্যাল মিডিয়ার ভার্চুয়াল নির্ভরতা কমিয়ে বাস্তব জীবনের নানা সৃজনশীল কাজ, খেলাধুলা ও সামাজিক মেলামেশায় তাদের যুক্ত করা জরুরি। মানসিক সুস্থতার জন্য সুষম খাদ্যাভ্যাস ও পর্যাপ্ত ঘুমের মাধ্যমে স্বাস্থ্যকর জীবনধারা নিশ্চিত করার পাশাপাশি দীর্ঘস্থায়ী উদ্বেগ বা বিষণ্ণতার লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত পেশাদার মনোরোগ বিশেষজ্ঞের সহায়তা নিতে হবে।
রূপচর্চার রঙিন ভুবন
সোশ্যাল মিডিয়ার কারণে নিখুঁত চেহারার অবাস্তব মানদণ্ড কিশোরীদের
মনে চাপ বাড়ালেও বর্তমান বিউটি ট্রেন্ডে স্বাভাবিক ত্বকেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করার ওপর
বেশি জোর দেওয়া হচ্ছে। এই ইতিবাচক পরিবর্তন আত্মবিশ্বাস বাড়াতে এবং কৃত্রিমতার বদলে
নিজেদের প্রাকৃতিকভাবে সুন্দর ও অনন্যা হিসেবে মেনে নিতে সাহায্য করছে। বিউটি ট্রেন্ডে
চলছে ভারী মেকআপের যুগ পেরিয়ে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য বা ‘নো-মেকআপ লুক’-এর জয়জয়কার। এই ট্রেন্ড কিশোরীদের জন্য বিশেষভাবে
উপযোগী; কারণ তা ত্বকের নিজস্ব সতেজতা বজায় রাখে এবং অপ্রয়োজনীয় রাসায়নিকের ক্ষতি থেকে
সুরক্ষা দেয়। ট্রেন্ডগুলোর মধ্যে ‘বেয়ার ফেস’ ও ‘অনলি লিপস’-এর জনপ্রিয়তাও বেশ। এর মানে মুখে কোনো ফাউন্ডেশন
বা ভারী মেকআপ না দিয়ে শুধু হালকা লিপবাম বা লিপস্টিক ব্যবহার করা। কিশোরীদের জন্য
এই ট্রেন্ড বেশ কার্যকর। কেননা এ বয়সে হরমোনের কারণে ত্বক বেশ সংবেদনশীল থাকে বলে ভারী
ফাউন্ডেশন বা কনসিলার ব্যবহারে ডার্মাটোলজিস্টরা নিরুৎসাহিত করেন। কারণ, এ ধরনের পণ্য
ত্বকের লোমকূপ বন্ধ করে ব্রণের সমস্যা বাড়িয়ে দেয়। এর বিকল্প হিসেবে টিন্টেড ময়েশ্চারাইজার
বা বিবি ক্রিম ব্যবহারের চল বাড়ছে।
আজকের কিশোরীরা অন্ধভাবে কোনো ট্রেন্ড অনুসরণের বদলে নিজেদের স্বস্তি এবং ব্যক্তিত্ব প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে ফ্যাশনকে বেছে নিচ্ছে
নতুন ট্রেন্ডে চোখের মেকআপেও এসেছে সারল্যের প্রকাশ। ভারী আইলাইনার বা কড়া রঙের আইশ্যাডোর বদলে এখন সময় হালকা আই মেকআপের। চোখের সাজ তাই মৃদু শেডের আইশ্যাডো, সামান্য স্মোকি টাচ কিংবা শুধু একটু মাসকারার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। এ লুকগুলো মুখের স্বাভাবিক স্নিগ্ধতা ফুটিয়ে তোলে এবং প্রতিদিনের ব্যবহারের জন্য বেশ সহজ ও স্বস্তিকর।
সঠিক রুটিন
এ সময়ের ট্রেন্ডের সবচেয়ে ভালো দিক হলো, মেকআপ দিয়ে খুঁত ঢাকার বদলে ত্বকের যত্নের প্রতি বেশি গুরুত্ব দেওয়া। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘স্কিনফ্লুয়েন্সারদের’ কনটেন্ট থেকে কিশোরীরা বিষয়টি ভালোভাবে রপ্ত করছে। ডার্মাটোলজিস্টদের মতে, কিশোরীদের ত্বকের যত্নে অ্যাকটিভ ইনগ্রেডিয়েন্ট ব্যবহারের তেমন প্রয়োজন নেই। কারণ, এ বয়সে ত্বক ও চুল প্রাকৃতিকভাবেই স্বাস্থ্যোজ্জ্বল ও সংবেদনশীল থাকে। হরমোনাল অ্যাকনে বা রোজেসিয়ার মতো সমস্যা দেখা দিলে চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
চুলের যত্ন
চুল ভালো রাখতে অতিরিক্ত কেমিক্যালযুক্ত প্রসাধনী এড়িয়ে নিয়মিত তেল ম্যাসাজ, মানসম্মত শ্যাম্পু এবং মাঝেমধ্যে হালকা হেয়ার মাস্ক ব্যবহার করাই যথেষ্ট। এ সময়ে চুলে কালার বা ব্লিচ করা পুরোপুরি এড়িয়ে চলা ভালো। তবে খুব ইচ্ছা করলে অবশ্যই কোনো ভালো পার্লার বা এক্সপার্টের কাছে গিয়ে ভালোমানের পণ্য দিয়ে কালার করানো উচিত।
ফ্যাশনের ফিরিস্তি
কিশোরীদের নিজস্বতা প্রকাশের অন্যতম বড় মাধ্যম হলো ফ্যাশন। এর চর্চা তারা করে নানা নিরীক্ষার মধ্য দিয়ে। এ সময়ে অনেকেই ট্রেন্ড নিয়ে সচেতন থাকে। ট্রেন্ডি পোশাকের ভিড়ে কেউ কেউ নিজস্ব স্টাইলও দাঁড় করিয়ে ফেলে। বাংলাদেশে এখন কিশোরীদের ফ্যাশনে আরাম, স্বকীয়তা ও আধুনিকতার দারুণ মেলবন্ধন দেখা যাচ্ছে। আজকের কিশোরীরা অন্ধভাবে কোনো ট্রেন্ড অনুসরণের বদলে নিজেদের স্বস্তি এবং ব্যক্তিত্ব প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে ফ্যাশনকে বেছে নিচ্ছে। এই পরিবর্তনের পেছনের প্রেক্ষাপট ও বৈশ্বিক প্রভাব সম্পর্কে ফ্যাশন ব্র্যান্ড ‘লেবেল ইমাম হাসান’-এর কর্ণধার ও নকশাকার ইমাম হাসান বললেন, ‘জলবায়ুর পরিবর্তন, সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাবের ওপর নির্ভর করে বৈশ্বিক ফ্যাশনে এখন যে ট্রেন্ড যেভাবে চলছে, তার প্রভাব বাংলাদেশেও পড়ছে। বিশেষ করে আমাদের দেশে কিশোরীরা স্বাচ্ছন্দ্য ও আরামের কথা মাথায় রেখে পোশাক নির্বাচন করে। তারা একটু ওয়েস্টার্ন কালচার ফলো করে; যেমন টি-শার্ট ও প্যান্টকে প্রাধান্য দেয়। এ ছাড়া দেশীয় পোশাকে বেশ মডার্ন স্টাইলে শাড়ি পরার প্রবণতাও তাদের মধ্যে রয়েছে।’
ট্রেন্ডের নস্টালজিয়া
চলতি শতকের শুরুর দশকের ফ্যাশন বা ওয়াইটুকে স্টাইল নতুন আঙ্গিকে জীবনে ফিরে এসেছে। তবে হুবহু নয়; বরং আধুনিকতার ছোঁয়ায় এগুলো এখন আরও পরিপক্ব। যেমন শর্ট কামিজ ও কুর্তার কথাই বলা যাক। সেই দশকে এদেশের নারীদের মধ্যে শর্ট কামিজ ও জিনস প্যান্টের যুগ শুরু হয়েছিল। অন্যদিকে, বর্তমান কিশোরীদের কাছে শর্ট কুর্তা ভীষণ জনপ্রিয় ক্যাজুয়াল ওয়্যার, যা জিনস প্যান্ট বা ঢিলেঢালা পালাজ্জোর সঙ্গে পরা হয়। ট্র্যাডিশনাল বা উৎসবের পোশাকে একসময়ের জনপ্রিয় ফারসি সালোয়ার, পাতিয়ালা বা ঘেরওয়ালা কাটের সালোয়ার-কামিজ নতুনভাবে ফিরে এসেছে। ইমাম হাসানের মতে, আন্তর্জাতিক ফ্যাশন থেকে আসা বোহেমিয়ান ও ট্রপিক্যাল স্টাইলের প্রতিও আগ্রহ দেখা যাচ্ছে। এমনকি সালোয়ার-কামিজেও এই স্টাইল মেনে চলা হচ্ছে। যেমন কুর্তি বা কামিজে বিভিন্ন প্রিন্ট ও ফিতার ব্যবহার চলছে।
বোহেমিয়ান স্টাইল ও অ্যাকসেসরিজ
চলতি টিন গার্ল ফ্যাশনের বড় অংশ জুড়ে রয়েছে বোহেমিয়ান বা বোহো স্টাইল। ঢিলেঢালা সিলুয়েট, ফ্লোরাল প্রিন্ট ও আর্থি কালারের পাশাপাশি এই স্টাইলের প্রভাব জুয়েলারি ও ব্যাগেও স্পষ্ট। ইমাম হাসান বললেন, ‘ব্যাগ জুয়েলারির ক্ষেত্রেও বোহেমিয়ান স্টাইল প্রাধান্য পাচ্ছে। কিশোরীরা জুয়েলারি ও অ্যাকসেসরিজ বেশ পছন্দ করে। এক্ষেত্রে আমাদের দেশের কিশোরীদের দেশীয় গয়না পরার প্রতি আগ্রহ বেশি দেখা যায়। অন্যান্য অনুষঙ্গের মধ্যে রয়েছে চুলের ক্লিপ বা ফিতা, হ্যাট, বেল্ট। দেখা যায়, পোশাক বেশ সাদামাটা থাকলেও জুয়েলারি বা অ্যাকসেসরিজ কালারফুল করে একটি ফ্যাশনেবল লুক তৈরি করছে তারা।’
টেকসই তত্ত্ব
ফ্যাশন শুধু বাহ্যিক সৌন্দর্য নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে সময় ও পরিবেশের বাস্তবতা। বিশ্ব জুড়ে সাসটেইনেবল ফ্যাশনের বিপ্লব চলছে। এর প্রভাব এখানেও আছে। অনেক কিশোরী এখন টেকসই ফ্যাশনের চর্চা করছে।
সব মিলিয়ে ঐতিহ্য, স্বাচ্ছন্দ্য ও বৈশ্বিক সচেতনতার চমৎকার মিশ্রণেই গড়ে উঠেছে বর্তমানের মেঘবালিকাদের জীবনশৈলী।






