গৃহ সজ্জা
অন্দরে রঙবাহার

মডেল: সংগীতশিল্পী রত্না দাস; ছবি: সাজ্জাদ হোসেন
আকাশে মেঘের ভেলা, জমিনে কাশফুলের দোলা আর বাতাসে ঢাক-কাঁসরের আওয়াজ। এই রেশে ঘর সাজানোর উপায় জানাচ্ছেন প্রিয়াঞ্জলি রুহি
পূজা এলে ঘরের ভেতরটাও একটু বদলে যায়। উঠোনে শিউলি আর সন্ধ্যার আকাশে উৎসবের রঙ— তার সামান্য ছোঁয়াও যদি অন্দরে রাখা যায়, ঘর হয়ে ওঠে অন্যরকম। নতুন আসবাব নয়; পরিচিত উপকরণের নতুন বিন্যাস, কিছু ফুল, একটু আলো আর কাঠ-মাটির গন্ধেই তৈরি হতে পারে পূজার অন্দর।
দরজায় অভ্যর্থনায়: উৎসবের আবহ শুরু হোক ঘরে ঢোকার আগেই। দরজার সামনে ছোট্ট আলপনা, দুপাশে মাটির প্রদীপ কিংবা একটি পিতলের পাত্রে গাঁদা বা গোলাপের পাপড়ি রাখতে পারেন। অথবা মাটির পাত্রে পানি দিয়ে তাতে ফুল ছড়িয়ে মাটির প্রদীপ বসিয়ে দিলেও সই। খুব বড় আয়োজনের প্রয়োজন নেই। বরং সামান্য ফাঁকা রেখে সাজালে প্রতিটি উপকরণই আলাদা করে চোখে পড়বে। দরজায় ফুলের মালা ঝোলাতে চাইলে গাঁদার সঙ্গে সাদা ফুল মেলানো যায়। চাইলে শোলার বা শুকনো ফুল, পাটের দড়ি কিংবা বেতের ছোট ঝুড়িও ব্যবহার করতে পারেন।
ঘরে শরতের রেশ: শরতের রঙ অন্দরে আনতে সব পর্দা, আসবাব বদলানোর দরকার নেই। সাদা, মেটে, হলুদ, গেরুয়া কিংবা সবুজ রঙের দু-একটি কুশন, টেবিল রানার বা কাপড়ের আচ্ছাদনই যথেষ্ট। সাদা ঘরে গেরুয়া বা হলুদের উজ্জ্বল ছেঁায়া যেমন সুন্দর, তেমনি কাঠের আসবাবের পাশে টেরাকোটার টেঁপা পুতুল, হাতি, ঘোড়া বা অন্যান্য শোপিস ঘরকে করে তুলবে নান্দনিক।
আলোর খেলা: সন্ধ্যায় গৃহসজ্জায় আলো দিয়েই বাজিমাত করা সম্ভব। ধবধবে সাদার বদলে ঘরের কয়েকটি জায়গায় জ্বালাতে পারেন হলদে আলোর ছোট বাতি। জানালার পাশে একটি লণ্ঠন, সেন্টার টেবিলে দু-একটি প্রদীপ, বুকশেলফের ওপর ছোট বাতি— এভাবেই তৈরি হতে পারে আলো-ছায়ার জাদু। পিতল, কাঁসা বা পোড়ামাটির পাত্র ব্যবহার করলে প্রদীপের আলো আরও সুন্দর ও নস্টালজিক হয়ে উঠবে।
কাঠের আসবাবের পাশে টেরাকোটার টেঁপা পুতুল, হাতি, ঘোড়া বা অন্যান্য শোপিস ঘরকে করে তুলবে নান্দনিক
ফুলেল সজ্জা: ফুলে ফুলে ঘর সাজালে শুধু অতিথি নয়; বাড়ির বাসিন্দার মনেও ছড়াবে সৌরভ। কয়েকটি শিউলি একটি ছোট পিতলের রেকাবিতে, গাঁদা ফুল মাটির পাত্রে কিংবা রজনীগন্ধা লম্বা কাচের ফুলদানিতে রাখতে পারেন। একই ঘরে অনেক ধরনের ফুল না রেখে দু-একটিকে প্রাধান্য দেওয়া ভালো।
আলপনা: আলপনা বাঙালির গৃহসজ্জায় আনে আলাদা নন্দন। পূজার জায়গার সামনে ছোট একটি পদ্ম, দরজার পাশে কয়েকটি রেখা, বারান্দার কোণে শঙ্খ কিংবা প্রদীপের নকশা— এটুকুতেই গৃহকোণ সেজে উঠবে উৎসবের সৌন্দর্যে। আলপনা করতে পারেন নিজেরাই; নিখুঁত না হলেও ক্ষতি নেই। বরং হাতে আঁকা অমসৃণ রেখাতেই উৎসব পাবে ভিন্নমাত্রা।
পুরনোতে সমাধান: পিতলের থালা, কাঁসার বাটি, পুরনো কাঠের পিঁড়ি, মাটির কলস কিংবা ঠাকুমার সময়ের ফুলদানি— যে জিনিসগুলো সারা বছর অগোচরে থাকে, উৎসবে সেগুলোই হয়ে উঠতে পারে সাজের কেন্দ্র। একটি পিতলের থালায় ফুল ও প্রদীপ সাজিয়ে রাখতে পারেন। কাঠের পিঁড়ির ওপর থাকতে পারে মাটির পাত্র। পুরনো আর নতুনের এ মেলবন্ধন ঘরে আনবে উৎসবের মায়া। এ ছাড়া ঘরের ছোট্ট কোনো জায়গাকে উৎসবের জন্য নির্দিষ্ট করতে পারেন। সেটি হতে পারে কোনো জানালা, যার পাশে পিঁড়ি, তার ওপর ফুল, প্রদীপ, একটি ছোট শিল্পকর্ম বা প্রিয় বই রাখা যেতে পারে। পাশে মাটির পাত্র কিংবা বেতের ঝুড়ি। এ এতটুকু জায়গার পক্ষেই পরিবারের গল্প, ছবি আর স্মৃতির ছোট্ট কোণ হয়ে ওঠা সম্ভব। পূজার ছুটিতে সেখানে বসে বই পড়া, গান শোনা কিংবা বিকালের চায়ের আসর জমবে বেশ।
খাবারের টেবিলে: ডাইনিং টেবিলের মাঝখানে বড় ফুলের তোড়া না রেখে একটি নিচু পাত্রে ফুল ও কয়েকটি প্রদীপ রাখতে পারেন। এতে টেবিলের মাঝখানটা খোলা থাকবে; কথাবার্তা ও খাবার পরিবেশনেও অসুবিধা হবে না। কাঁসা বা মাটির ছোট বাটিতে মিষ্টি, ফল কিংবা শুকনো খাবার রাখলেও টেবিলে পড়বে বাঙালিয়ানার ছাপ।
বারান্দায় সান্ধ্য আসর: বারান্দার মেঝেতে ছোট গালিচা, দু-একটি কুশন, পাশে টবে থাকা গাছ আর একটি মাটির প্রদীপ— এটুকুই যথেষ্ট। সূর্যের আলো নিভে এলে শহুরে কোলাহলের ভিড়ে বারান্দায় একটি ছোট প্রদীপ জ্বলে উঠলে মনে হবে, উৎসব নিজেই এসে পাশে বসে পড়েছে!



