সম্পর্ক
স্বামী-স্ত্রীরও চাই আলাদা সময়

মডেল: উম্মে মারিয়াম ও শামছুল আলম; পোশাক: টুয়েলভ; সাজ: অরা বিউটি লাউঞ্জ; ছবি: আশরাফুল আলম
সংসার শুধুই দায়িত্বের বেড়াজাল নয়, বরং স্বামী-স্ত্রী দুজনেরই থাকা চাই নিজস্ব একটা আকাশ। চাই সেই মুক্ত আকাশে ইচ্ছামতো ডানা মেলার স্বাধীনতা। লিখেছেন নাহিদ ইসলাম
বিয়ের পর দুজন মানুষ যখন এক ছাদের নিচে থাকে, তাদের জীবন যেন বাঁধা পড়ে এক সুতোয়। বিয়ের আগে দুজন হয়তো সম্পূর্ণ আলাদা মানুষ ছিলেন। দুজনেরই নিজস্ব কিছু ভালো লাগা ছিল। বিয়ের পর দুটি আলাদা পৃথিবী এক হয়ে যায়। শুরু হয় সংসার নামের এক নতুন অধ্যায়। সেখানে দুজনের ভালো লাগা, খারাপ লাগাগুলো মিশে যেতে থাকে। কিন্তু বাস্তব জীবনে সবসময় ছায়ার মতো লেগে থাকার কোনো প্রয়োজন নেই। ভালোবাসা মানে দুজনকে একই কাজ করতে হবে, সব মত এক হতে হবে, আলাদা করে নিজের মতো থাকা যাবে না এমন নয়। বরং এতে করে সবসময় নিজের পছন্দ-অপছন্দ আরেকজনের সঙ্গে মিলিয়ে করতে গেলে নিজেদের অজান্তেই মনের ভেতর এক ধরনের ক্লান্তি চলে আসতে পারে। ছুটির দিনের কোনো এক অলস দুপুরে একজন হয়তো গল্পের বই পড়ছে। অন্যজন তখন নিজের মতো করে পুরনো কোনো গান শুনছে। কেউ কারও কাজে বাধা দিচ্ছে না। এই যে নিজের মতো করে কাটানো সময়টুকু, এটাই সম্পর্কের অক্সিজেন।
ঢাকা মেডিকেল কলেজের মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ড. রাইসুল ইসলাম পরাগ বলেছেন, স্বামী ও স্ত্রীর সম্পর্কের মাঝে কিছুটা আলাদা সময় পাওয়া খুবই জরুরি। এতে একজন মানুষ নিজের মতো করে ভাবনার সুযোগ পান। সবসময় একে অন্যের সঙ্গে তাল মেলাতে থাকলে মনের ওপর একধরনের চাপ তৈরি হতে পারে। মানুষের নিজস্ব সত্তা ধীরে ধীরে ম্লান হতে থাকে। আলাদা সময় না পেলে আমরা মানসিক ক্লান্তি ও হতাশায় ভুগি। তখন নিজের অজান্তেই ছোটখাটো বিষয় নিয়ে ভুল বোঝাবুঝি সৃষ্টি হয়। নিজের শখ বা পছন্দের কাজে কিছুটা সময় দিলে মানসিক স্বাস্থ্য ভালো থাকে। এতে দুজনের মধ্যে আকর্ষণ আরও সুন্দরভাবে টিকে থাকে। নিজের জন্য কিছুটা সময় বের করতে পারলে মন থেকে বিষণ্নতা একদম দূর হয়ে যায়।
ভালোবাসার এ দর্শনে একটি সুন্দর কথা প্রচলিত আছে। ভবনের ছাদ ধরে রাখার জন্য দুটি স্তম্ভকে একটু দূরে দূরেই দাঁড়াতে হয়। ওক আর সাইপ্রাস গাছ কখনো একে অন্যের ছায়ায় বেড়ে উঠতে পারে না। খুব কাছাকাছি থাকলে একটা গাছের ছায়ায় অন্য গাছটি পর্যাপ্ত আলো পায় না। তখন সেই গাছটির স্বাভাবিক বৃদ্ধি আটকে যায়। দাম্পত্যের বেলাতেও এ কথা ভীষণ সত্যি। অনেকেই মনে করেন, শুধু পুরুষদেরই আলাদা সময় বা বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডার দরকার আছে। নারীদের কোনো ব্যক্তিগত পৃথিবী থাকতে পারে না। সারা দিন সংসারের কাজ আর সবার মন জোগাতেই তাদের সময় ফুরায়। তাদের নিজস্ব প্রতিভা বা ইচ্ছাগুলো এভাবেই একসময় আড়ালে চলে যায়। কিন্তু এখন সময় বদলেছে। নারীরা এখন সচেতন। তারা নিজেদের জন্য আলাদা সময় চাইছেন। এ চাওয়াটা কোনো অপরাধ নয়। বরং এটি তাদের মানসিক সুস্থতার জন্য খুব জরুরি। নিজেদের চাওয়াগুলো অপূর্ণ থাকলে মনের ভেতর একধরনের অভিমান জমতে পারে। তাই ভালো দাম্পত্যে দুজনেরই ব্যক্তিগত বিকাশের সুন্দর সুযোগ থাকা চাই।
গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক নুসরাত শারমিন এ বিষয়ে বললেন, দাম্পত্যে এই আলাদা সময়টুকু কোনোভাবেই দূরত্ব তৈরি করে না। বরং সম্পর্ক সুস্থ রাখার একটা বড় উপাদান হলো নিজের সঙ্গে সময় কাটানো। নিজের জন্য কিছুটা সময় পেলে মানুষ মানসিকভাবে সতেজ হয়। এতে মানসিক চাপ কমে এবং নিজের স্বাতন্ত্র্য বজায় থাকে। অতিরিক্ত মানসিক দূরত্ব যেমন সম্পর্কের জন্য ভালো নয়, তেমনি সবসময় একসঙ্গে থাকার ধারণাও স্বাস্থ্যকর নয়। দাম্পত্যে মান-অভিমান হওয়া খুব স্বাভাবিক। পরিস্থিতি কিছুটা উত্তপ্ত হলে একটুখানি নীরব থাকা ভালো। সঙ্গীর সারা দিনের ক্লান্তি আর ব্যস্ততার মূল্য দিতে হবে। দিনভর ঘরের কাজ সেরে কিংবা অফিস থেকে ফিরে আপনার সঙ্গী একটু শান্ত হয়ে বসতে চান। তখন তাকে সেই সুযোগটুকু দেওয়া উচিত। ভালোবাসা মানে একে অন্যকে বেঁধে রাখা নয়। ভালোবাসার মানুষকে তার নিজের মতো ডানা মেলতে দেওয়াটাও একধরনের গভীর প্রেম। এতে সম্পর্কের সুতো আরও অনেক বেশি মজবুত হয়।
টিপস
- দুজনের প্রয়োজন আর ভালো লাগা নিয়ে একে অন্যের সঙ্গে হাসিমুখে কথা বলুন
- দিনের শুরুতে বা শেষে কিছুটা সময় একান্তই নিজের জন্য বরাদ্দ রাখুন
- একা বই পড়া বা গান শোনার মতো নিজের শখ পূরণে আনন্দ নিয়ে সময় কাটান
- মান-অভিমানের সময়গুলোতে একে অন্যের প্রতি সম্মান বজায় রাখুন




