কাসেম স্যারের সঙ্গে শেষ স্মৃতি

প্রয়াত প্রাবন্ধিক, রাষ্ট্রচিন্তাবিদ ও অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক । ছবিঃ সাজ্জাদ হোসেন
গতকাল প্রয়াত হন প্রাবন্ধিক, রাষ্ট্রচিন্তাবিদ ও অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক। গত ২ জুলাই ২০২৬ তারিখে আগামীর সময়ের ‘তিনি বললেন’ বিভাগে তার একটি পূর্ণ পৃষ্ঠার সাক্ষাৎকার ছাপা হয়। তার সঙ্গে কাটানো শেষ মুহূর্ত ও সাক্ষাৎকারের অপ্রকাশিত কথামালার স্মৃতি রোমন্থন রইল পাঠকদের জন্য।
১৭ মে ২০২৬। বরেণ্য রাষ্ট্রচিন্তাবিদ অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক স্যারের একটি সাক্ষাৎকার নেওয়ার জন্য আমি আর আলোকচিত্রী সাজ্জাদ হোসেন মিরপুর পল্লবীর উদ্দেশে রওনা হই। সেদিন পল্লবী স্টেশনের দুই পাশেই ‘বি-ব্লক’ থাকায় স্যারের ঠিকানা খুঁজতে আমাদের বেশ বিড়ম্বনায় পড়তে হয়েছিল। কাঠফাটা রোদে গলিতে গলিতে ঘুরপাক খেয়ে যখন আমরা ক্লান্ত, তখন ফোনে স্যারের সহধর্মিণী, ফরিদা প্রধানের পরম মমতায় দেওয়া নির্দেশনায় বাড়িটি খুঁজে পাই।
কনভেনশন সেন্টারের পেছনের গলিতে অকালে হারানো সন্তানের নামে রাখা বাড়িটি ছিল অসম্ভব স্নিগ্ধ। দোতলায় উঠে অবাক হয়ে দেখলাম, আমাদের যেন এতটুকুও কষ্ট না হয়, তাই স্যার আগেই দরজা খুলে রেখেছেন! ভেতরে পা রাখতেই পুরনো বইয়ের একটা অদ্ভুত সুন্দর ঘ্রাণ আমাকে ছুঁয়ে গেল। ফ্লোর থেকে ছাদ পর্যন্ত বইয়ের বিশাল তাক, অসংখ্য ক্রেস্ট আর ফ্রেমে বন্দি পারিবারিক স্মৃতির মধ্যে সাদা শার্ট ও চশমা পরে বসে আছেন তিনি। দেয়ালে থাকা তরুণ বয়সের একটি দীপ্তিময় ছবির দিকে তাকিয়ে তিনি নিজেই একসময় মুচকি হেসে আমাকে বলেছিলেন, ‘আর সেই দিন... এখন তো কত সময় চলে গেছে জীবনের।’ আলাপের মাঝখানেই আমাদের জন্য খাবার এলো। অত্যন্ত আপনজনের মতো স্যার হঠাৎ আমাকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, ‘শুধু ইন্টারভিউ নিলে হবে? খাবার তো ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে। আগে খাবার শেষ করেন।’ চা আর বিস্কুট খেতে খেতে স্যারের এই অকৃত্রিম আতিথেয়তা আমাকে সেদিন ভীষণ মুগ্ধ করেছিল। সেদিন স্যারের সেই ছিমছাম পরিপাটি ঘরে বসে আলাপের ফাঁকে তিনি আমাকে নিয়ে গিয়েছিলেন তার শৈশবে।
১৯৫২ সাল, তিনি তখন কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া হাই মাদ্রাসার প্রাইমারি সেকশনে চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র। একদিন স্কুলে গিয়ে দেখলেন, ছাত্ররা ক্লাস বর্জন করে বিশাল এক জামগাছের ছায়ায় মিটিং করছে। ঢাকায় রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে আন্দোলনরত ছাত্রদের ওপর নুরুল আমিনের পুলিশ গুলি চালিয়েছে। কিশোরগঞ্জ কলেজ থেকে আসা দুই ছাত্র সেদিন বক্তৃতা দিয়ে রাষ্ট্রভাষার গুরুত্ব বুঝিয়েছিলেন। ছোট্ট ফজলুল হকও সেদিন থানা, হোসেন্দী হাই স্কুল ও লক্ষ্মীয়া হাই স্কুল ঘুরে বের হওয়া মিছিলে পা মিলিয়েছিলেন। তার শিশু কণ্ঠেও ধ্বনিত হয়েছিল, ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই, নুরুল আমিনের কল্লা চাই’। সেদিনই তার শিশুমনে প্রোথিত হয়েছিল বাঙালি জাতীয়তাবাদের অবিনাশী বীজ। তিনি প্রথম উপলব্ধি করেছিলেন, পাকিস্তানি জাতীয়তাবাদের চেয়ে বাঙালি জাতীয়তাবাদের শিকড় অনেক গভীরে এবং আমাদের ঐতিহ্য অনেক উন্নত।
শৈশবের সেই দিনগুলোর পর তার স্মৃতির দুয়ারে কড়া নাড়ে ব্যক্তিজীবনের আরেক বিষাদময় অধ্যায়— তার একমাত্র ছোট ভাইয়ের কথা। স্যারের চেয়ে ছয় বছরের ছোট সেই ভাইটি অত্যন্ত মেধাবী ছিলেন। ইন্টারমিডিয়েট পাসের পর ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে এসে তিনি মৃগী রোগে আক্রান্ত হন। হঠাৎ মুখে ফেনা তুলে পড়ে যাওয়া, শরীরে কাঁপুনি— এসব নিয়ে ভাইটি অবর্ণনীয় কষ্ট পেতেন। তৎকালীন ঢাকার বিখ্যাত সব নিউরোলজিস্ট জানিয়েছিলেন, এ রোগ শতকরা মাত্র দু-একজন মানুষের সারে। অতিরিক্ত ওষুধের প্রভাবে ধীরে ধীরে ভাইটির স্মৃতিশক্তি লোপ পায় এবং শরীর জীর্ণ হয়ে পড়ে। দীর্ঘ সময় তিনি বাবা-মায়ের পর স্যারের ছায়াতেই ছিলেন। এক বুক যন্ত্রণা নিয়ে ২০০৪ সালে প্রায় ৮০ বছর বয়সে পৃথিবী থেকে বিদায় নেন তিনি। সন্তান দীপনের মৃত্যুশোকের আড়ালে একজন স্নেহশীল বড় ভাইয়ের বুকের ভেতরের এই না-বলা দীর্ঘশ্বাসের গল্পটি আমাকে প্রবলভাবে নাড়া দিয়েছিল।
জ্ঞানের গভীরতা তাকে কতটা নির্মোহ করেছিল, তা ফুটে উঠেছিল জীবনদর্শন নিয়ে তার নিজস্ব ভাবনায়। ছোটবেলা থেকেই তিনি জীবন ও জগৎ নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করতেন। ধর্ম নিয়ে ভাবতে গিয়ে তিনি একসময় সিদ্ধান্তে পৌঁছেছিলেন যে, ধর্মের অলৌকিক বিষয়গুলো যুক্তিতে টেকে না। তবে ধর্মে মানুষের জীবনযাপনের যে নৈতিক প্রণালি দেওয়া আছে, তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নৈতিকতার এই ভয় না থাকলে মানুষ হয়তো ধর্মই মানত না। তবে পরিবেশের সঙ্গে মানুষের জীবনযাত্রা বদলায়, তাই কোনো নিয়মই চিরন্তন হতে পারে না। এই স্বাধীন চিন্তার কারণে তিনি মানসিকভাবে ‘ধর্মভাবমুক্ত’ হয়েছিলেন ঠিকই, কিন্তু কখনোই কারও বিশ্বাসে আঘাত দেননি। তিনি বিশ্বাস করতেন, সবার চিন্তার জগৎ আলাদা; মতভিন্নতা থাকবেই, কিন্তু সবাইকে একে অন্যের ক্ষতি না করে একত্রে মিলেমিশে বসবাস করতে হবে এবং প্রয়োজনে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে ঐকমত্যে পৌঁছাতে হবে।
আজ তিনি আর আমাদের মাঝে নেই। কিন্তু তার সেই সাজানো ঘর, অকৃত্রিম আতিথেয়তা, সহজ-সরল জীবনযাপন আর না-বলা গল্পগুলো আমার হৃদয়ে চিরস্থায়ী হয়ে আছে। ওপারে ভালো থাকবেন স্যার।






