বাংলাদেশে তাপমাত্রা কি ৫৫ ডিগ্রিতে পৌঁছাবে?

ছবি: আগামীর সময়
গ্রীষ্মের তীব্র তাপপ্রবাহের মাঝেই নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়েছে সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া একটি দাবি। সম্প্রতি ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়েছে একটি তথাকথিত ‘সতর্কবার্তা’, যেখানে দাবি করা হচ্ছে-আগামী ২৯ এপ্রিল থেকে ১২ মে পর্যন্ত দেশে তাপমাত্রা ৪৫ থেকে ৫৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছাতে পারে। ‘বেসামরিক প্রতিরক্ষা অধিদপ্তর’-এর নামে প্রচারিত এই বার্তায় নাগরিকদের নির্দিষ্ট সময় ঘরে থাকার পরামর্শ, বিভিন্ন জিনিস ব্যবহারে সতর্কতা এবং স্বাস্থ্যঝুঁকির কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
কিন্তু অনুসন্ধান বলছে, বাস্তবতার সঙ্গে কোনো মিল নেই এই বার্তার ।
ভাইরাল পোস্টগুলোতে ‘উচ্চ সতর্কতা জারি’ দেখিয়ে বলা হয়েছে-সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত বাইরে না যেতে, গ্যাস, বিদ্যুৎ, যানবাহন ও মোবাইল ব্যবহারে সাবধান থাকতে। এমনকি কিউমুলাস মেঘের কারণে শ্বাসকষ্ট বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কার কথাও তুলে ধরা হয়েছে। ভাষার ধরন ও উপস্থাপনায় বার্তাটি এমনভাবে সাজানো হয়েছে, যা সহজেই তৈরি করতে পারে সাধারণ মানুষের মনে ভয় ও বিভ্রান্তি ।
একই বার্তা বিভিন্ন ছবি ও লেখার মাধ্যমে অসংখ্য ফেসবুক গ্রুপ ও পেজে ছড়িয়ে পড়ে, যেখানে অনেক ব্যবহারকারী বিষয়টি শেয়ারও করেছেন সত্য ভেবে ।
প্রশাসনিক অসঙ্গতি
অন্যদিকে, প্রশাসনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক দিক থেকেও এই দাবির সঙ্গে বাস্তবতার অসঙ্গতি স্পষ্ট। কী-ওয়ার্ড অনুসন্ধানে ‘বেসামরিক প্রতিরক্ষা অধিদপ্তর’ নামে বর্তমানে বাংলাদেশে অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি কোনো সক্রিয় সরকারি সংস্থার। অতীতে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের পুরোনো নামের সঙ্গে এ ধরনের শব্দের মিল থাকলেও, প্রতিষ্ঠানটি আবহাওয়া সংক্রান্ত সতর্কতা জারি করার দায়িত্বপ্রাপ্ত নয়।
বরং এ বিষয়ে বিভ্রান্তি দূর করতে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স তাদের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজে স্পষ্ট জানিয়েছে- ২৯ এপ্রিল থেকে ১২ মে কিংবা ২৫ মে থেকে ৪ জুন পর্যন্ত তাপমাত্রা বৃদ্ধি সংক্রান্ত কোনো বার্তা প্রচার করেনি তারা। এমন তথ্য থেকে বিভ্রান্ত না হওয়ার জন্যও সতর্ক করা হয়েছে সবাইকে।
অন্যদিকে, বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের ওয়েবসাইট ও অফিসিয়াল ফেসবুক পেজেও এমন কোনো সতর্কবার্তার তথ্য নেই। এ সংক্রান্ত কোনো প্রতিবেদন প্রকাশিতও হয়নি দেশের নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যমগুলোতে ।
তাপমাত্রার অবাস্তব দাবি
জলবায়ুগত বাস্তবতা বিবেচনায়ও দাবিটি প্রশ্নবিদ্ধ। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের ১৮ মে রাজশাহীতে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৪৫ দশমিক ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করা হয়েছিল। এটিই এখন পর্যন্ত দেশের নথিভুক্ত ইতিহাসের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা। সাম্প্রতিক বছরগুলোতেও তাপমাত্রা সাধারণত ৪০-৪৩.৮ ডিগ্রির ঘরেই সীমাবদ্ধ থেকেছে। এই প্রেক্ষাপটে হঠাৎ করে ৫৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছানোর সম্ভাবনা অত্যন্ত অস্বাভাবিক বলে বিবেচিত হয়।
সব মিলিয়ে দেখা যায়, আলোচিত ‘সতর্কবার্তা’টি প্রশাসনিক অসঙ্গতি, বৈজ্ঞানিক অযৌক্তিকতা এবং যাচাইবিহীন তথ্যের সমন্বয়ে তৈরি একটি বিভ্রান্তিকর প্রচারণা। একই সঙ্গে কিউমুলাস মেঘকে ঘিরে শ্বাসকষ্টের দাবিটিও কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি ছাড়াই উপস্থাপন করা হয়েছে।
সুতরাং নিশ্চিত হওয়া যায়-‘২৯ এপ্রিল থেকে ১২ মে পর্যন্ত তাপমাত্রা ৪৫ থেকে ৫৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছাবে’-এমন দাবি সম্পূর্ণ ভুয়া। একইসঙ্গে, কিউমুলাস মেঘের কারণে শ্বাসকষ্ট বাড়ার কথাও ভিত্তিহীন।


