আবু সাঈদের ‘দেহ’ ৬-৭ ঘণ্টা লুকিয়ে রাখার দাবিটি বিভ্রান্তিকর

ছবি: আগামীর সময়
সম্প্রতি জুলাই অভ্যুত্থানে শহীদ আবু সাঈদের মৃত্যুকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি বিভ্রান্তিকর দাবি ও পোস্ট ছড়িয়ে পড়েছে। পোস্টগুলোতে তার মৃত্যুর সনদ বা প্রমাণের ছবি যুক্ত করে দাবি করা হয়—আবু সাঈদকে দুপুর ১টা থেকে ২টার দিকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় দেখা গেলেও, মৃত্যুর প্রমাণের তথ্যানুযায়ী তাকে রাত ৮টা ৫ মিনিটে ‘Brought Dead’ (মৃত অবস্থায় আনা হয়েছে) হিসেবে হাসপাতালে আনা হয়।
এই সময়ের দীর্ঘ ব্যবধানকে কেন্দ্র করে দাবি করা হচ্ছে, মাঝের ৬ থেকে ৭ ঘণ্টা তাকে কোথায় রাখা হয়েছিল তা প্রকাশ পেলেই মৃত্যুর আসল রহস্য বের হবে। নিষিদ্ধ সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানীসহ বেশ কিছু আইডি থেকে পোস্টটি শেয়ার করতে দেখা যায়।
এছাড়া ‘নতুনধারা বাংলাদেশ’-এর সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান শান্তা ফারজানাও অভিযোগ করেন যে, আবু সাঈদকে পুলিশের গুলিতে আহত হওয়ার তিন ঘণ্টা পর হাসপাতালে নেওয়া হয় এবং ওই সময়ের মধ্যে তার বন্ধুরা তাকে হত্যা করে হাসপাতালে নিয়ে যান।
তবে অনুসন্ধানে দেখা গেছে, আবু সাঈদকে দুপুরে গুলিবিদ্ধ করার পর রাত ৮টা ৫ মিনিটে হাসপাতালে আনা হয়েছিল—এমন দাবি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও বানোয়াট। ঘটনার সময়কার ভিডিওর টাইমলাইন, তৎকালীন সংবাদ প্রতিবেদন এবং হাসপাতালের প্রাতিষ্ঠানিক ডেথ সার্টিফিকেট বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, দুপুরে গুলিবিদ্ধ হওয়ার পরপরই তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয় এবং বিকেল ৩টা ৫ মিনিটে চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করে ভর্তি রসিদে অন্তর্ভুক্ত করেন।
ভিডিওর প্রমাণ ও মূলধারার গণমাধ্যমের অনুসন্ধান
গত ১৬ জুলাই বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির ফেসবুক পেজে দুপুর ২টা ১৬ মিনিটে প্রচারিত একটি লাইভ ভিডিও পাওয়া যায়। ভিডিওটির ১ মিনিট ১৪ সেকেন্ডে আবু সাঈদকে পুলিশ কর্তৃক গুলিবিদ্ধ হতে, ১ মিনিট ৩৩ সেকেন্ডে রাস্তায় লুটিয়ে পড়তে এবং ১ মিনিট ৫৭ সেকেন্ডে উপস্থিত ব্যক্তিদের তাকে উদ্ধার করে নিয়ে যেতে দেখা যায়। লাইভ ভিডিওর সময় হিসাব করলে নিশ্চিত হওয়া যায় যে, আবু সাঈদ আনুমানিক দুপুর ২টা ১৮ মিনিটের দিকে গুলিবিদ্ধ হয়ে রাস্তায় নিস্তেজ হয়ে পড়েছিলেন।
গণমাধ্যমের তাৎক্ষণিক প্রতিবেদন ও প্রমাণের সত্যতা
ঘটনার দিন বিকেল ৩টা ৫৯ মিনিটে ‘দ্য ডেইলি ক্যাম্পাস’-এর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে দেওয়া আবু সাঈদের মৃত্যুর সনদের ছবি প্রকাশ করা হয়। সেখানে স্পষ্ট উল্লেখ ছিল—আবু সাঈদকে বিকেল ৩টা ৫ মিনিটে মৃত অবস্থায় হাসপাতালে আনা হয়েছে।
একই দিন বিকেল ৪টা ১৮ মিনিটে ‘ঢাকা পোস্ট’-এর প্রতিবেদনেও উক্ত প্রমাণপত্রের ছবি পাওয়া যায়। পরবর্তীতে দৈনিক ‘ডেইলি সান’-এর বাংলা সংস্করণে বিকেল ৪টা ১৩ মিনিটে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে হাসপাতালের তথ্যের বরাতে বলা হয়, আবু সাঈদকে বিকেল ৩টা ৫ মিনিটে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আনা হয়েছিল।
হাসপাতালের সরাসরি লাইভ ও শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ
১৬ জুলাই বিকেল ৩টা ৫৯ মিনিটে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক ফেসবুক পেজ ‘BRUR Campus’-এ ‘সরাসরি রংপুর মেডিকেল কলেজ থেকে’ শিরোনামে একটি লাইভ ভিডিওতে দেখা যায়, আবু সাঈদের মৃত্যুর প্রতিবাদে শিক্ষার্থীরা হাসপাতাল থেকে তার মরদেহ নিয়ে মিছিল বের করছেন। ভিডিওতে শিক্ষার্থীদের রংপুর মেডিকেল কলেজের জরুরি বিভাগের সামনে থেকে স্লোগান দিতে দিতে মূল সড়কে আসতে দেখা যায়, যা প্রমাণ করে বিকেল ৪টার আগেই হাসপাতালের যাবতীয় প্রক্রিয়া শেষ হয়েছিল।
উল্লেখ্য, এই একই অসত্য তথ্যটি পূর্বে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত হলে সেসময় সত্যতা খণ্ডন করে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল ফ্যাক্ট-চেকিং প্রতিষ্ঠান ‘রিউমর স্ক্যানার’।
সার্বিক তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে এটি শতভাগ নিশ্চিত যে, শহীদ আবু সাঈদকে গুলিবিদ্ধ করার পর ৬-৭ ঘণ্টা গোপনে বা গুম করে রাখার দাবিটি অপপ্রচার। দুপুর ২টা ১৮ মিনিটে তিনি গুলিবিদ্ধ হন এবং তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বিকেল ৩টা ৫ মিনিটে তাকে ‘Brought Dead’ হিসেবে নথিভুক্ত করে। অর্থাৎ, প্রচার করা ‘রাত ৮টা ৫ মিনিট’-এর তথ্যটি সম্পূর্ণ ভুয়া ও বিভ্রান্তিকর।









