গ্ল্যামারের আড়ালে নীল বিষাদ, কেন হুট করে নিভে যাচ্ছে তারকারা?

ফাইল ছবি
আলোকোজ্জ্বল মঞ্চ, ক্যামেরার ফ্ল্যাশ আর হাজারো ভক্তের করতালির মাঝে যাদের বসবাস, সেই তারকাদের জীবন সাধারণ মানুষের কাছে রূপকথার মতো। কিন্তু এই রূপকথার পর্দার আড়ালে যে কতটা জমাটবদ্ধ অন্ধকার, একাকীত্ব আর হাহাকার লুকিয়ে থাকে, তা আমরা টের পাই তখনই, যখন কোনো নক্ষত্র হুট করে খসে পড়ে। গত কয়েক বছরে ঢাকাই শোবিজের একের পর এক অকাল মৃত্যু ও আত্মহত্যার ঘটনা আমাদের স্তম্ভিত করে দিয়েছে। ডলি আনোয়ার থেকে শুরু করে তাজিন আহমেদ, আহমেদ রুবেল, সাদী মহম্মদ বা অতি সম্প্রতি শামস সুমন- এই প্রস্থানগুলো কেবল শোকের নয়, বরং এক গভীর সংকটের সংকেত দিচ্ছে।
হৃদরোগ নাকি মানসিক চাপের বলি?
গত ১৬ মার্চ ২০২৬ তারিখে মাত্র ৬১ বছর বয়সে চলে গেলেন শক্তিশালী অভিনেতা শামস সুমন। ল্যাবএইড হাসপাতালে কার্ডিয়াক অ্যারেস্টে তার মৃত্যু হলেও, সহকর্মীদের স্মৃতিচারণে উঠে এসেছে এক করুণ বাস্তবতা। অভিনেতা শাহরিয়ার নাজিম জয় তার আবেগঘন লেখায় তুলে ধরেছেন বন্ধু সুমনের শেষ দিনগুলোর কথা। পরিবারের সদস্যরা লন্ডনে থিতু হলেও সুমন এই দেশের মাটি ছাড়তে চাননি। এই দেশপ্রেম আর একাকীত্বের দ্বন্দ্বে তিনি ভেতরে ভেতরে নিঃশেষ হচ্ছিলেন। সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তা আর চরম আর্থিক অনিশ্চয়তা তাকে কুরে কুরে খাচ্ছিল। জয়ের ভাষায়, ‘জীবনে সম্মান থাকলেও যদি প্রয়োজন মেটানোর মতো টাকা না থাকে, তবে মানুষ মানসিকভাবে ক্ষয়ে যায়।’
অনুরূপভাবে ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে এক প্রিমিয়ার শোতে যাওয়ার পথে প্রাণ হারান অভিনেতা আহমেদ রুবেল। ২০১৮ সালে চলে যান তাজিন আহমেদ। এই ‘আকস্মিক’ মৃত্যুর নেপথ্যে ছিল অনিয়মিত জীবনযাপন, প্রচণ্ড কাজের চাপ এবং লুকিয়ে রাখা মানসিক অবসাদ। চিকিৎসকরা একে বলছেন ‘সাইলেন্ট কিলার’।
কেন এই চরম পথ বেছে নেওয়া?
শিল্পীরা অত্যন্ত সংবেদনশীল মনের মানুষ হন। তাদের আত্মহননের পেছনে কাজ করে বহুমুখী মনস্তাত্ত্বিক চাপ। যেমন ১৯৯১ সালে জাতীয় পুরস্কারজয়ী অভিনেত্রী ডলি আনোয়ারের আত্মহত্যার পেছনে স্বামীর পরকীয়া ও পারিবারিক অশান্তির কথা শোনা যায়। একইভাবে মিতা নূর (২০১৩) ও মঈনুল হক অলির (২০১২) মৃত্যুর পেছনেও দাম্পত্য জীবনের তিক্ততা দায়ী ছিল বলে জানা যায়। গ্ল্যামার ওয়ার্ল্ডে সাফল্যের শিখরে থাকা মানুষটি যখন হঠাৎ কাজের সংকটে পড়েন, তখন নিজেকে 'ব্রাত্য' মনে হতে শুরু করে। অন্যদিকে চিত্রনায়ক সালমান শাহর অকাল প্রয়াণ আজও রহস্যে ঘেরা থাকলেও, সেটি ইন্ডাস্ট্রির জন্য ছিল এক অপূরণীয় ক্ষতি। আর রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী সাদী মহম্মদের সাম্প্রতিক সময়ে মৃত্যু আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে, প্রিয়জন হারানো বা একাকীত্ব একজন শিল্পীকে কতটা নিভৃতচারী ও হতাশ করে তুলতে পারে।
আধুনিক শোবিজের অন্ধকার দিক
অভিনেত্রী হুমায়রা হিমুর (২০২৩) মৃত্যুতে উঠে এসেছে অনলাইন জুয়া, সম্পর্কের টানাপড়েন এবং আধুনিক অস্থির জীবনের প্রতিচ্ছবি। নতুন অভিনয়শিল্পী হিসেবে শোবিজে টিকে থাকার লড়াই আর কাজ না পাওয়ার হতাশায় ২০২৫ সালে চলে গিয়েছিলেন তরুণ অভিনেতা শাহবাজ সানি । যদিও চিত্রনায়িকা অঞ্জনা রহমানের (২০২৫) রহস্যময় প্রয়াণ এবং অভিনেত্রী তানিন সুবহার (২০২৫) স্ট্রোকের পেছনেও ছিল দীর্ঘদিনের মানসিক চাপ ও শারীরিক অবহেলা।
শামস সুমনের মতো 'হিডেন সুপারস্টার'রা যখন নিভৃতে বিদায় নেন, তখন আমাদের ভাববার সময় এসেছে। অভিনেতা জয় যেমনটি বলেছেন, ‘পৃথিবীতে যত কাজই করো না কেন, নিজের জন্য কিছু সঞ্চয় রাখা এবং নিজেকে কষ্ট না দেওয়া জরুরি।'
শোবিজের এই ঝলমলে দুনিয়ায় মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতি যত্ন নেওয়া এখন বিলাসিতা নয়, বরং বেঁচে থাকার প্রধান শর্ত। রাষ্ট্র এবং শিল্পী সংগঠনগুলোর উচিত শিল্পীদের জন্য একটি শক্তিশালী 'সাপোর্ট সিস্টেম' গড়ে তোলা, যাতে আর কোনো ডলি আনোয়ার বা শামস সুমনকে অভিমানে বা অবহেলায় চলে যেতে না হয়। কারণ তারকারাও রক্ত-মাংসের মানুষ। তাদেরও অভাব আছে, অভিমান আছে।















