গৃহপরিচারিকা থেকে জনপ্রিয় অভিনেত্রী করেছেন ৪৫০ সিনেমা

সিল্ক স্মিতা। ছবি: সংগৃহীত
আশি আর নব্বইয়ের দশকে দক্ষিণ ভারতীয় সিনেমার পর্দা মানেই ছিল একটি নাম, সিল্ক স্মিতা। রুপালি পর্দার ঝলকানিতে যার একক আধিপত্যে কেঁপে উঠত সিনেমা হলগুলো। প্রযোজকরা মাসের পর মাস লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতেন তার একটা নাচের দৃশ্যের শুটিংয়ের ডেট পাওয়ার জন্য।
যেসব সিনেমা চলাই প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ত, স্রেফ সিল্ক স্মিতার একটি আইটেম নাচ যোগ করলেই তা রাতারাতি হয়ে যেত সুপারহিট। কিন্তু এই গ্ল্যামারের আলোঝলমলে পর্দার পেছনে লুকিয়ে ছিল রক্তক্ষরণ আর চরম নির্মম এক জীবন সংগ্রামের ইতিহাস।
দরিদ্র পরিবারের মেয়ে ভাদ্লাপাতলা বিজয়ালক্ষ্মী আজ থেকে বহু বছর আগে অন্ধ্রপ্রদেশের এক অজপাড়াগাঁয়ে জন্ম নিয়েছিলেন। মাত্র ১০ বছর বয়সে দারিদ্র্যের কড়া ধাক্কায় বন্ধ হয়ে যায় তার পড়ালেখা। এর চার বছরের মাথায় মাত্র ১৪ বছর বয়সে পরিবারের পছন্দে তাকে না জানিয়েই তার চেয়ে অনেক বয়সে বড় এক পুরুষের সঙ্গে বিয়ে দেওয়া হয় তাকে।
কিন্তু স্বামীর সংসার মানেই ছিল শুধুই নির্যাতন আর অন্ধকার। সেই নরক যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে দুই বছর পর ঘর ছেড়ে পালিয়ে আসেন চেন্নাই শহরে। বেঁচে থাকার তাগিদে প্রথমে অন্যের বাড়িতে গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করেন। এরপর স্টুডিওগুলোতে ঘুরে ঘুরে জুটে যায় সিনেমায় অভিনেত্রীদের মেকআপ ম্যানের সহকারী হিসেবে কাজ।
মেকআপ ম্যানের কাজ করতে করতেই একদিন ভাগ্যদেবতা মুখ তুলে তাকান সিল্কের দিকে। বিখ্যাত এভিএম স্টুডিওর কাছে এক ময়দার মিলে তাকে দেখেন পরিচালক ভিনু চক্রবর্তী। বিজয়ালক্ষ্মীর চেহারার ধার আর আলাদা ধরনের আবেদন দেখে পরিচালক তাকে নিয়ে যান নিজের বাড়িতে। স্ত্রী কর্ণ পূ-কে সঙ্গে নিয়ে তাকে শেখান অভিনয়, নাচ আর আভিজাত্যের আদবকায়দা।
১৯৮০ সালে ‘ভান্ডিচাক্কারাম’ নামের তামিল সিনেমায় এক আবেদনময়ী নারী চরিত্র ‘সিল্ক’-এর ভূমিকায় অভিনয়ের সুযোগ পান বিজয়ালক্ষ্মী। সেই এক সিনেমােই ইতিহাস বদলে গেল। বিজয়ালক্ষ্মী হারিয়ে গিয়ে জন্ম নিলেন ‘সিল্ক স্মিতা’। তারপর আর তাকে পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি।
প্রায় ১৮ বছরের ক্যারিয়ারে ৪৫০টিরও বেশি সিনেমায় অভিনয় করে নিজেকে দক্ষিণ ভারতীয় সিনেমার সবচেয়ে দামি ও কাঙ্ক্ষিত তারকা বানিয়ে তোলেন তিনি। তখনকার দিনে একটি মাত্র নাচের দৃশ্যের জন্য তিনি পেতেন ৫০ হাজার রুপি, যা সেই যুগে ছিল এক বিশাল অঙ্ক।
কিন্তু সিল্ক স্মিতা নিজে কখনো শুধুই গ্ল্যামারাস পুতুল হয়ে থাকতে চাননি। ফিল্মফেয়ারের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে তিনি আক্ষেপ করে বলেছিলেন, ‘আমি তো সাবিত্রী বা সরিতার মতো বড় মাপের চরিত্রাভিনেত্রী হতে চেয়েছিলাম। কিন্তু প্রথম সিনেমাই আমাকে গ্ল্যামারাসের ছাপ মেরে দিল। প্রযোজক-পরিচালকদের অনুরোধ ফেলতে পারি না, তাই এগুলো করে যেতে হয়।’
পর্দায় লাখো পুরুষকে পাগল করে দেওয়া এই নারী ভেতরের জগতে ছিলেন বড্ড একা। চলচ্চিত্র জগতের অন্দরের নোংরা রাজনীতি, ঈর্ষা আর মানসিক অত্যাচার তার পিছু ছাড়েনি।
নব্বইয়ের দশকের শেষের দিকে নতুন অভিনেত্রীদের আগমন আর নিজের ভালোবাসার মানুষের প্রতারণায় তিনি দেউলিয়া হয়ে যান। জানা যায়, সঙ্গীর কথায় তিনটি সিনেমা প্রযোজনা করে তিনি তৎকালীন সময়ে প্রায় ৪ কোটি রুপি লোকসান গুনেছিলেন।
অর্থকষ্ট, প্রতারণা আর একাকিত্বে নিঃশেষ হয়ে যাওয়া সিল্ক স্মিতাকে ১৯৯৬ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর চেন্নাইয়ে নিজের বাসভবনে রহস্যজনকভাবে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। যখন তাকে উদ্ধার করা হয়, তার বয়স ছিল মাত্র ৩৫ বছর। পুলিশের খাতায় এটি আত্মহত্যা হিসেবে লেখা হলেও তার মৃত্যুকে ঘিরে আজও রয়ে গেছে রহস্য।
একদিকে তার রহস্যজনক মৃত্যু জন্ম দিয়েছে অজস্র উত্তরহীন প্রশ্নের, অন্যদিকে ভারতীয় সিনেমায় অন্যতম আইকনিক ও আবেদনময়ী তারকা হিসেবে সময়ের সাথে তার জনপ্রিয়তা কেবল বেড়েই চলেছে।
এই রহস্যময়ী তারকার জীবন অবলম্বনে তৈরি হয়েছিল বলিউড সিনেমা ‘দ্য ডার্টি পিকচার’, যেখানে সিল্কের চরিত্রে অভিনয় করে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার জিতে নিয়েছিলেন বিদ্যা বালান। তবে রূপালি পর্দার আলো ছড়ানো সিল্ক স্মিতার এই ট্র্যাজিক জীবনের গল্প আজও সিনেমা প্রেমীদের মনে এক গভীর বিষাদের জন্ম দেয়।











