সিনেমার খারাপ রিভিউ দিলেই কি মামলা?

সংগৃহীত ছবি
সিনেমা হলে নতুন ছবি মুক্তি পাওয়ার কথা শুনলেই সিনেপ্রেমীদের মধ্যে উন্মাদনা তৈরি হয়। কিন্তু ইদানীং সিনেমা মুক্তির সঙ্গে সঙ্গে আরেকটি খবর নিয়মিত শিরোনামে আসছে—তা হলো প্রযোজকদের সোজা আদালতের খাতায় নাম লেখানো।
‘টক্সিক’, ‘দ্য প্যারাডাইস’ কিংবা ‘উস্তাদ ভগত সিং’-এর মতো বহুল প্রতীক্ষিত সিনেমার নির্মাতারা সিনেমা মুক্তির আগেই আইনি নিষেধাজ্ঞা বা ‘ইনজাংশন’ চেয়ে দ্বারস্থ হচ্ছেন আদালতের। লক্ষ্য একটাই—অনলাইনে ভুয়া তথ্য, পাইরেসি আর উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ‘রিভিউ বোম্বিং’ ঠেকানো।
কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, আদালত কি চাইলেই কোনো সিনেমার খারাপ রিভিউ বা নেতিবাচক সমালোচনা বন্ধ করে দিতে পারে? আইনি সুরক্ষা ঠিক কোন জায়গায় শেষ হয় আর স্বাধীন মতামত প্রকাশের অধিকার কোথায় শুরু হয়? বিষয়টি নিয়ে স্পষ্ট মতামত দিয়েছেন ভারতের শীর্ষস্থানীয় একাধিক আইন বিশেষজ্ঞ ও সিনেমা প্রযোজক।
‘শেরশাহ’ খ্যাত জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত প্রযোজক শাব্বির বক্সওয়ালা জানান, মুক্তির ঠিক আগের দিনগুলো প্রযোজকদের জন্য রূপ নেয় দুঃস্বপ্নে। সিনেমা রিলিজের আগেই ইন্টারনেটে ক্লিপ লিক হয়ে যাওয়া, সোশ্যাল মিডিয়ায় ক্লাইম্যাক্সের স্পয়লার ছড়িয়ে পড়া বা এআই দিয়ে ভুয়া ভিডিও বানিয়ে ছড়িয়ে দেওয়ার মতো ঘটনা কোটি কোটি টাকার ব্যবসাকে এক লহমায় ধসিয়ে দিতে পারে। তাই বাধ্য হয়েই আগেভাগে আদালতের শরণাপন্ন হতে হয়।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, আদালত মূলত পাইরেসি বা স্বত্ব লঙ্ঘন যেমন সিনেমার গান, স্ক্রিপ্ট বা পাইরেটেড কপি লিক হওয়া এবং ব্যক্তিগত আক্রমণ ও কুৎসা যেমন রিভিউয়ের নামে পরিচালক, প্রযোজক বা শিল্পীদের গালিগালাজ, ভুয়া খবর বা মানহানি করা এই দুটি ক্ষেত্রেই কড়া ব্যবস্থা নিয়ে থাকে। তবে কোনো সিনেমার নেতিবাচক বা খারাপ রিভিউ বন্ধ করা আদালতের পক্ষে সম্ভব কি না, এমন প্রশ্নে আইনজীবীদের স্পষ্ট ও একবাক্যের উত্তর—‘না’।
তামিল ফিল্ম অ্যাক্টিভ প্রডিউসার্স অ্যাসোসিয়েশন আদালতকে অনুরোধ করেছিল সিনেমা মুক্তির প্রথম তিন দিন অনলাইনে সব ধরনের রিভিউ বন্ধ রাখার জন্য। তবে মাদ্রাজ হাইকোর্ট তা সরাসরি খারিজ করে দেয়।
আদালতের স্পষ্ট বক্তব্য—সিনেমার নেতিবাচক রিভিউ দেওয়া বা ছবিটি একদম বাজে হয়েছে বলা সম্পূর্ণভাবে নাগরিকের বাকস্বাধীনতা ও গ্রাহকের অধিকারের মধ্যে পড়ে।
আইনজীবী কৃষ্ণ গ্রান্ধি ও চন্দ্রিমা মিত্রের মতে, সমালোচনা ও মানহানির মূল পার্থক্য হলো মতামত এবং তথ্যাগত অভিযোগের মধ্যে। যখন কেউ বলে ‘সিনেমার গল্প দুর্বল, অভিনয় জঘন্য কিংবা চিত্রনাট্য একঘেয়ে’—তখন তা দর্শক বা সমালোচকের ব্যক্তিগত মতামত এবং এটি একটি সম্পূর্ণ আইনসম্মত সমালোচনা।
কিন্তু যখন প্রমাণ ছাড়াই ‘প্রযোজক টাকা আত্মসাৎ করেছেন’ কিংবা ‘পরিচালক গল্প চুরি করেছেন’-এর মতো অভিযোগ তোলা হয়, তখন তা আর সাধারণ সমালোচনা থাকে না, বরং তথ্যগত ভিত্তিহীন অভিযোগ হিসেবে মানহানি ও আইনি অপরাধের পর্যায়ে পড়ে।
প্রযোজক শাব্বির বক্সওয়ালা নিজেও স্বীকার করেছেন, ‘কঠোর সমালোচনা কিংবা ব্যঙ্গাত্মক রিভিউ প্রতিটি দর্শকের অধিকার। কোনো খারাপ রিভিউকে কখনোই আদালতের নির্দেশে আইনিভাবে চেপে রাখা উচিত নয়।’
সংক্ষেপে বলতে গেলে, এআই-এর যুগে পাইরেসি বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপপ্রচার থেকে সিনেমাকে রক্ষা করতে আইনি ঢাল প্রয়োজন হলেও, দর্শক বা সমালোচকদের মন খুলে ‘খারাপ সিনেমাকে খারাপ’ বলার স্বাধীনতায় হাত দেওয়ার সুযোগ আইনের চোখে নেই।





