অন্তরঙ্গ স্পর্শে জীবনানন্দ ‘কমলা রঙের বোধ’

মঞ্চ থেকে কমলা রঙের বোধ নাটকের দৃশ্য
সমসাময়িক মঞ্চনাট্যের ভিড়ে এমন কিছু কাজ থাকে, যেগুলো দেখে মনে হয় এটা নিজের ভেতরে ফিরে যাওয়ার কোনো নীরব অলিগলি। অলোক বসুর রচনা ও পরিচালনায়, থিয়েটার ফ্যাক্টরির প্রযোজনা ‘কমলা রঙের বোধ’ আমার কাছে ঠিক তেমনই এক অভিজ্ঞতা হয়ে উঠেছে ধীরে ধীরে ভেতরে ঢুকে পড়া, দীর্ঘস্থায়ী এক অনুভব।
নাটকের সূচনা সেই পরিচিত অথচ রহস্যে আচ্ছন্ন ঘটনার ভেতর দিয়ে ১৯৫৪ সালের অক্টোবর, কলকাতায় ট্রাম দুর্ঘটনা এবং তারপর হাসপাতালে শায়িত কবি জীবনানন্দ দাশ এর মৃত্যুর দিকে অগ্রসর হওয়া দিনগুলো। কিন্তু এই নাটক মৃত্যু নিয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেয় না। বরং একদল তরুণ, যারা জীবনানন্দকে ভালোবাসে, তারা তার মৃত্যু, তার জীবন, তার নীরবতা সবকিছু বুঝতে চায়। সেই চাওয়ার ভেতর দিয়েই নাটকটি এগোয়।
এই তরুণদের ভাবনার সমান্তরালে মঞ্চে আবির্ভূত হন হাসপাতালের বেডে শুয়ে থাকা জীবনানন্দ অসুস্থ, ক্লান্ত, তবু নিজের ভেতরে গভীরভাবে জেগে থাকা এক মানুষ। কখনো মনে হয় তিনি নিজেকেই দেখছেন, নিজের জীবনকে নতুন করে পড়ছেন। বাস্তব ও কল্পনার এই দ্বৈত উপস্থিতি নাটকটিকে এক অদ্ভুত অন্তর্মুখী গভীরতা দিয়েছে, যা দর্শককে বারবার টেনে নিয়ে যায় ভেতরের দিকে।
নাটকে তার ব্যক্তিগত সম্পর্কগুলোর সূক্ষ্ম ছায়াও ভেসে ওঠে মা কুসুমকুমারী দাশ, স্ত্রী লাবণ্য, কাকাতো বোন শোভনা কিংবা সমসাময়িকদের সঙ্গে তার দূরত্ব ও সান্নিধ্যের জটিল রসায়ন। বুদ্ধদেব বসু ও অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্তর উপস্থিতি সেই সময়ের সাহিত্যিক পরিমণ্ডলকে এক ঝলক দৃশ্যমান করে তোলে।
মঞ্চ পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনা সত্যিই প্রশংসার দাবিদার। খুব বেশি কিছু দেখানোর চেষ্টা নেই, অথচ যা দেখানো হয়েছে, তা নিখুঁত সংযমে। দৃশ্যান্তরগুলো মসৃণ, এবং পুরো মঞ্চ যেন এক চলমান স্মৃতির ভেতর দিয়ে হেঁটে যায়। আলোক পরিকল্পনা ছিল অসাধারণ আলো এখানে শুধু আলোকিত করেনি, বরং চরিত্রের মনোজগত, সময়ের স্তর, এমনকি নীরবতারও ভাষা হয়ে উঠেছে।
সঙ্গীতের ব্যবহার বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তা কখনো সামনে এসে দৃশ্য দখল করে নেয়নি, বরং অন্তরাল থেকে আবহ নির্মাণ করেছে মৃদু, সংযত, অথচ গভীরভাবে প্রভাব বিস্তারকারী। এর সঙ্গে প্রি-রেকর্ডেড আবৃত্তির সংযোজন নাটকটিকে আরও এক ধাপ এগিয়ে দিয়েছে। সেই কণ্ঠগুলো যেন মঞ্চের বাইরের আরেকটি জগত খুলে দেয় যেখানে কবিতার ভাষা ও নাটকের শরীর একে অন্যের সঙ্গে মিশে যায়।
অভিনয়ের দিক থেকে প্রায় সবাই মনোযোগী ও দক্ষ। সংলাপের ভেতর আবেগের ওঠানামা, শরীরী ভঙ্গির নিয়ন্ত্রণ সব মিলিয়ে একটি সুসংহত অভিনয়শৈলী চোখে পড়ে। যদিও কিছু কিছু জায়গায় সামান্য ওভারঅ্যাক্টিং চোখে লেগেছে, তবে তা পুরো অভিজ্ঞতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে না।
নাটকের নাম শুনে যে গভীর দার্শনিক প্রত্যাশা তৈরি হয়, তার সম্পূর্ণ বিস্তার সবসময় পাওয়া যায় না কিছু জায়গায় মনে হয়েছে, আরও একটু গভীরে যাওয়া যেত। তবুও, যে অনুভবটি তৈরি হয়, তা অস্বীকার করার মত নয়। মঞ্চ ছেড়ে বেরিয়ে আসার পরও বুকের ভেতর কোথাও একটি আলো জ্বলে থাকে নিঃশব্দ, কমলা রঙের।



