অশ্লীলতার অপবাদ মুছতে চলছে লড়াই, আলোচনায় ভোজপুরি গান

উৎপল উদিতের ‘কচৌড়ি গলি’ গানটি রাতারাতি ভাইরাল হয়ে গেছে
‘ভোজপুরি গান’ শব্দটা শুনলেই বর্তমান প্রজন্মের অনেকের মনেই ভেসে ওঠে দ্ব্যর্থবোধক সস্তা লিরিক্স, চটুল নাচ আর নারীবিদ্বেষী কিছু মিউজিক ভিডিওর চেনা ছক। বলিউড সিনেমা বা কমেডি শো-গুলোতেও ‘বিহারি’ উচ্চারণকে বরাবরই হাসির পাত্র বা পরিযায়ী শ্রমিকের সস্তা তকমা দিয়ে উপস্থাপন করা হয়েছে।
কিন্তু আপনি কি জানেন, বিহারের ভোজপুরি ভাষার রয়েছে শত শত বছরের পুরনো এক সমৃদ্ধ সাহিত্য, ইতিহাস এবং লোকসংগীতের অমূল্য ভাণ্ডার?
সম্প্রতি ‘কোক স্টুডিও ভারত’-এর মঞ্চে ভারতের অন্যতম প্রাচীন এই ভাষার হারিয়ে যাওয়া গৌরব ও আভিজাত্যকে রাজকীয়ভাবে ফিরিয়ে এনেছেন একঝাঁক তরুণ তুর্কি। লোকসংগীত শিল্পী উৎপল উদিত এবং র্যাপার সংকেত শিকরিওয়ালের হাত ধরে বদলে যাচ্ছে ভোজপুরি সংগীতের চেনা মানচিত্র।
কোক স্টুডিও ভারতের চলতি সিজনে প্রখ্যাত গায়িকা রেখা ভরদ্বাজের সাথে বিহারের সন্তান উৎপল উদিত যখন এক শতাব্দী প্রাচীন লোকগান ‘কচৌড়ি গলি’ পরিবেশন করেন, তখন মুহূর্তেই স্তব্ধ হয়ে যায় সামাজিক মাধ্যম। ইউটিউবে রাতারাতি লাখ লাখ ভিউ পাওয়া এই গানটি মূলত ব্রিটিশ আমলের এক পরিযায়ী শ্রমিকের স্ত্রীর আকুলতা ও বিচ্ছেদের করুণ আর্তনাদ।
যুদ্ধে যাওয়া স্বামীর শোকে কাতর এক নারী কীভাবে সাম্রাজ্যবাদকে অভিশাপ দিচ্ছেন এবং ক্ষোভে নিজের হাতে খঞ্জর তুলে নেওয়ার কথা ভাবছেন—সেই গভীর আবেগই ফুটে উঠেছে এই গানে।
সংগীত প্রযোজক ‘খওয়াব’ ইনস্টাগ্রামে উদিতের মাটির ঘরের দাওয়ায় বসে গাওয়া একটি ভিডিও দেখে মুগ্ধ হন। ঐতিহ্যবাহী বাদ্যযন্ত্র সানাই, তবলা, ঢোলক ও দোতারার সাথে পপ মিউজিকের ফিউশন ঘটিয়ে তারা তৈরি করেন ‘কচৌড়ি গলি’র আধুনিক সংস্করণ।
উদিত বলেছেন, ‘আমরা যখন আমাদের শিকড়ের গানকে মন থেকে ভালোবাসি, তখন অন্যরা একে সস্তা বা অশ্লীল ভাবলে বুকে আঘাত লাগে। আমি এই স্টিরিওটাইপ ভাঙতে চাই।’
উদিত যখন মাটির গান দিয়ে ভোজপুরির অতীত ঐতিহ্য পুনরুদ্ধার করছেন, তখন ঠিক তার বিপরীত মেরু থেকে জাদুকরী এক ফিউশন ঘটাচ্ছেন তরুণ র্যাপার সংকেত শিকরিওয়াল। ভারতের স্বাধীন মিউজিক ইন্ডাস্ট্রিতে সংকেত এখন এক অতি পরিচিত নাম।
তার গানে ভোজপুরি ভাষার সাথে কোলাকুলি করে ওয়েস্টার্ন জ্যাজ, স্পোকেন ওয়ার্ড আর হিপ-হপ। তার লিরিক্সে গ্রামীণ স্মৃতির সমান্তরালে উঠে আসে বিশ্ববিখ্যাত দার্শনিক ফ্রাঞ্জ কাফকা কিংবা জন কোলট্রেনের রেফারেন্স!
তবে সংকেতের গানে মাঝেমধ্যে স্ট্রিট ল্যাঙ্গুয়েজ বা গালিগালাজের ব্যবহারও থাকে। কিন্তু সংকেতের সাফ কথা—এটি কোনো গ্যাংস্টার ইমেজ তৈরি করার সস্তা চেষ্টা নয়, বরং সমাজের প্রতি তার জমে থাকা তীব্র ক্ষোভ প্রকাশের মাধ্যম।
পাঞ্জাবি মিউজিক ইন্ডাস্ট্রির উদাহরণ টেনে সংকেত শিকরিওয়াল এক জ্বলন্ত প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘পাঞ্জাবি গানেও অস্ত্র, সহিংসতা কিংবা অতিরিক্ত পুরুষতন্ত্র নিয়ে বিতর্ক আছে, কিন্তু দিলজিৎ দোসাঞ্জ বা সিধু মুসেওয়ালারা তাদের আঞ্চলিক সংস্কৃতিকে আজ বিশ্বমঞ্চে গর্বের জায়গায় নিয়ে গেছেন। তাহলে ভোজপুরির বেলায় কেন এত নাক সিঁটকানো? প্রশ্ন এটা নয় যে ভোজপুরীকে ভদ্র বানানো যাবে কি না, প্রশ্ন হলো ভোজপুরি ভাষাভাষীদের কেন সবসময় অন্যদের কাছে নিজেদের ভদ্রতার প্রমাণ দিতে হবে?’
সংকেত ও উদিত দুজনেই চান, মানুষ যেন বিহারকে কেবল সস্তা বিনোদন বা শ্রমিকের চোখ দিয়ে না দেখে, বরং ‘ল্যান্ড অব বুদ্ধ’ বা জ্ঞানীদের চারণভূমি হিসেবে সম্মান দিতে শেখে।





