ছাব্বিশের দুর্গাপূজা ও সেই পুরনো দিনের বাংলা গান

সংগৃহীত ছবি
পূজোর এই অবসরে খাটে শুয়ে জানালা দিয়ে শরতের নীল আকাশের দিকে আনমনে তাকিয়ে আছি। পেঁজা তুলোর মতো সাদা মেঘেরা যেন কোনো এক অজানা গন্তব্যের উদ্দেশ্যে ভেসে চলেছে। আজ মহাষষ্ঠী। দুপুর হতেই হঠাৎ পাড়ার পুজোর মণ্ডপের লাউডস্পিকার থেকে বাতাসে ভর করে ভেসে এল সেই চিরচেনা সুর--
কি লিখি তোমায়? প্রিয়তম... কি লিখি তোমায়?
কি লিখি তোমায়?
তুমি ছাড়া আর কোনো কিছু ভালো লাগে না আমার
কি লিখি তোমায়? কি লিখি তোমায়?
লতা মঙ্গেশকরে সেই জাদুকরী কণ্ঠস্বর আর সুরকার, কিশোর কুমার ও মুকুল দত্তের কথার গাঁথুনি মুহূর্তেই যেন আমাকে ফিরিয়ে নিয়ে গেল ফেলে আসা সেই সোনালি দিনগুলোতে। বুকের ভেতরটা হু হু করে উঠল এক অদ্ভুত নস্টালজিয়ায়। শরতের এই আকাশ মানেই তো এক বিশাল ক্যানভাস, যেখানে তুলির টানে ফুটে ওঠে শিউলির গন্ধ, কাশফুলের দোলা আর দূর থেকে ভেসে আসা ঢাকের বাদ্যি। কিন্তু বাঙালির এই শারদীয় উৎসব কেবল মৃন্ময়ী দেবীর চিন্ময়ী রূপের আরাধনাতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; এটি কালক্রমে হয়ে উঠেছে বাঙালির মনন, সংস্কৃতি এবং সাহিত্যের এক সুবিশাল উদ্যাপন। দুর্গাপূজা আর পুরনো দিনের বাংলা গানের যে অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক, তা বাংলা সাহিত্যের এক অন্যরকম অথচ অত্যন্ত শক্তিশালী সমান্তরাল ধারা তৈরি করেছে। এই ধারাটি বইয়ের পাতায় ছাপা অক্ষরের মধ্যে বন্দি না থেকেও, কেবল সুর আর বাণীর জাদুতে মানুষের মুখে মুখে ফিরেছে এবং কালজয়ী সাহিত্যের মর্যাদা পেয়েছে। আজ যখন আমরা বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস নিয়ে আলোচনা করি, তখন পূজোর গানের এই শ্রুতিমধুর সাহিত্যিক রূপটিকে কোনোভাবেই এড়িয়ে যাওয়া যায় না।
গল্পটা শুরু হয়েছিল অনেক আগে, সেই অষ্টাদশ শতাব্দীতে। বাংলার গ্রামে-গঞ্জে তখন শাক্ত পদাবলির সুর। রামপ্রসাদ সেন কিংবা কমলাকান্ত ভট্টাচার্যের মতো সাধক কবিরা যখন গাইলেন, ‘গিরি, এবার আমার উমা এলে, আর উমা পাঠাব না,’ তখন তা কেবল আর ভক্তিগীতি বা ঈশ্বরবন্দনা হয়ে রইল না। এক লহমায় তা যেন পাল্টে গেল বাংলার এক সাধারণ ঘরের বিবাহিত মেয়ের পিতৃগৃহে প্রত্যাবর্তনের গল্পে। দেবী দুর্গা হয়ে উঠলেন ঘরের মেয়ে ‘উমা’। বিশ্ববিদ্যালয়ের সাহিত্যের ক্লাস থেকে শুরু করে নাট্যতত্ত্বের আসর—সব জায়গাতেই আজ এই আগমনী গানগুলোকে বাংলা সাহিত্যের প্রথম সার্থক ‘পারিবারিক আখ্যান’ বা ফ্যামিলি ড্রামা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। এই গানগুলোর মধ্য দিয়েই গ্রামীণ বাংলার সমাজচিত্র, কন্যার প্রতি মায়ের চিরন্তন টান এবং পিতৃতান্ত্রিক সমাজের এক সূক্ষ্ম অথচ গভীর রূপরেখা সাহিত্যের আঙিনায় প্রবেশ করেছিল।
বিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে, বিশেষ করে পঞ্চাশের দশক থেকে শুরু করে সত্তরের দশক পর্যন্ত, দুর্গাপূজা আর গানের এই সম্পর্ক এক সম্পূর্ণ নতুন মাত্রা পায়। তখন মহালয়া আসা মানেই পাড়ার মোড়ে মোড়ে, চায়ের দোকানে বা মধ্যবিত্তের ড্রয়িংরুমে কলের গানের রেকর্ড বা রেডিওর নব ঘোরানোর ব্যস্ততা। হিজ মাস্টার্স ভয়েস, মেগাফোন বা হিন্দুস্তান রেকর্ডসের মতো কোম্পানিগুলো মহালয়ার ঠিক আগেই বাজারে নিয়ে আসত নতুন গানের ডালি। এই সময়কার গানগুলো বাংলা সাহিত্যের এক নতুন উপশাখা তৈরি করেছিল, যাকে আমরা অনায়াসেই ‘আধুনিক বাংলা গীতিকবিতা’ বলতে পারি। এটি ছিল সেই স্বর্ণযুগ, যখন গান কেবল সুরের দাস ছিল না; প্রতিটি গানের কথা ছিল একেকটি নিটোল, স্বয়ংসম্পূর্ণ কবিতা। সলিল চৌধুরী, গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার, পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়, কিংবা প্রণব রায়ের মতো গীতিকাররা যখন কলম ধরতেন, তখন যেন শব্দের মায়াজাল তৈরি হতো। একটি তিন মিনিটের গানের ভেতর তারা যে আখ্যান বা ন্যারেটিভ তৈরি করতেন, তা অনেক সময় একটি সার্থক ছোটগল্প বা চলচ্চিত্রের দৃশ্যপটকেও হার মানাত। সলিল চৌধুরীর কথায় ও সুরে যখন হেমন্ত মুখোপাধ্যায় গাইলেন, ‘আমি ঝড়ের কাছে রেখে গেলাম আমার ঠিকানা,’ অথবা যখন বেজে উঠল, ‘আকাশপ্রদীপ জ্বেলে, বাইরের আকাশটাকে চিনে নিলাম,’ তখন সেই শব্দবন্ধগুলো সাধারণ লিরিকের গণ্ডি পেরিয়ে বিশুদ্ধ সাহিত্যের মর্যাদা পেল। এই গানগুলোতে যে উপমা, রূপক এবং চিত্রকল্পের ব্যবহার দেখা যায়, তা আধুনিক বাংলা কবিতার যেকোনো শ্রেষ্ঠ কবির রচনার সমতুল্য। একটি গানের ভেতর দিয়ে যেভাবে দৃশ্য থেকে দৃশ্যে উত্তরণ ঘটে, তা একজন দক্ষ চিত্রনাট্যকার বা চলচ্চিত্রকারের কাজের মতোই নিপুণ।
সেই আমলের বিশিষ্টজনদের স্মৃতিচারণ থেকে এই গানের সাহিত্যমূল্যের এক অদ্ভুত সুন্দর চিত্র পাওয়া যায়। কিংবদন্তি শিল্পী মান্না দে তাঁর বিভিন্ন আড্ডায় বা স্মৃতিচারণে প্রায়ই বলতেন যে, পূজোর গানের জন্য যখন তারা অপেক্ষা করতেন, তখন সবার আগে নজর থাকত গানের কথাগুলোর দিকে। পুলক বন্দ্যোপাধ্যায় যখন নতুন গানের লিরিক নিয়ে আসতেন, মান্না দের নাকি মনে হতো তিনি একটা আস্ত গল্প পড়ছেন। তিনি বলতেন, ওই নিটোল শব্দের বুনন আর গল্পের গাঁথুনি ছাড়া শিল্পীর কণ্ঠের কোনো দামই ছিল না। অন্যদিকে, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় বা সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের মতো প্রখ্যাত সাহিত্যিকরা তাদের যৌবনের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বারবার লিখেছেন যে, তাদের সময়ে শারদীয়া পত্রিকার যেমন একটা আলাদা আবেদন ছিল, পূজোর গানের রেকর্ডের আবেদনও তার চেয়ে কোনো অংশে কম ছিল না। চায়ের ঠেকে বা কফি হাউসের আড্ডায় তরুণরা যেমন সমকালীন কবিতা নিয়ে তর্ক জুড়ত, ঠিক তেমনই তর্ক চলত নতুন বেরোনো পূজোর গানের শব্দচয়ন আর মেটাফোর নিয়ে। তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, সেকালের পুজোর গানগুলো ছিল ‘শ্রুতি-সাহিত্য’ বা অডিও-লিটারেচারের এক অনন্য এবং সফল দৃষ্টান্ত। মুদ্রণযন্ত্রের সীমাবদ্ধতা পেরিয়ে এই সাহিত্য সরাসরি পৌঁছে গিয়েছিল বাংলার আপামর জনসাধারণের কাছে। এই গীতিকবিরা ছন্দের জাদুকর ছিলেন। তারা খুব সহজ, আটপৌরে শব্দের ভেতর দিয়ে জীবনের গভীর দর্শন, প্রেম, বিরহ, একাকিত্ব বা প্রকৃতির যে ছবি আঁকতেন, তা মানুষের হৃদয়ে চিরস্থায়ী ছাপ ফেলে যেত। বাংলা একাডেমির শুদ্ধ প্রমিত বানান আর ব্যাকরণের কাঠামো মেনেই তারা এমন এক মায়াবী শব্দজগৎ তৈরি করেছিলেন, যা আজও আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের ভাষা হয়ে আছে। সময়ের পালাবদলে আজ হয়তো গ্রামোফোন রেকর্ডের সেই জাদুকরি যুগ আর নেই। ক্যাসেটের ফিতাও হারিয়ে গেছে ইউটিউব, স্পটিফাই বা ডিজিটাল স্ট্রিমিংয়ের এই যুগে। বিশেষ করে গত কয়েক বছরের কথা যদি ধরি, করোনা মহামারি-পরবর্তী এই চার-পাঁচ বছরে আমাদের জীবনযাত্রা, উদ্যাপন আর বিনোদনের ধরনে এক ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। মানুষ এখন অনেক বেশি ডিজিটালমুখী, স্মার্টফোনের স্ক্রিনে অনেকটাই বন্দি হয়ে গেছে উৎসবের আমেজ। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই চরম আধুনিকতার যুগেও, পাড়ার পুজোর মণ্ডপগুলোতে কান পাতলে আজও সেই পুরনো দিনের গানগুলোরই একচ্ছত্র আধিপত্য টের পাওয়া যায়। আধুনিক ডিজে বা চটুল গ্যাঁড়াকলের ভিড়ে যখন চারপাশ মুখরিত হয়ে ওঠে, তখন কোনো এক মণ্ডপের লাউডস্পিকার থেকে ভেসে আসা হেমন্ত, লতা বা মান্না দের কণ্ঠ যেন এক অনাবিল স্বস্তির প্রলেপ বুলিয়ে দেয়। আজকালকার তরুণ প্রজন্মও যেন নতুন করে আবিষ্কার করছে সেই পুরনো কথা ও সুরের জাদু। সমসাময়িক সময়েও আধুনিক গানের পাশাপাশি যখন সেই পুরনো দিনের গানগুলো উৎসবের দিনগুলোতে সমানে বাজতে থাকে, তখন স্পষ্ট বোঝা যায় সাহিত্যের গভীরতা আর সুরের মাধুর্য থাকলে কোনো সৃষ্টিই কখনো পুরোনো হয় না।
আজ আর হয়তো মহালয়ার ভোরে রেডিওতে চণ্ডীপাঠ শোনার পরপরই পাড়ার প্যান্ডেলে নতুন রেকর্ডের গান বাজার সেই অদ্ভুত রোমাঞ্চ নেই। কিন্তু সেই পুরনো দিনের পুজোর গানগুলো আমাদের মননে এবং বাংলা সাহিত্যের এক অদৃশ্য আর্কাইভে যে স্থায়ী আসন করে নিয়েছে, তা চিরন্তন। দুর্গাপূজা আর পুরনো বাংলা গানের এই যুগলবন্দি বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এক অভিনব, বর্ণিল এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এই গানগুলো কেবল আমাদের নস্টালজিয়া বা ফেলে আসা দিনের দীর্ঘশ্বাস নয়; এগুলো আমাদের সাহিত্যের এক অমূল্য দলিল। এই শ্রুতি-সাহিত্যকে তার প্রাপ্য ধ্রুপদি সাহিত্যের মর্যাদা দিয়ে সংরক্ষণ, পঠন-পাঠন এবং অ্যাকাডেমিক স্তরে আরও বিস্তৃত গবেষণা হওয়া অত্যন্ত জরুরি। তবেই বাংলা সাহিত্যের এই ভিন্ন মাত্রার, অথচ প্রবল প্রভাবশালী রূপটি আগামী প্রজন্মের কাছে তার স্বমহিমায় টিকে থাকবে এবং সাহিত্যের বৃহত্তর ক্যানভাসকে আরও সমৃদ্ধ করবে।
এই নতুন অনুচ্ছেদগুলো যুক্ত করার পর প্রতিবেদনের আবেগ এবং প্রবাহ কি আপনার মনের মতো হয়েছে?
লেখক: শিক্ষক, লেখক ও গবেষক
ইমেইল: [email protected]



