অন্ধত্ব আর প্রত্যাখ্যানের ওপারে : ডিএনএ-র মঞ্চে দুই কণ্ঠ, দুই সংগ্রাম এক বার্তা

উদ্বোধনী মঞ্চে আন্দ্রেয়া বোচেল্লি ও ইজে
গতকাল মেক্সিকো সিটির ঐতিহাসিক এস্তাদিও আসতেকা স্টেডিয়ামে যেন এক টুকরো দক্ষিণ কোরিয়া আর ইতালির মেলবন্ধন ঘটেছিল। জমকালো আয়োজনের মধ্য দিয়ে পর্দা উঠেছে ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের। তবে মাঠের ফুটবল গড়ানোর আগেই উদ্বোধনী মঞ্চে তৈরি হলো এক অবিস্মরণীয় ইতিহাস। শারীরিক প্রতিবন্ধকতা আর নির্মম প্রত্যাখ্যানের বেড়াজাল ছিন্ন করে আসা দুই ভিন্ন প্রজন্মের, দুই ভিন্ন সংস্কৃতির সুরের জাদুকর এক হয়ে মেলালেন তাদের কণ্ঠ।
বিশ্বখ্যাত ইতালীয় কিংবদন্তি অপেরা টেনর আন্দ্রেয়া বোচেল্লি এবং দক্ষিণ কোরিয়ান-আমেরিকান পপ তারকা ইজে — এই দুই তারকার লাইভ যুগলবন্দীতে ২০২৬ বিশ্বকাপের অফিশিয়াল অ্যান্থেম ‘ডিএনএ’-র সুরে মেতে উঠল পুরো বিশ্ব। মাঠের পারফরম্যান্স শেষে যখন পুরো স্টেডিয়াম দাঁড়িয়ে এই দুই যোদ্ধাকে অভিবাদন জানাচ্ছিল, তখন সেটি কেবল একটি গানের সমাপ্তি ছিল না; বরং জীবনের সব কঠিন বাধা জয় করে আসা দুজন মানুষের সাফল্যের গল্প।
১৯৫৮ সালে ইতালির টাস্কানিতে জন্ম নেওয়া আন্দ্রেয়া বোচেল্লি জন্ম থেকেই ভুগছিলেন ‘কনজেনিটাল গ্লুকোমা’ নামক চোখের জটিল রোগে। তবে ভাগ্যের সবচেয়ে নির্মম পরিহাসটি ঘটে মাত্র ১২ বছর বয়সে, যখন বন্ধুদের সাথে ফুটবল খেলার সময় মাথায় বলের আঘাতে চিরতরে নিভে যায় তার চোখের আলো। সম্পূর্ণ অন্ধ হয়েও মনের ভেতরের সংগীতের আলোকে নেভাতে দেননি তিনি। পিয়ানো, বাঁশি আর স্যাক্সোফোন রপ্ত করে, পিসা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন বিষয়ে ডক্টরেট ডিগ্রি নিয়েও শেষ পর্যন্ত ওকালতি ছেড়ে বেছে নেন সুরের পথ।
১৯৯২ সালে কিংবদন্তি লুচিয়ানো পাভারোত্তির হাত ধরে বড় ব্রেক পাওয়া বোচেল্লি আজ বিশ্বজুড়ে ৯০ মিলিয়নেরও বেশি অ্যালবাম বিক্রি করা এক জীবন্ত কিংবদন্তি। ২০২০ সালের করোনাকালীন স্তব্ধ পৃথিবীতে মিলানের শূন্য ক্যাথেড্রালে দাঁড়িয়ে তার গাওয়া ‘মিউজিক ফর হোপ’ যেমন কোটি মানুষের চোখে জল এনেছিল, ঠিক তেমনি গতকালের মেক্সিকো সিটির মঞ্চে তার গভীর কণ্ঠ কোটি ফুটবল ভক্তের বুক ভরিয়ে দিল এক নতুন আশায়।
অন্যদিকে, বোচেল্লির পাশে নীল রঙের জমকালো পোশাকে মঞ্চ কাঁপানো ইজের (আসল নাম কিম ইউন-জে) গল্পটি কোনো সিনেমার চেয়ে কম নয়। মাত্র ১১ বছর বয়সে ২০০৩ সালে কে-পপের নামী এজেন্সি 'এসএম এন্টারটেইনমেন্ট'-এ ট্রেইনি হিসেবে যোগ দিয়ে টানা ১০ বছর দিন-রাত এক করে কঠোর অনুশীলন করেছিলেন তিনি। কিন্তু কণ্ঠস্বর অতিরিক্ত ভারী ও মোটা এবং বয়স বেশি হয়ে যাওয়ার অজুহাতে তাকে গ্রুপ থেকে বাদ দেওয়া হয়।
এক নিমেষে স্বপ্ন চুরমার হলেও হাল ছাড়েননি ইজে। নিউ ইয়র্ক ইউনিভার্সিটি থেকে পড়াশোনা শেষ করে পর্দার আড়ালে গান লেখা শুরু করেন। ‘রেড ভেলভেট’-এর ‘সাইকো’ কিংবা এসবী-এর ‘ড্রামা’-র মতো মেগা হিট গানের স্রষ্টা মূলত তিনিই। অবশেষে ২০২৫ সালে নেটফ্লিক্সের অ্যানিমেটেড সিনেমা কে-পপ ডিমন হান্টার্স-এর মূল গান ‘গোল্ডেন’ গেয়ে পুরো বিশ্বে তোলপাড় সৃষ্টি করেন এবং প্রথম কে-পপ শিল্পী হিসেবে একই সাথে অস্কার, গ্র্যামি ও গোল্ডেন গ্লোব জিতে ইতিহাস লেখেন।
বিশ্বকাপের অফিসিয়াল অ্যান্থেম ‘ডিএনএ’র মূল সংস্করণে ডেভিড গেটা এবং মেগান দি স্ট্যালিয়ন ফিচার করলেও, উদ্বোধনী মঞ্চে বোচেল্লি ও ইজের লাইভ ডুয়েট পুরো স্টেডিয়ামে এক অভূতপূর্ব আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি করে। ক্লাসিক্যাল অপেরা আর আধুনিক পপের এক অপূর্ব ফিউশন ঘটিয়ে গানের মাঝেই যখন ইজে নিজের মাতৃভাষা কোরিয়ানে গেয়ে ওঠেন—‘যদিও আমি পড়ে যাই, আমি আবার উঠে দাঁড়াবো’। তখন গ্যালারিতে থাকা লাখো দর্শক উল্লাসে ফেটে পড়েন।
শৈশবের স্মৃতি রোমন্থন করে ইজে বলেছেন, ‘২০০২ সালে যখন আমার দেশ কোরিয়ায় বিশ্বকাপ হয়েছিল, তখন সিউলের রাস্তায় মানুষের উন্মাদনা দেখে বড় হয়েছি। আজ নিজে বিশ্বকাপের মঞ্চে দাঁড়িয়ে নিজের ভাষায় গান গাইতে পারা আমার জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।’
উদ্বোধনী ম্যাচের আগে পরিবেশিত এই চোখধাঁধানো পারফরম্যান্স সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এখন রীতিমতো ভাইরাল। শারীরিক প্রতিবন্ধকতা যে ইচ্ছাশক্তি আর সাধনার কাছে স্রেফ ধুলোবালি, বোচেল্লি যেমন তার প্রমাণ, তেমনি সমস্ত প্রত্যাখ্যানের মুখেও যে ঘুরে দাঁড়ানো যায়, ইজে তার জীবন্ত উদাহরণ।









