অন্ধত্বকে হারিয়ে যিনি জয় করেছেন গোটা বিশ্ব

আন্দ্রেয়া বোচেল্লি
চোখের আলো না থাকলেও যার কণ্ঠের জাদুতে বিমোহিত গোটা বিশ্ব, তিনি আর কেউ নন, জনপ্রিয় ইতালীয় অপেরা টেনর ও কিংবদন্তি সঙ্গীতশিল্পী আন্দ্রেয়া বোচেল্লি। ক্লাসিক্যাল অপেরা আর পপ মিউজিকের এক অপূর্ব ফিউশন ঘটিয়ে বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষের মন জয় করে নেওয়া এই সুরের জাদুকর গতকাল মেক্সিকো সিটির ঐতিহাসিক এস্তাদিও আসতেকা স্টেডিয়ামে ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তার সুরের জাদুতে মাতালেন পুরো বিশ্বকে!
১৯৫৮ সালের ২২ সেপ্টেম্বর ইতালির টাস্কানিতে জন্ম নেন আন্দ্রেয়া বোচেল্লি। জন্ম থেকেই তিনি ‘কনজেনিটাল গ্লুকোমা’ নামক চোখের এক জটিল রোগে ভুগছিলেন, যার কারণে তার দৃষ্টিশক্তি ছিল অত্যন্ত ক্ষীণ। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস ঘটে মাত্র ১২ বছর বয়সে। বন্ধুদের সাথে ফুটবল খেলার সময় আচমকা মাথায় বলের আঘাত লাগে তার। আর এই এক আঘাতেই চিরতরে নিভে যায় তার চোখের আলো, সম্পূর্ণ অন্ধ হয়ে যান বোচেল্লি।
তবে চোখের আলো হারালেও মনের ভেতরের সঙ্গীতের আলো তাকে নিভে যেতে দেয়নি। শৈশব থেকেই পিয়ানো, বাঁশি আর স্যাক্সোফোন বাজানো রপ্ত করেছিলেন তিনি।
সঙ্গীতের প্রতি ভালোবাসা থাকলেও বোচেল্লি পড়াশোনায় ছিলেন দারুণ মেধাবী। পিসা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন বিষয়ে ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করে কিছুদিন ওকালতিও করেছিলেন তিনি! কিন্তু যার রক্তে বইছে সুর, তাকে কি আর আদালতে আটকে রাখা যায়?
দিনের বেলা আইন পেশা সামলে রাতে পিয়ানো বারে গান গাইতেন তিনি। ১৯৯২ সালে ভাগ্যদেবীর সহায়তায় তার গাওয়া একটি ডেমো টেপ পৌঁছায় কিংবদন্তি অপেরা শিল্পী লুচিয়ানো পাভারোত্তির কাছে। বোচেল্লির কণ্ঠ শুনে মুগ্ধ পাভারোত্তি তাকে বড় ব্রেক দেন, আর সেখান থেকেই শুরু হয় বোচেল্লির বিশ্বজয়ের গল্প।
এখন পর্যন্ত বিশ্বজুড়ে তার ৯০ মিলিয়নেরও বেশি অ্যালবাম বিক্রি হয়েছে। সংগীতে অসামান্য অবদানের জন্য ২০১০ সালে তাকে সম্মানজনক ‘হলিউড ওয়াক অব ফেম’-এ তারকা দিয়ে ভূষিত করা হয়।
২০২০ সালের করোনা মহামারীর সেই ভয়াবহ দিনগুলোর কথা নিশ্চয়ই সবার মনে আছে? পুরো পৃথিবী যখন লকডাউনে স্তব্ধ, ঠিক তখন ইতালির মিলান শহরের ঐতিহাসিক ‘দুওমো ক্যাথেড্রাল’-এ এক অদ্ভুত ও আবেগঘন কনসার্ট করেন বোচেল্লি। ‘মিউজিক ফর হোপ’ নামের সেই লাইভ ইভেন্টে সম্পূর্ণ জনমানবহীন এক বিশাল গির্জায় দাঁড়িয়ে তিনি গেয়েছিলেন ‘অ্যামেজিং গ্রেস’। শূন্য গির্জায় তার সেই প্রতিধ্বনিত কণ্ঠ সে সময় ঘরে বন্দি কোটি কোটি মানুষের চোখে জল এনে দিয়েছিল এবং এটি ইউটিউবের ইতিহাসে অন্যতম বড় লাইভ ইভেন্টের রেকর্ড গড়ে।
গতকাল স্টেডিয়ামভর্তি হাজারো দর্শক এবং বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি ফুটবল ভক্তদের মুগ্ধ করে আন্দ্রেয়া বোচেল্লি এই বিশ্বকাপের অফিসিয়াল অ্যান্থেম ‘ডিএনএ’ গানটি লাইভ পরিবেশন করেন। এই পরিবেশনায় তার সাথে মঞ্চে যোগ দেন দক্ষিণ কোরিয়ার উদীয়মান তারকা ইজে। গানটির মূল সংস্করণে ডেভিড গেটা এবং মেগান দি স্ট্যালিয়ন ফিচার করলেও, গতকালের উদ্বোধনী মঞ্চে বোচেল্লি ও ইজের লাইভ ডুয়েট পুরো স্টেডিয়ামে এক অভূতপূর্ব আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি করে। গানটিতে কোরিয়ান লিরিক্সের অন্তর্ভুক্তি দর্শকদের মাঝে ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছে।
শারীরিক প্রতিবন্ধকতা যে ইচ্ছাশক্তি আর সাধনার কাছে স্রেফ ধুলোবালি, আন্দ্রেয়া বোচেল্লি তার জলজ্যান্ত প্রমাণ। তিনি শুধু একজন গায়কই নন, বরং পৃথিবীর বুকে বেঁচে থাকার এক অনন্য অনুপ্রেরণা।








