তাতির মসিঁয়্যে য়্যুলো

নিজের পরিচালিত ‘প্লেটাইম’ চলচ্চিত্রে মসিঁয়্যে য়্যুলো চরিত্রে জ্যাক তাতি
আগামীকাল ফরাসি মাস্টার ফিল্মমেকার জ্যাক তাতির জন্মদিন। তার সৃষ্টি করা বিখ্যাত চরিত্র মসিঁয়্যে য়্যুলোর কথা জানাচ্ছেন রুদ্র আরিফ
‘যেখানে কোনো সমস্যা নেই, সেখানেও তিনি সমস্যার আভাস পান আর তা খুঁজে বের করেন’— জ্যাক তাতি সম্পর্কে বলেছিলেন জ্যঁ-লুক গোদার। ৯ অক্টোবর ১৯০৭ থেকে ৪ নভেম্বর ১৯৮২— ৭৫ বছরের আয়ুষ্কালে মাত্র ছয়টি পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণ করলেও তাতি ছিলেন ইতিহাসের অন্যতম উদ্ভাবনী ও প্রভাবশালী নির্মাতা। ভিজ্যুয়াল কমেডিকে তিনি মৌলিকভাবে একটি নতুন রূপ দিয়েছিলেন। নির্বাক চলচ্চিত্রের কৌতুক ধারার ওপর ভর করে এমন এক বুদ্ধিবৃত্তিক ও সুবিন্যস্ত শৈলী তৈরি করেছিলেন, যা আধুনিক ও যান্ত্রিক জীবনের নিরানন্দ অসংগতিগুলোকে উপহাস করত। এর প্রতিনিধিত্বশীল চরিত্রটির নাম মসিঁয়্যে য়্যুলো। এ চরিত্রে তাতি নিজেই অভিনয় করেছেন। “মসিঁয়্যে য়্যুলো’স হলিডে” (১৯৫৩), ‘মাই আঙ্কেল’ (১৯৫৮), ‘প্লেটাইম’ (১৯৬৭) ও ‘ট্রাফিক’ (১৯৭১) চলচ্চিত্রের কেন্দ্রে রয়েছে চরিত্রটি। এ ছাড়া ফ্রাঁসোয়া ত্রুফোর ‘বেড অ্যান্ড বোর্ড’-এও (১৯৭০) অল্প সময়ের জন্য উপস্থিতি ঘটেছে এর।
য়্যুলোর আসলে চলচ্চিত্রের প্রচলিত প্রধান চরিত্রগুলোর মতো কোনো মনস্তাত্ত্বিক গভীরতা, দুঃখজনক অতীত কিংবা জটিল বাচনিক চাতুর্য নেই। সম্পূর্ণভাবে শারীরিক উপস্থিতি, অঙ্গভঙ্গি এবং চিরচেনা পোশাক-আশাকের মাধ্যমেই সে নিজের প্রকাশ ঘটিয়েছে। তার পোশাক বলতে একটি ছোট ট্রেঞ্চ কোট, একটি দুমড়ানো-মোচড়ানো হ্যাট, পায়ের গোড়ালির ওপরে থাকা প্যান্ট— যেটির আড়াল থেকে ডোরাকাটা মোজা দেখা যায়। অনুষঙ্গ হিসেবে মুখে সবসময় পাইপ গুঁজে রাখা আর একটি ছাতাকে সঙ্গী করা তার বাহ্যিক বৈশিষ্ট্য। সামনে ঝুঁকে, হেলেদুলে একটি নির্দিষ্ট ভঙ্গিতে হাঁটে সে। সেই হাঁটার মধ্যে রয়েছে একধরনের স্থির জড়তা। পায়ের আঙুলের ওপর সামান্য ভর দিয়ে এমনভাবে লাফিয়ে চলে, যেন বায়ুপ্রবাহের উল্টোদিকে রীতিমতো লড়াই করে সে এগিয়ে যাচ্ছে। পারতপক্ষে কথা বলে না য়্যুলো। নির্বাক যুগের দুই মহান কমেডি অভিনেতা চার্লি চ্যাপলিন ও বাস্টার কিটনের অভিনয় ঐতিহ্যের ধারাই যেন এই চরিত্রে বয়ে বেড়িয়েছেন তাতি। তবে চ্যাপলিন যেমন সক্রিয়ভাবে শারীরিক কৌতুকের জন্ম দিতেন, য়্যুলো সেখানে হরদমই একজন নিষ্ক্রিয় অনুঘটক। অবশ্য কোনো কিছু করতে গিয়ে সে অজান্তেই তালগোল পাকিয়ে ফেলে, যেমনটার দেখা মেলে চ্যাপলিনের ‘ট্রাম্প’ চরিত্রের মধ্যেও।
মানুষের খেয়ালি স্বভাব এবং প্রযুক্তির নিষ্প্রাণ শৃঙ্খলার মধ্যকার টানাপড়েনের দ্বন্দ্বটিই য়্যুলো চরিত্রের মনোজগতের মূলে জায়গা করে নিয়েছে। “মসিঁয়্যে য়্যুলো’স হলিডে”তে অমায়িক সারল্য, গভীর লাজুকতা আর অবচেতনে নিয়মশৃঙ্খলার ব্যাঘাত ঘটানোর এক অনন্য মিশ্রণের বৈশিষ্ট্য ধারণ করেছে সে। ছুটি কাটাতে আসা মধ্যবিত্তদের কঠোর, যান্ত্রিক ও আভিজাত্যে আচ্ছন্ন রীতিনীতি থেকে একটি মনস্তাত্ত্বিক বিচ্ছিন্নতা প্রকাশ করে চরিত্রটি। তার বৈশিষ্ট্যে রয়েছে দারুণ এক বৈপরীত্য; আনাড়ি, গর্দভ ও উদাসীন বাহ্যিক রূপের আড়ালে সে এমন এক নির্লিপ্ততা ও কঠোরতা ধারণ করে, যে চারপাশের মানুষের কপটতার প্রতি নীরবে বিদ্রূপ ছুড়ে দেয়।
‘মাই আঙ্কেল’-এ চাকচিক্য তথা প্রযুক্তিকে সেকেলে য়্যুলো ঘৃণা করে না; বরং সে শুধু এর সঙ্গে মানিয়ে নিতে অপারগ। এই চলচ্চিত্রের প্রেক্ষাপটে নিষ্প্রাণ, ভোগবাদী পরিবেশের অমানবিক দক্ষতার তুলনায় তার মানবিক অদক্ষতা আদতে একটি গুণ হিসেবেই ফুটে উঠেছে। অন্যদিকে, ‘প্লেটাইম’-এ তাকে আমরা ইস্পাত ও কাচের আকাশচুম্বী ভবনের প্রতিফলন আর সাদৃশ্যপূর্ণ অসংখ্য কিউবিকলের এক গোলকধাঁধায় নিজেকে পুরোপুরি হারিয়ে ফেলতে দেখি। তার আনাড়িপনা আর স্বাভাবিক উপস্থিতি দুর্ঘটনাবশত করপোরেট দক্ষতার কাচের মতো ঠুনকো বিভ্রমকে মুহূর্তেই ভেঙে চুরমার করে ফেলে। এর ফলে সেই কঠোর কর্মক্ষেত্রগুলো প্রাণবন্ত ও অপ্রত্যাশিত সামাজিক আড্ডায় রূপ নেয়।
এই সিরিজের শেষ চলচ্চিত্র ‘ট্রাফিক’-এ য়্যুলোর মনোজগৎ তৈরি হয়েছে একধরনের নিষ্ক্রিয়, সদয় সহনশীলতা, প্রথাগত নাটকীয় উচ্চাকাঙ্ক্ষার সম্পূর্ণ অভাব এবং আধুনিক যান্ত্রিক বিশ্বের অসংগতিগুলোর মুখোমুখি অবস্থায় মৃদু দার্শনিক ভারসাম্যের মাধ্যমে। এর উদাহরণ মেলে সেই দৃশ্যে, যেখানে সে প্যারিস থেকে আমস্টারডামে অটো শোতে যাওয়ার পথে আটকা পড়ে। দেরি হয়ে যাওয়া কিংবা আমলাতান্ত্রিক ও মোটরগাড়ি-সংক্রান্ত ঝামেলার মধ্যে জড়িয়ে পড়ার পরও তার মধ্যে একটি শান্ত ও সহনশীল মনোভাব বজায় থাকে। এটি দেখে এই চরিত্র সম্পর্কে প্রখ্যাত মার্কিন চলচ্চিত্র সমালোচক রজার ইবার্ট যথার্থই বলেছিলেন, ‘সে ঘটনাগুলোর মোকাবিলা করে এবং কখনোই নিজের দার্শনিক ভারসাম্য হারায় না।’



