লোকগাথা থেকে সেলুলয়েডে

ভেলার দৃশ্যে সুচন্দাকে অভিনয় বুঝিয়ে দিচ্ছেন পরিচালক; পাশে কলাকুশলী
রাষ্ট্রীয় অনাচার সেলুলয়েড ফিতায় বন্দি করে দর্শকের সামনে তুলে ধরায় জহির রায়হান ছিলেন অনন্য। রাজনৈতিক বক্তব্যকে প্রাধান্য দিয়ে তার কয়েকটি দর্শকপ্রিয় চলচ্চিত্র রয়েছে। ‘বেহুলা’ এর অনবদ্য উদাহরণ।
বাঙালি সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে হাজার বছর ধরে। পাকিস্তান আমলে এ সংস্কৃতির ওপর বারবার আঘাত এসেছে। আইয়ুব খানের সামরিক বুটের তলায় পিষ্ট হচ্ছিল পরাধীন বাংলার সংস্কৃতি। তখনই সেলুলয়েড ফিতায় প্রতিবাদের বারুদ হয়ে আসে ‘বেহুলা’।
পুরাণ আর ইতিহাসের সুতায় বোনা এ লোককাহিনি নিছক পৌরাণিক গল্প নয়; বরং এখানে জহির রায়হান স্বৈরশাসক আইয়ুব খানের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরেছেন নিষ্ঠুর মনসা দেবীকে। লোককাহিনিমতে, নাচ শেখার কারণে পতি হারায় বেহুলা। সিনেমায় তার ময়ূর নাচ শেখা হয়ে উঠেছে বাঙালি সংস্কৃতিচর্চার প্রতীক। ‘বেহুলা’ শুধু বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে নয়; বরং সাংস্কৃতিক লড়াইয়েও এক অবিনশ্বর হাতিয়ার। এর উপাখ্যানে দেখা মেলে স্বর্পদেবী মনসার। স্বর্পকুলের সবাই তার হুকুম মেনে চলে। মনসার শত্রু ময়ূর। কারণ, এই পাখি সাপ খেয়ে ফেলে। আর বেহুলা কী না শিখছে সেই ময়ূর নাচ! এই অপরাধে তাকে অভিশাপ দেয় মনসা দেবী, ‘যেন বাসর রাতেই কালনাগের বিষে প্রাণ হারায় বেহুলার পতি।’
এদিকে সাপের দংশনে পাঁচ পুত্র হারানো চাঁদ সওদাগরের শেষ পুত্র লখিন্দর। সাপের দংশনে পুত্র হারানোতে চাঁদ সওদাগর ঘৃণা করে মনসাকে। চাঁদ সওদাগরের বন্ধু সাই সওদাগর, যার একমাত্র কন্যা বেহুলা। তাকে ময়ূর নাচ শেখায় লখিন্দর, যে চাঁদ সওদাগরের পুত্র; কিন্তু এ কথা সাই সওদাগর জানে না। ওদিকে সাই সওদাগর মনসা দেবীর পূজা করে। তার রাজ্যের সবাই মনসা দেবীর ভক্ত এবং এ রাজ্যে সাপ হত্যা মহাপাপ; ময়ূর পোষাও নিষেধ।
লখিন্দর একদিন ময়ূর নিয়ে সাই সওদাগরের রাজ্যে যায়। তার সঙ্গে আনা ময়ূর একটা সাপ মেরেও ফেলে। খবর পৌঁছে যায় সাই সওদাগরের কানে; স্বর্গে থাকা মনসা দেবীর কাছেও। সাই সওদাগর লখিন্দরকে ডেকে পাঠায়। কিন্তু যখন জানতে পারে, লখিন্দর তার বন্ধুর পুত্র, তখন তাকে ক্ষমা করে দেয়। কারণ, লখিন্দরের সঙ্গে কন্যা বেহুলার বিয়ের কথা দুই বন্ধু ঠিক করেছে অনেক আগেই।
ময়ূর নাচ শেখার অপরাধে মনসা লখিন্দর-বেহুলার বিয়ে হতে দেবে না। তাই সে কূটচাল দেয়; অভিযোগ আনে, বেহুলা অসতী। সতিত্বের অগ্নিপরীক্ষায় বিজয়ী হয় বেহুলা। এদিকে চাঁদ সওদাগর তার পুত্রকে সাপের দংশন থেকে বাঁচাতে লোহার বাসরঘর তৈরি করে। কিন্তু মনসার হুমকিতে কারিগর কারিগর বিয়ের আগের দিন সেই ঘরে গোপনে ছিদ্র করে দেয়। সেই ছিদ্র দিয়ে ঢুকে পড়ে ঘুমন্ত লখিন্দরকে ছোবল দেয় কালনাগ। তার মৃতদেহ ভেলায় ভাসিয়ে দেওয়া হয় জলে; সঙ্গী হয় বেহুলাও। একসময় লখিন্দর পচে-গলে গেলে স্বর্গের দেবরাজের দরবারে হাজির হয় বেহুলা। লখিন্দরের শেখানো ময়ূর নাচ নেচে ইন্দ্রপুরীর দেবতাদের মন জয় করে সে; তাতে প্রাণ ফিরে পায় লখিন্দর।
জহির রায়হানের ‘বেহুলা’য় নামভূমিকায় অভিনয় করেছেন সুচন্দা। লখিন্দর ছিলেন রাজ্জাক; নায়ক হিসেবে এটিই তার প্রথম চলচ্চিত্র। লোককাহিনিভিত্তিক এই চলচ্চিত্রে বাঙালি নারীর চিরন্তন আবেগ ও আত্মত্যাগ প্রকাশ পেয়েছে। ফুটে উঠেছে সমকালীন রাজনীতিও। তাই এটি দারুণ দর্শকপ্রিয়তা পেয়েছে।
লেখক: সাবেক মহাপরিচালক
চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তর



