সালমান শাহ সিনেমার চেয়ে বড়

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
অমর নায়ক সালমান শাহের ৩০তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ। মৃত্যুর তিন দশক পরও তার জনপ্রিয়তা ও আবেদন অমলিন। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে তাকে ঘিরে আগ্রহের কমতি নেই। তাকে নিয়ে লিখেছেন মাহফুজুর রহমান
সমকালীন সিনেমার চেয়ে উচ্চতায় বড় ছিলেন সালমান শাহ। তাকে ধারণ করার জন্য তৈরি ছিল না ঢালিউড। তার প্রতিভা বিকাশের জন্য প্রস্তুত ছিল না নব্বই দশক। বোম্বের তারুণ্যের প্রতিনিধি সালমান খানের নাম থেকে সালমান শাহর নাম ধার করা হয়। একটা কপিরাইট সিনেমা দিয়ে অভিষেক হয় তার। আমির খানের ‘কেয়ামত সে কেয়ামত তক’-এর রিমেক ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ দিয়ে আত্মপ্রকাশ ঘটে সালমানের।
মূল সিনেমার ফ্রেম টু ফ্রেম কপি করা হয়। কোথাও নিজস্বতা নেই। সেই মুভি দেখতে ছোকরা-বুড়ো-জওয়ান— সব হুমড়ি খেয়ে পড়ে। তরুণীদের বেডরুম ছেয়ে যায় সালমানের পোস্টারে। পরপর তার অভিনীত তিনটি সিনেমা সুপারহিট হয়ে যায়। হ্যাটট্রিক সাফল্যে জন্ম হয় নতুন সুপারস্টারের। অথচ মৌলিক গল্পের আকালের মধ্যেই তার সমৃদ্ধি। সাহিত্যিকরা তখন আর গল্প লেখেন না। উঁচুমানের গল্পকাররা সেলুলয়েড থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন।
বোম্বে-মাদ্রাজ থেকে সালমানের জন্য কাহিনি আমদানি করতে হয়। ভিসিআর দেখে দেখে স্ক্রিপ্ট লেখা হয়। এই কি ছিল সালমানের মতো অদ্বিতীয় প্রতিভার প্রাপ্য?
অথচ তারই বন্ধু, বোম্বের শাহরুখ খান তখন মৌলিক গল্পে ‘দিলওয়ালে দুলহানিয়া লে জায়েঙ্গে’র মতো সিনেমা করছেন। যে বছর বলিউডের সর্বকালের অন্যতম ব্লকবাস্টার সিনেমা ‘দিলওয়ালে দুলহানিয়া লে জায়েঙ্গে’ মুক্তি পায়, সেই একই বছর মুক্তি পায় বাংলাদেশের সর্বকালের অন্যতম ব্যবসাসফল সিনেমা ‘স্বপ্নের ঠিকানা’।
সালমানের সিনেমা দেখতে সিনেমা হলগুলোয় সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো ভেঙে পড়ছে দর্শক। কিন্তু তার সিনেমার গান হিন্দি সিনেমা থেকে অকাতরে নকল করা হচ্ছে। খোদ সালমান নিজে দুটো নকল গান গেয়েছেন। যার মধ্যে একটাতে তিনি পর্দায় পারফর্মও করেছেন। জাফর ইকবালের ‘হয় যদি বদনাম’-এর মতো একটি গান তখনকার সিনেমা ইন্ডাস্ট্রি সালমানের গলায় তুলে দিতে পারেনি।
তার অসাধারণ জনপ্রিয়তা নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই। দ্বিধা নেই তার বাণিজ্যিক সফলতা নিয়েও। মৌসুমীর সঙ্গে চারটা ছবি করেছেন— চারটাই সুপারহিট। সেই জুটি ভেঙে গেলে শাবনূরকে কাছে টেনে নেন। তার সঙ্গেও ছবি বাম্পারহিট হয়, জুটি হয় জননন্দিত। বর্ষীয়ান নির্মাতাদের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হলে উদীয়মান নির্মাতাদের ওপর ভরসা করেন সালমান। সেখানেও তার ছক নিখুঁত বলে বিবেচিত হয়। তার অপরাজেয় অবস্থান তৈরি হয় প্রতিকূল স্রোতের বিরুদ্ধে সাঁতার কেটে কেটে।
ফিল্ম পলিটিকসের চোরাবালি তার পা আটকে ধরেছে বারবার। ইন্ডাস্ট্রির অক্ষমতা তাকে পারফরম্যান্স দিয়ে অতিক্রম করতে হয়েছে। সেকেলে চিত্রনাট্যের সিনেমাকে সালমান নিজের কাঁধে তুলে সাফল্যের বৈতরণী পার করিয়েছেন। আবার দুর্বল নায়িকা নিয়ে বক্স অফিসে মুখ থুবড়ে পড়েছেন। অথচ সেসব সিনেমায় তার পারফরম্যান্স রেখে গেছে চিরকালীন আবেদন। পরবর্তী প্রজন্মের বুকে নায়ক হওয়ার আকাঙ্ক্ষা জন্ম দিয়েছে তার সহজাত ও সাবলীল অভিনয়।
একটা সিনেমায় সবাইকে যেখানে দেখতে লেগেছে সাধারণ ও সাদামাটা, সালমান সেখানে তার ড্রেস ও লুক দিয়ে হয়ে গেছেন সবার চেয়ে স্বতন্ত্র। তখন কারওয়ানবাজারে ‘খলিফা’র কাছে ঢালাওভাবে পোশাক তৈরি করা হয়। এই প্রথার বিপরীতে গিয়ে নিজস্ব ফ্যাশন স্টেটমেন্ট দাঁড় করান সালমান। চরিত্রের শ্রেণি, বয়স, পেশার সঙ্গে মিলিয়ে নিজের পোশাক বাছাই করেন। তাই তো পাতে তোলার মতো নয়— এমন সিনেমায়ও পদ্মফুলের মতো ফুটে থাকেন সালমান।
তার উচ্চতা ছিল বলিউডের, অথচ তাকে বন্দি থাকতে হয়েছে এফডিসির চার দেয়ালের ভেতর। শাহরুখ-আমিরদের সিনেমার শুটিং হচ্ছে সুইজারল্যান্ড-ইংল্যান্ডে, আর সালমানকে দৌড়াতে হচ্ছে গাজীপুর-কক্সবাজারে। তবুও তার অনবদ্য ও অতুলনীয় উপস্থিতির কারণে সেই সব একঘেয়ে লোকেশনের ছবিগুলো এখনো লোকে বারবার দেখে, মন্ত্রমুগ্ধের মতো গোগ্রাসে গেলে।
কিন্তু কতদিন দেখতে পারবে? এফডিসির মান্ধাতার আমলের কারিগরি সুবিধায় সালমানের ছবিগুলো নির্মিত। সেগুলোর প্রিন্ট এখনই চোখের জন্য যন্ত্রণাদায়ক। ভবিষ্যতে এসব প্রিন্ট কি দেখার অযোগ্য হয়ে পড়বে না? সালমান সিনেমার সূতিকাগার এফডিসির সন্তান। এর আঙিনায় তিনি বেড়ে উঠেছেন; কিন্তু তার যোগ্যতা ছিল বিশাল, তার খোয়াব ছিল অসীম। তার প্রতিভার সমতুল্য পাটাতন এই সিনেমার কারখানা হতে পারেনি।
একটা পর্যায়ে গিয়ে সালমান হয়তো বুঝতে পারেন যে, এই ইন্ডাস্ট্রিকে তার ছাপিয়ে যেতে হবে। তিনি নামজাদা পরিচালকের নামের ভারের চেয়ে তরুণ নির্মাতার মেধার ধারে আস্থা রাখতে শুরু করেন। বড় ব্যানারের হাতছানি ফেলে নতুন প্রযোজকের পুঁজির ওপর নির্ভর করতে শুরু করেন। তিনি হয়তো বুঝতে পারেন যে তার সমসাময়িকরা দ্রুতই ফুরিয়ে যাবেন, তার নিঃশেষ হয়ে যাওয়া চলবে না।
কিন্তু ৩০ বছর আগে আজকের তারিখে হঠাৎ দমকা হাওয়ায় সালমানের দম ফুরিয়ে যায়। ব্যক্তিজীবনে খামখেয়ালি হলেও সিনেমার ব্যাপারে তার দূরদৃষ্টি ছিল নির্ভুল। তার সহশিল্পীদের মধ্যে অনেকেই স্মৃতির ধুলায় বিলীন হয়ে গেছেন। তার সিনেমার একাধিক নির্মাতা আর কখনো নিজেদের জাত চেনাতে পারেননি, কুলের মান রক্ষা করতে পারেননি।
অথচ সস্তা গল্প, বাতিল বাণী, টুকলি সুর, স্বল্প বাজেট, অখ্যাত নায়িকা, ত্রুটিপূর্ণ প্রজেকশন— এই সব সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করে ঢালিউডকে নতুন উচ্চতা দিয়েছেন সালমান শাহ। প্রমাণ করেছেন— তিনি ছিলেন সময়ের চেয়ে অগ্রগামী, সমকালীন সিনেমার চেয়েও অগ্রসর।






