অনুদানের টাকা দিতে গড়িমসি কেন

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
২০২৪-২৫ অর্থবছরের সরকারি অনুদানের অর্থ সময়মতো ছাড় না হওয়ায় বেশ কয়েকটি পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের নির্মাণকাজ অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। অনুদানের দ্বিতীয় কিস্তির অর্থ না পাওয়ায় আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি শিল্পী-কলাকুশলীদের শিডিউল জটিলতার সম্মুখীন হচ্ছেন সংশ্লিষ্ট নির্মাতারা। চুক্তি অনুযায়ী, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমাসহ সব শর্ত পূরণের কয়েক মাস পরও অর্থ ছাড় না হওয়ায় শুটিং স্থগিত রাখতে বাধ্য হয়েছেন তারা। এ ছাড়া গল্পকার ও চিত্রনাট্যকারদের জন্য ঘোষিত উৎসাহ পুরস্কারের অর্থও এখনো পাননি সংশ্লিষ্টরা।
গত বছরের ৩০ জুন ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সরকারি অনুদানপ্রাপ্ত পূর্ণদৈর্ঘ্য ও স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র তালিকা-সংক্রান্ত সংশোধিত প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। এর জি ও নং-২৩৭ ও ২৩৮। তালিকায় স্থান পেয়েছে ১২টি পূর্ণদৈর্ঘ্য এবং ২০টি স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র।
অনুদানপ্রাপ্ত পূর্ণদৈর্ঘ্য সিনেমার প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ রয়েছে, ‘অনুদানপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে নির্বাচিত চলচ্চিত্রের নির্মাণ শুরু করার নিমিত্ত সাইনিং মানি (প্রথম কিস্তি/প্রি-প্রোডাকশন) হিসেবে অনুদানের ২০ শতাংশ অর্থ প্রদান করা হবে। এ অর্থ প্রাপ্তির দুই মাসের মধ্যে শুটিং শিডিউল, বিস্তারিত প্রোডাকশন প্ল্যান, লোকেশন ব্যবহারের অনুমতিপত্র, শিল্পী ও কলাকুশলীদের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তিপত্রের কপি ও অন্যান্য দলিলাদি পর্যালোচনা সাপেক্ষে চলচ্চিত্র বাছাই ও তত্ত্বাবধান কমিটি সন্তুষ্ট হলে প্রযোজককে দ্বিতীয় কিস্তি (প্রোডাকশন) হিসেবে ৫০ শতাংশ অর্থ প্রদান করা হবে।’
সরকারের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তিপত্রের ৬নং শর্ত অনুযায়ী ২০২৫ সালের ১১ সেপ্টেম্বর প্রথম কিস্তির (প্রি-প্রোডাকশন) ২০ শতাংশ অর্থ পেয়েছেন সংশ্লিষ্ট নির্মাতারা। কিন্তু তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় থেকে এখনো অনুদানের ৫০ শতাংশ অর্থ পাননি তারা। এ কারণে অভিনয়শিল্পীদের শিডিউল সমস্যা, শিশুশিল্পীদের বয়স বেড়ে যাওয়াসহ বিভিন্ন জটিলতার সম্মুখীন হতে হচ্ছে তাদের। কেউ কেউ ধারদেনা নিয়ে শুটিং শুরু করে পাওনাদারদের সামনে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়ছেন।
প্রজ্ঞাপনে আরও উল্লেখ রয়েছে, ‘অনুদান প্রদানের জন্য সরকার কর্তৃক নির্ধারিত সংখ্যক চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত চলচ্চিত্রের গল্প লেখককে ২ লাখ এবং চিত্রনাট্যকারকে ৩ লাখ টাকা উৎসাহ পুরস্কার প্রদান করা হবে। গল্পলেখক কিংবা চিত্রনাট্যকার একাধিক হলে পুরস্কারের অর্থ সমহারে বিভাজ্য হবে। উৎসাহ পুরস্কারের অর্থ গ্রহণের আগে কোনো গল্প লেখক কিংবা চিত্রনাট্যকারের মৃত্যু হলে তার বা তাদের পরিবার সে অর্থ প্রাপ্য হবে।’
জানা গেছে, গল্প লেখক এবং চিত্রনাট্যকাররাও এবারের অনুদানের অর্থ পাননি। নিরুপায় হয়ে অনুদানপ্রাপ্ত পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের দ্বিতীয় কিস্তির অর্থ ও উৎসাহ পুরস্কার দ্রুত প্রদানের আবেদন জানিয়ে গত ২৯ মার্চ তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ে একটি চিঠি দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট নির্মাতারা। এতে সই করেন অনুদানপ্রাপ্ত ‘জলযুদ্ধ’র নির্মাতা গোলাম সোহরাব দোদুল, ‘জীবন অপেরা’র নির্মাতা এম আলভী আহমেদ, ‘পরোটার স্বাদ’ চলচ্চিত্রের নির্মাতা সিংখানু মারমা এবং ‘রবিনহুডের আশ্চর্য অভিযান’-এর নির্মাতা জগন্ময় পাল। এরপর আড়াই মাস কেটে গেলেও কোনো সদুত্তর পাননি তারা।
চিঠিতে বলা হয়েছে, ‘চুক্তিপত্রের ৬নং শর্ত মোতাবেক প্রথম কিস্তির অর্থ পাওয়ার দুই মাসের মধ্যে চিত্রনাট্যের চূড়ান্ত খসড়া, শুটিং শিডিউল, লোকেশন ব্যবহারের অনুমতিপত্র এবং শিল্পী ও কলাকুশলীদের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তিপত্রের অনুলিপি যথাযথভাবে দাখিল করার কথা। আমরা এগুলো সবই চুক্তিপত্রের নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে দাখিল করেছি।’
নির্মাতা গোলাম সোহরাব দোদুল জানান, ২০২৫ সালের ১৫ ডিসেম্বর সচিবালয়ে সশরীরে উপস্থিত হয়ে চলচ্চিত্র বাছাই ও তত্ত্বাবধান কমিটির সম্মুখে আমাদের শুটিং পরিকল্পনার ওপর একটি বিস্তারিত পাওয়ার পয়েন্ট প্রেজেন্টেশন করেছি। সেই উপস্থাপনায় উপস্থিত কমিটি সন্তোষ প্রকাশ করে এবং উপ-সচিব আশ্বাস প্রদান করেন, অনুদানের দ্বিতীয় কিস্তির (প্রডাকশন) ৫০ শতাংশ অর্থ অচিরেই প্রদান করা হবে।
কিন্তু নির্মাতা আলভী আহমেদ বললেন, ‘দুঃখজনক হলো, ওই সময়ের পর চার মাস অতিবাহিত হলেও আমরা দ্বিতীয় কিস্তির অর্থ এখনো পাইনি। এ কারণে আমাদের মধ্যে বেশ কয়েকজন প্রযোজক নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী শুটিং শুরু করেও তা স্থগিত রাখতে বাধ্য হয়েছেন।’
সিংখানু মারমা বললেন, ‘দ্বিতীয় কিস্তির অর্থ প্রাপ্তির নির্দিষ্ট সময়সীমা সম্পর্কে অনিশ্চয়তা থাকায় শুটিং ফের শুরু করার সিদ্ধান্ত গ্রহণও জটিল হয়ে পড়েছে। চিঠিতে আমরা এসব কথা লিখেছি।’
জগন্ময় পাল বললেন, ‘আমাদের চলচ্চিত্রগুলোতে দেশের স্বনামধন্য শিল্পী ও কলাকুশলীরা কাজ করার জন্য চুক্তিবদ্ধ হয়েছেন এবং তাদের অগ্রিম সম্মানী প্রদান করা হয়েছে। তাদের ব্যস্ত সময়সূচির মধ্য থেকে নির্ধারিত শিডিউল সংগ্রহ করা অত্যন্ত কষ্টসাধ্য ছিল। বারবার শুটিং স্থগিত হলে ভবিষ্যতে তারা চুক্তি বাতিল করার অধিকার সংরক্ষণ করেন, যা বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির কারণ হতে পারে এবং পুরো চলচ্চিত্র নির্মাণ কার্যক্রম হুমকির মুখে পড়তে পারে।’
তথ্য মন্ত্রণালয়ে দেওয়া চিঠিতে নির্মাতারা আরও লিখেছেন, ‘অনুদানের দ্বিতীয় কিস্তির ৫০ শতাংশ অর্থ দ্রুত প্রদানের জন্য বিনীতভাবে আবেদন জানাচ্ছি, যাতে আমরা শুটিং কার্যক্রম যথাসময়ে সম্পন্ন করতে পারি। একই সঙ্গে চুক্তিপত্রের ১৫নং শর্ত অনুযায়ী গল্প লেখককে ২ লাখ এবং চিত্রনাট্যকারকে ৩ লাখ টাকা উৎসাহ পুরস্কার প্রদানের বিধান রয়েছে। ওই অর্থও দ্রুত প্রদানের জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ জানাচ্ছি।’
এ প্রসঙ্গে জানতে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব (চলচ্চিত্র অধিশাখা) মাহফুজা আখতারকে ফোন করা হলেও তিনি ফোনে মন্তব্য করতে রাজি হননি।
২০২৪-২৫ অর্থবছরের সরকারি অনুদানপ্রাপ্ত অন্য পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রগুলো হলো— মো. নাজমুছ ছাকিবের ‘মায়ের ডাক’ (প্রামাণ্যচিত্র), মাহমুদুল ইসলামের ‘জুলাই’, হাসান আহম্মেদ সানির ‘রূহের কাফেলা’, সৈয়দ সালেহ আহমেদ সোবহানের ‘খোঁয়ারি’, মুশফিকুর রহমানের ‘কবির মুখ’, আনুশেহ আনাদিলের ‘কফিনের ডানা’, সাহিবা মাহবুবের ‘নওয়াব ফয়জুন্নেসা’ এবং সুজন মাহমুদের ‘জুঁই’।
সংশ্লিষ্ট নির্মাতাদের প্রত্যাশা, অবিলম্বে অনুদানের দ্বিতীয় কিস্তি ও ঘোষিত উৎসাহ পুরস্কারের অর্থ দ্রুত প্রদান করে চলচ্চিত্রগুলোর নির্মাণকাজ নির্বিঘ্ন করার উদ্যোগ নেবে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়।





